বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পাটের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কারণে একে ‘সোনালি আঁশ’ বলা হয়। এই সোনালি আঁশকে মাছ চাষের মানোন্নয়নেই কাজে লাগিয়েছে বাংলাদেশের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আটজনের একটি গবেষণা দল। তাদের উদ্ভাবন পদ্ধতি ‘দ্য গোল্ডেন লুপ’ প্রাকৃতিক ফুড সিস্টেম উদ্ভাবনের প্রতিযোগিতায় সেরা ছয়ের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।
পাটকে কাজে লাগিয়ে টেকসই খাদ্যব্যবস্থার নতুন সম্ভাবনা দেখিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য পাওয়া বাংলাদেশের তরুণ শিক্ষার্থী দলের ছয়জনই বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। নেদারল্যান্ডসে আয়োজিত ‘ফুড সিস্টেমস ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ ২০২৬’-এ বিশে^র ১১৯টি দলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে শীর্ষ ছয়ে জায়গা করে নিয়েছে এই ‘দ্য গোল্ডেন লুপ’ দলটি।
দেশীয় পাট ও পাটজাত বর্জ্য কাজে লাগিয়ে খাদ্যব্যবস্থায় উদ্ভাবনী ও টেকসই সমাধান তৈরির উদ্যোগই এনে দিয়েছে এ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
আট সদস্যের ‘দ্য গোল্ডেন লুপ’ দলে রয়েছেন বাকৃবির ছয় শিক্ষার্থী। তারা হলেন মোছা. মুর্শিদা জাহান মিতু, নুর আয়শা চৌধুরী, মো. আরকানুল ইসলাম আকিক, সাদিয়া ইসলাম বাঁধন, সায়ফা সাবা হোসেন ও কুর্সি রহমান লুবা। দলের অন্য দুই সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লিটন ত্রিপুরা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আহসানী তাকবীম এশা।
দলটির প্রকল্পের দিকনির্দেশনায় ছিলেন বাকৃবির ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. হারুনুর রশীদ এবং ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মতিউর রহমান। কারিগরি সহযোগিতায় ছিলেন মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মফিজুর রহমান জাহাঙ্গীর।
জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলা এ আন্তর্জাতিক আয়োজনের চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয় গত ২৯ সেপ্টেম্বর নেদারল্যান্ডসের ওয়াগেনিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওম্নিয়া ভবনে। চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেওয়া দলগুলো তাদের বাস্তবায়িত প্রকল্প উপস্থাপন করে। পিচ রাউন্ড, জুরি বোর্ডের প্রশ্নোত্তর এবং অতিথিদের সামনে প্রকল্প উপস্থাপনার মাধ্যমে বিজয়ী দলগুলো নির্বাচন করা হয়।
‘দ্য গোল্ডেন লুপ’-এর প্রকল্পের মূল ভাবনায় ছিল বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ পাট। পাটের বর্জ্যকে ফেলে না দিয়ে কীভাবে তা খাদ্যব্যবস্থার টেকসই উন্নয়নে কাজে লাগানো যায়, সেই সম্ভাবনাই তুলে ধরেছেন দলের সদস্যরা।
দলের সদস্য নুর আয়শা চৌধুরী বলেন, ‘দ্য গোল্ডেন লুপ’-এর মূল লক্ষ্য ছিল পাটকে কাজে লাগিয়ে খাদ্যব্যবস্থায় নতুন উদ্ভাবন আনা। এক্ষেত্রে খাদ্যব্যবস্থা হিসেবে মাছ চাষকে গ্রহণ করা হয়েছে। নদীমাতৃক দেশের হিসেবে এ দেশের মানুষের অন্যতম প্রধান খাদ্য মাছ। মাছ পুষ্টির অন্যতম প্রধান জোগানদার।
পাটকে ব্যবহার করে মাছ চাষের মানোন্নয়নের জন্য পরিত্যক্ত পাটের বস্তা প্রক্রিয়াজাত করে জুট জিওটেক্সটাইল এবং পাটকাঠি অক্সিজেন-স্বল্প পরিবেশে পুড়িয়ে বায়োচার তৈরি করা হয়েছে। বায়োচার তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে দলের নিজস্ব নকশায় তৈরি চুলা।
তারা জুট জিও টেক্সটাইল পুকুরের পাড়ে বিছিয়েছেন যেন তা পাড় ভাঙা রোধ করতে পারে। এটি প্রচলিত টেক্সটাইলের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়েছে, যেটি অনেক বেশি প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব। ছয় মাসের পরীক্ষালব্ধ ফলাফলে এই জুট টেক্সটাইল পাড়ভাঙা রোধ করতে সক্ষম তা প্রমাণিত। পাটের পাটকাঠিকে সাধারণত ফেলে দেওয়া হয় বা জ¦ালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই পাটকাঠিকে তারা বিশেষ প্রক্রিয়ায় পুড়িয়ে বায়োচার তৈরি করেছি। বায়োচার এমন একটি পদার্থ যেটি পানির অ্যামোনিয়াসহ অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থ শোষণ করতে সাহায্য করে। ফলে পুকুরের পানির গুণগতমান বৃদ্ধি পায়। এই বায়োচার তৈরিতে যে চুল্লি ব্যবহার হয়েছে সেটিও তারা উদ্ভাবন করেছেন। তাদের এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল পাটকে ব্যবহার করে মাছ চাষে উন্নয়ন ঘটানো। মোট চারটি পুকুরে এই প্রক্রিয়াটি চালানো হয়। পাট বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সোনালি আঁশ নামেই পরিচিত। এই সোনালি আঁশকে কাজে লাগিয়ে মাছ চাষ প্রক্রিয়ায় মানোন্নয়নের এই প্রকল্পের নাম তাই তারা দিয়েছেন দ্য গোল্ডেন লুপ।
নুর আয়শা চৌধুরী বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় অতিবৃষ্টি, মাঠপর্যায়ের কাজ এবং নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষার পাশাপাশি নমুনা সংগ্রহ ও গবেষণাগারের বিশ্লেষণ চালিয়ে যাওয়া ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। এসব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পরামর্শ ও সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
পাটকে ঘিরে দেশের দীর্ঘদিনের সম্ভাবনাকে নতুনভাবে কাজে লাগানোর এ উদ্যোগ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মঞ্চে বাংলাদেশের তরুণদের উদ্ভাবনী সক্ষমতাকেও তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে কৃষি, পরিবেশ ও খাদ্যব্যবস্থার পারস্পরিক সম্পর্ককে সামনে রেখে স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে টেকসই সমাধান তৈরির সম্ভাবনাও দেখিয়েছে ‘দ্য গোল্ডেন লুপ’।
দেশীয় পাট ও পাটজাত উপকরণ কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্জিত এ স্বীকৃতি বাংলাদেশের তরুণ গবেষকদের উদ্ভাবনী সক্ষমতাকে তুলে ধরেছে। এ অর্জন টেকসই ও সহনশীল খাদ্যব্যবস্থা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও গবেষণা ও নতুন উদ্ভাবনের পথ প্রশস্ত করবে বলে আশাবাদী ‘দ্য গোল্ডেন লুপ’-এর সদস্যরা।
লেখক : শিক্ষার্থী, তৃতীয় বর্ষ, ভেটেরিনারি অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ