মৌসুমের মাঝপথে বদলে যায় ভেন্যু

এক মৌসুমে কুমিল্লা, পরের মৌসুমে মুন্সীগঞ্জ কিংবা ময়মনসিংহ। বাংলাদেশ ফুটবল লিগে বেশিরভাগ ক্লাবের হোম ভেন্যুর চিত্র এখন এমনই। স্থায়ী মাঠ না থাকায় এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ছুটতে হচ্ছে ক্লাবগুলোকে। এতে যেমন স্থানীয় সমর্থকদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে, তেমনি মাঠের পরিচর্যা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

কয়েক বছর ধরে কুমিল্লার ভাষাসৈনিক শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়ামকে হোম ভেন্যু হিসেবে ব্যবহার করেছে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ও ঢাকা আবাহনী লিমিটেড। এবার দুই রাউন্ডের পর স্থানীয় টুর্নামেন্ট আয়োজনের কারণে ভেন্যু বদলেছে তারা। মোহামেডান গেছে মুন্সীগঞ্জের ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে, আর আবাহনী বেছে নিয়েছে ময়মনসিংহ জেলা স্টেডিয়াম। তবে ভেন্যু বদলে গেলেও মোহামেডানের ফুটবল ম্যানেজার আমিরুল ইসলাম বাবু আশা করছেন, মুন্সীগঞ্জে ক্লাবটির সমর্থক বাড়বে। ঢাকা থেকে এক থেকে দেড় ঘণ্টায় সেখানে যাওয়া সম্ভব উল্লেখ করে তিনি সমর্থকদের মাঠে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে প্রশ্ন উঠেছে, কুমিল্লায় এতদিনে তৈরি হওয়া সাদা-কালো সমর্থকদের কী হবে?

মোহামেডান আল্ট্রাসের সদস্য মোহাম্মদ নাদিমের মতে, ২০২১ সাল থেকে কুমিল্লায় খেলার সুবাদে সেখানে বড় একটি সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল। ভেন্যু বদলানোর কারণে এখন নতুন করে মুন্সীগঞ্জে সমর্থক গড়ে তুলতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ। আবাহনীর সমর্থকগোষ্ঠীর সদস্য আশরাফুল হকও কুমিল্লাকে স্থায়ী হোম ভেন্যু হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। তার মতে, ধানম-ির ক্লাব আবাহনীর হোম ভেন্যু ঢাকাতেই হওয়া উচিত। অন্যদিকে দেশের অন্যতম সফল ক্লাব বসুন্ধরা কিংসের রয়েছে নিজস্ব আন্তর্জাতিক মানের বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনা ও অনুশীলন মাঠ। বাংলাদেশ ফুটবল লিগে ছয়বার এবং ফেডারেশন কাপে পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি দুবার ঘরোয়া ট্রেবল জিতেছে তারা। ফর্টিজ এফসিরও উন্নত অনুশীলন মাঠ রয়েছে; ভবিষ্যতে স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও শোনা যাচ্ছে।

গত মৌসুমে মুন্সীগঞ্জ ছিল ব্রাদার্স ইউনিয়ন ও রহমতগঞ্জের হোম ভেন্যু। এবার ব্রাদার্স খেলবে গোপালগঞ্জে, আর মুন্সীগঞ্জে এসেছে নবাগত চট্টগ্রাম সিটি এফসি। চট্টগ্রামের ক্লাবের হোম ম্যাচ মুন্সীগঞ্জে হওয়ায় স্থানীয় মাঠের সঙ্গে ক্লাবের পরিচিতি ও সমর্থকদের সংযোগ তৈরির বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। বাফুফের সিনিয়র সহসভাপতি ও পেশাদার লিগ কমিটির চেয়ারম্যান ইমরুল হাসান এক সাক্ষাৎকারে আক্ষেপ করে বলেছেন, ক্লাবগুলোর চাহিদা অনুযায়ী ঢাকার বাইরে ম্যাচ আয়োজন করেও দর্শক পাওয়া যাচ্ছে না। তার মতে, ক্লাবগুলো হোম ভেন্যুর পরিচর্যা ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রচারে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না। জাতীয় দলের সাবেক তারকা শেখ মোহাম্মদ আসলামও স্থায়ী পরিকল্পনার অভাবকে দায়ী করেছেন। তার মতে, জেলা পর্যায়ে নিয়মিত লিগ না থাকায় খেলোয়াড় ও দর্শক, দুটিই তৈরি হচ্ছে না। খুলনায় জেলাভিত্তিক লিগ না থাকলে আসলামের মতো ফুটবলার উঠে আসতেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

স্থায়ী মাঠ না থাকায় ক্লাবগুলোও রক্ষণাবেক্ষণে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী নয়। ২০২৫-২৬ মৌসুমে মানিকগঞ্জের শহীদ মিরাজ-তপন স্টেডিয়ামে আরামবাগ ও ফকিরেরপুল খেললেও টিকিট বিক্রির অর্থ পেত স্থানীয় ক্রীড়া প্রশাসন। এবার মাঠটি নিয়েছে পিডব্লিউডি স্পোর্টস ক্লাব। এ ছাড়া বছরে দুয়েকটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ ছাড়া খালি পড়েই থাকে ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়াম। আগে এই স্টেডিয়ামকেই হোম ভেন্যু করত লিগের সাত থেকে আটটি ক্লাব। এখন সে স্টেডিয়াম খাঁ খাঁ করছে। ফাঁকা পড়ে থাকলেও লিগের বড় ম্যাচগুলো কেন এখানে দেওয়া হচ্ছে না। এ বিষয়ে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (ক্রীড়া) পরিচালক জাহিদ পারভেজ চৌধুরী জানিয়েছেন, বাফুফেকে পরিকল্পনা দিতে বলা হয়েছে। তার ভাষ্য, ফেডারেশন মাঠ চাইলে এনএসসি বিষয়টি বিবেচনা করবে। জাতীয় স্টেডিয়ামেও খেলা আয়োজনের প্রস্তাব এলে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত তারা।’ তিনি যোগ করেন, ‘আমরাও দেখেছি, জাতীয় স্টেডিয়ামে পড়ে আছে। তবে বড় ম্যাচগুলোর জন্য বাফুফেও চাচ্ছে না, ক্লাবগুলোও আবেদন করছে না। তাহলে আমরা কীভাবে দিই। তাদেরতো চাইতে হবে।’