ছোটবেলা থেকেই গাছের প্রতি ভালোলাগা কাজ করত। বাড়ির আঙিনায় একদিন এক প্রতিবেশী একটি ফুল ছিঁড়ে ফেলায় কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন রাতুল মুনশী। বলতেন গাছেরও জীবন আছে। অকারণে ছেঁড়া যাবে না একটি পাতাও। বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে যখন শুনেছেন গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়, প্রকৃতিতে বৃক্ষের ভূমিকা অপরিসীম ঠিক তখন থেকেই মায়া জন্মে প্রকৃতির ওপর। জীবিত
থাকাকালীন সময়েই দান করেছেন একটি মরণোত্তর চোখ। সামাজিক কাজকর্ম আর তার প্রকৃতি প্রেমের কারণে তিনি এখন এলাকাবাসীর কাছে হয়ে উঠেছেন বৃক্ষমানব রাতুল। রাতুল মুনশী বলেন, আসলে ছোটবেলায় তখন প্রকৃতি ও পরিবেশ বিষয়ে কিছুই বুঝতাম না। তবে এত সুন্দর একটা ফুল মানুষ কেন গাছ থেকে ছিঁড়ে আর কেন অকারণে গাছ কাটে এমন মায়া থেকেই মাঝেমধ্যে মন খারাপ হতো আমার। রাতুল জানান তার প্রকৃতি পাঠের শিক্ষক তারই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. দ্রাবিড় সৈকত। শিক্ষকের সঙ্গে একদিন হাঁটতে বেরিয়ে দেখেন একটি মহুয়া গাছের ছাল-বাকল ছাগল খেয়ে ফেলেছে। শিক্ষক দ্রাবিড় সৈকতের পরামর্শে তারা গাছটিতে গোবর ও কাপড় দিয়ে বেঁধে দেন। এক বছর পরে দেখলেন গাছে নতুন বাকল হয়েছে এবং গাছটি বড় হচ্ছে। নিজের হাতে পরিচর্যা করা গাছের এই পরিবর্তন দেখার পরে নিজের মধ্যে এক অন্যরকম বোধোদয় হয়। তখন থেকেই গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় মনোযোগী হয়ে ওঠেন। শিক্ষার্থী জীবনে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বৃক্ষনিধনের বিরুদ্ধে সংগঠিত আন্দোলনেও বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে করেছেন অসংখ্য বৃক্ষরোপণ। রাতুল মুনশীর বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর উপজেলার শোলাকুড়ী গ্রামে। মা গৃহিণী, বাবা একজন কৃষক। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে বর্তমানে পরিবেশ প্রকৃতি নিয়েই কাজ করছেন।
ফলদ বাংলাদেশ
শিক্ষক দ্রাবিড় সৈকতের উদ্যোগে গঠিত ফলদ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের একজন সক্রিয় সদস্য। তারা ২০১২ সাল থেকে নিজেদের উদ্যাগে ও অর্থায়নে ৬৪ জেলায় প্রায় সাড়ে তিন লাখের ওপরে বৃক্ষরোপণ করেছেন। রোপণ করা ৮৫% গাছ বেঁচে আছে এবং ফল দিচ্ছে। এ ছাড়া উঠান বৈঠকের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধিতেও কাজ করেন তারা। এসব উঠান বৈঠকে ক্ষতিকর গাছ ইউক্যালিপ্টাস, মেহগনি, একাশিয়া, রেইনট্রি প্রভৃতি গাছের অপকারিতা বর্ণনা করে এগুলো না লাগানোর জন্য উৎসাহ দেন। এর পরিবর্তে তারা বাড়ির আঙিনায় ফলদ গাছ লাগাতে উৎসাহ দেন। এর ফলে দেশে সবুজের পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পুষ্টির চাহিদাও মিটছে। শুধু তাই নয়, তিনি নিজের উদ্যাগেও অসংখ্য গাছ লাগিয়েছেন। তার নিজের গ্রামে ১০৯টি পরিবারের গুচ্ছ গ্রামে কয়েক দফায় গাছ লাগিয়েছেন। তালের বীজ রোপণ করেছেন রাস্তার দুপাশে। তরুণদের মধ্যে গাছ লাগানোর ব্যাপারে উৎসাহ দেখে আশাবাদী হন এই বৃক্ষমানব। তবে গাছটি যেন গরু-ছাগল দ্বারা নষ্ট না হয় সেটি নিশ্চিত হওয়ার ব্যাপারে পরামর্শ দিয়েছেন রাতুল। সেক্ষেত্রে যেখানে গাছ লাগানো হবে সে স্থানের কারও সঙ্গে পরিচিত ও গাছ পরিচর্যায় উৎসাহিত করে লাগানো উচিত বলে মনে করেন তিনি। রাতুল মুনশী মনে করেন, পরিবেশ রক্ষায় শুধু গাছ লাগালেই হবে না, প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার পরিহারের জন্য জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। তরুণরা সচেতন হয়ে প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার বন্ধ করলেই সমাজে পরিবর্তন আসবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।