ইয়াবার বড় করিডর হ্নীলা হোয়াইক্যং

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে বয়ে চলা নাফ নদ যেন মাদক চোরাকারবারিদের এক অঘোষিত স্বর্গরাজ্য। ভৌগোলিক অবস্থান ও দুর্গম সীমান্ত কাজে লাগিয়ে টেকনাফের হ্নীলা ও হোয়াইক্যং ইউনিয়ন এখন ইয়াবা পাচারের সবচেয়ে বড় করিডরে পরিণত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি সত্ত্বেও নানা কৌশলে নাফ নদ পার হয়ে দেশে ঢুকছে বড় বড় ইয়াবার চালান।

বিশেষ করে, টেকনাফের হ্নীলা-হোয়াইক্যং সীমান্ত সংলগ্ন নাফ নদ এখন ইয়াবা পাচারের প্রধান করিডরে রূপ নিয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান এবং মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সঙ্গে সীমান্ত সংযোগের সুবাদে এই অঞ্চলটি দেশের বৃহত্তম মাদকের প্রবেশদ্বার বা ‘হটস্পটে’ রূপ নিয়েছে। সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে আন্তর্জাতিক মাদক সিন্ডিকেটগুলো অভিনব প্রযুক্তির কৌশল ব্যবহার করছে।

ভৌগোলিক সুবিধা ও নতুন কৌশল : সরেজমিন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নাফ নদের জোয়ার-ভাটার সময় এবং হ্নীলা ও হোয়াইক্যং সীমান্তের দুর্গম চরাঞ্চলকে কাজে লাগিয়ে রাতের অন্ধকারে একের পর এক ইয়াবার চালান বাংলাদেশে ঢুকছে। তল্লাশি এড়াতে চোরাকারবারিরা এখন মাছ ধরার ট্রলার বা ডিঙি নৌকার নিচে বিশেষ কায়দায় প্লাস্টিকের ড্রাম বা বস্তা বেঁধে পানিতে ভাসিয়ে মাদক পাচার করছে। মোটা অঙ্কের টাকায় অনেক সময় স্থানীয় জেলেদের বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যার ফলে এই রুটটি মাদক সিন্ডিকেটের কাছে সবচেয়ে নিরাপদ রুট হয়ে উঠেছে।

রেকর্ড পরিমাণ চালান জব্দ : গত কয়েক মাসে বিজিবি ও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের বিভিন্ন অভিযানে হ্নীলা ও হোয়াইক্যং ইউনিয়ন সীমান্ত থেকে কোটি কোটি টাকা মূল্যের ইয়াবার বড় বড় চালান জব্দ করা হয়েছে। হ্নীলা-হোয়াইক্যং সীমান্ত দিয়ে নাফ নদ পার হওয়ার সময় প্রায়ই মাছ ধরার জাল ও নৌকার পাটাতনের নিচ থেকে লাখ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উখিয়া-টেকনাফে বিভিন্ন অভিযানে ১ কোটি ৪৫ লাখ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে। এর আগে ৩ ও ৪ সেপ্টেম্বর হ্নীলা ইউনিয়নের ওব্ররাং এলাকা থেকে ৩ লাখ পিস ইয়াবাসহ দুই আসামিকে আটক করা হয়। গত ১৯ সেপ্টেম্বর ভোরে উখিয়া ব্যাটালিয়নের (৬৪ বিজিবি) হ্নীলা বিওপির বিশেষ টহল দল সীমান্তবর্তী শ্মশানঘাট এলাকায় অভিযান চালিয়ে মালিকবিহীন ৪ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। ১১ এপ্রিল বিজিবি-৬৪ ব্যাটালিয়নের সদস্যরা টেকনাফের হ্নীলা এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ২৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা মূল্যের ৮ লাখ ৫৯ হাজার ৪০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে। এ ঘটনায় কাউকে আটক করা যায়নি। এ ছাড়া গত ৯ সেপ্টেম্বর বিজিবির ইতিহাসে বড় চালান হ্নীলা সুইচ গেট পোস্ট এলাকায় ১৪ লাখ পিস ইয়াবাসহ দুই পাচারকারীকে আটক করে।

আটক বা ধৃত ব্যক্তির সংখ্যা : মাদক পাচার ও চোরাচালানের অপরাধে বিজিবির এই একটি ব্যাটালিয়নই (৬৪ বিজিবি) গত ৯ মাসে টেকনাফ, হ্নীলা ও হোয়াইক্যং সীমান্ত সংলগ্নসহ  বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ২৪৩ জন মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার বা আটক করেছে। বিজিবি ছাড়াও কোস্ট গার্ড এবং এসআরবি পৃথক অভিযানে এই দুই ইউনিয়নে আরও বেশ কিছু ইয়াবার চালান এবং পাচারকারীকে আটক করা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে সীমান্তজুড়ে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করায় মাদক উদ্ধার ও কারবারি আটকের সংখ্যা পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ব্যাপারে বিজিবি-৬৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জহিরুল ইসলাম বলেন, মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন নাফ নদ ও হ্নীলা-হোয়াইক্যং পয়েন্ট দিয়ে মাদকের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। চোরাকারবারিরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল পরিবর্তন করছে। তবে আমাদের গোয়েন্দা তৎপরতা ও আধুনিক নাইট ভিশন ডিভাইসের সাহায্যে নাফ নদে ওপর নজরদারি বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে।’

কোস্ট গার্ড পূর্ব জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, ‘নাফ নদের জলসীমা অত্যন্ত সংবেদনশীল। চরাঞ্চল এবং দুর্গম ম্যানগ্রোভ বনের সুযোগ নিয়ে মাদক পাচারকারীরা অন্ধকারে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে। আমরা হ্নীলা এবং টেকনাফের উপকূলীয় এলাকায় ২৪ ঘণ্টা স্পিডবোট টহল সচল রেখেছি। সন্দেহভাজন প্রতিটি মাছ ধরার নৌকা তল্লাশি করা হচ্ছে এবং কোস্ট গার্ডের কঠোর অবস্থানের কারণে চোরাচালানের বহু চেষ্টা সফলভাবে নস্যাৎ করা সম্ভব হয়েছে।’

এ বিষয়ে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. আলী বলেন, শুধু অভিযান চালিয়ে নাফ নদের সীমান্ত পুরোপুরি সুরক্ষিত করা সম্ভব নয়। এর তীরবর্তী অরক্ষিত সীমান্ত পয়েন্টগুলোয় দ্রুত স্থায়ী কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং সিসিটিভি নজরদারি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকার বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করলে টাকার লোভে তারা মাদক বহনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়তেই থাকবে।’