প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঠেকানো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু দুর্যোগের কারণে প্রাণহানিসহ ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন নিরাপদ আবাসন, দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো, কার্যকর আগাম সতর্কবার্তা এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য সময়োপযোগী প্রস্তুতি। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলেও বন্যা, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, বজ্রপাত, তাপপ্রবাহ ও নগর দুর্যোগের ঝুঁকি এখনো বড় উদ্বেগের বিষয়।
জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসবিষয়ক দপ্তর (ইউএনডিআরআর) বলছে, মানুষ বাসগৃহ দুর্যোগের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভব করার জায়গা। আবার নিরাপদ আবাসন ও পরিবারের প্রস্তুতির মধ্য দিয়েই দুর্যোগসহনশীল সমাজ গড়ে তোলার সূচনা হতে পারে। এমন বাস্তবতায় আজ মঙ্গলবার পালন করা হবে ‘আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস’। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হচ্ছে সহনশীলতার শুরু ঘর থেকেই।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রতিপাদ্যটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন ও জীবিকা নদী, সমুদ্র, বৃষ্টিপাত এবং কৃষির ওপর নির্ভরশীল। উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা, নদীতীরবর্তী এলাকায় ভাঙন এবং শহরাঞ্চলে জলাবদ্ধতা ও অগ্নিকাণ্ড মানুষের নিরাপত্তাকে নিয়মিত ঝুঁকির মুখে ফেলছে। দুর্যোগের ক্ষতি সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। তবে দরিদ্র পরিবার, অনিরাপদ ঘরে বসবাসকারী মানুষ নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অনেক ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে ৩ লাখের মতো মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এরপর ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৮২ জন মানুষ মারা যায়। ওই দুটি দুর্যোগের পর সরকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ঘূর্ণিঝড়ের সময় প্রাণহানি কমিয়ে আনার কার্যক্রম শুরু করে। অনেকটা সফলও হয়। যার ফলে ২০২০ সালে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের সময় প্রায় ২৪ লাখ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়। আবহাওয়ার পূর্বাভাস, আশ্রয়কেন্দ্র, উপকূলীয় বাঁধ ও স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বিত ভূমিকা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান বলেন, আগে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় মূলত দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতো। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও সামাজিক সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে বিশ্বব্যাপী আগাম প্রস্তুতি ও ঝুঁকি হ্রাসের ওপর জোর দিচ্ছে। অতীতের দুর্যোগের তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য বিপদের ধরন ও তীব্রতা নিরূপণ এবং জনবসতি ও অবকাঠামোর দুর্বলতা চিহ্নিত করার মাধ্যমে আগেই ক্ষয়ক্ষতি কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এতে দুর্যোগ সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও উপযুক্ত পরিকল্পনা ও পূর্বাভাসের মাধ্যমে এর ঝুঁকি পরিমাপ করে ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা হ্রাস করা সম্ভব। প্রাকৃতিক বিপদকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলেও যথাযথ পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো যায়। ভূমিকম্পসহ অন্যান্য দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দুর্যোগের ক্ষতি কমাতে হবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে প্রাণহানি ও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে।
সংসদীয় কমিটির বৈঠকে উত্থাপিত ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়ের সময় প্রাণহানি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে অনেকটা সফলতা এলেও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে বিভিন্ন দুর্যোগে ৪৩ হাজার ৮২৯ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বন্যায়। পাঁচ বছরে বন্যায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ২৯ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। আর ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতি হয়েছে ১১ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া অগ্নিকাণ্ডে ২ হাজার ২০ কোটি, ভূমিকম্পে ১০৮ কোটি ও বজ্রপাতে ১০৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। একই সময়ে দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছেন ২ হাজার ৬৪০ জন। এর মধ্যে বজ্রপাতে ১ হাজার ৫৩০ জন এবং অগ্নিকাণ্ডে ৬৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে; যা মোট প্রাণহানির প্রায় ৮৩ শতাংশ। বাকি প্রাণহানি ঘটে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও পাহাড়ধসে। এ থেকে একটি বিষয় প্রতীয়মান হয়, বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশের অবকাঠামো, কৃষি, বসতবাড়ি ও জীবিকার ওপর ব্যাপক আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। বন্যায় ফসলি জমি, ঘরবাড়ি, সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হলে একদিকে মানুষের আয় কমে যায়, অন্যদিকে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে পুনর্বাসন ও পুনর্নির্মাণের ব্যয় বেড়ে যায়।
প্রাণহানি বেশি বজ্রপাত ও অগ্নিকাণ্ডে : পাঁচ বছরে সব মিলিয়ে দুর্যোগে প্রাণহানি ২ হাজার ৬৪০ জনের। এর মধ্যে ২০২১ সালে বিভিন্ন দুর্যোগে ৬০৩, ২০২২ সালে ৫৯১, ২০২৩ সালে ৫০৯, ২০২৪ সালে ৫৩৯ এবং ২০২৫ সালে ৩৯৮ জন মারা গেছেন। সর্বোচ্চ প্রাণহানি ছিল ২০২১ সালে। দুর্যোগে প্রাণহানির পরিসংখ্যানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র বজ্রপাতে। কৃষিকাজ, মাছ ধরা কিংবা খোলা জায়গায় কাজ করার সময় মানুষ বজ্রপাতের ঝুঁকিতে পড়েন। এ সময়ে বজ্রপাতে ১ হাজার ৫৩০ জন মারা গেছেন। আগাম সতর্কবার্তা, নিরাপদ আশ্রয়ের সুযোগ এবং মাঠপর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো গেলে এ ধরনের প্রাণহানি কমানোর সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে অগ্নিকাণ্ডে মারা গেছেন ৬৫৪ জন। অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রেও ভবনের নিরাপত্তা, বৈদ্যুতিক সংযোগের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, জরুরি নির্গমনপথ এবং দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া বন্যায় ১৯৭, পাহাড়ধসে ৯০ এবং ঘূর্ণিঝড়ে ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
আগাম সতর্কবার্তা ও আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় জোর : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জেলাভিত্তিক আশ্রয়কেন্দ্র ও স্বেচ্ছাসেবকদের তালিকা পরবর্তী বৈঠকে উপস্থাপন এবং তা স্থানীয় সংসদ সদস্যদের কাছে পাঠানোর সুপারিশ করা হয়। এ ছাড়া ঝুঁকি থাকা মানুষদের নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা, আশ্রয়কেন্দ্রের অবস্থান, ধারণক্ষমতা, ব্যবহার উপযোগিতা নিয়মিত যাচাইয়ের তাগিদ দেওয়া হয়।
অবকাঠামো ও উদ্ধার সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা : বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, সড়ক ও সেতু-কালভার্ট উন্নয়ন, উদ্ধার সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে ৫৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ সম্পন্ন করা এবং ৮৬৬টি সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের মাধ্যমে ৩৮ হাজার ১৯ মিটার অবকাঠামো গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। কর্মপরিকল্পনায় আগামী দুই বছরের ১০৭টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র, ৫০টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র এবং ১২২টি দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রস্তুতিই ক্ষতি কমানোর প্রধান উপায় : দুর্যোগ মোকাবিলায় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে। বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষেত্রে নিরাপদ অবকাঠামো ও আগাম সতর্কীকরণ যেমন প্রয়োজন, তেমনি বজ্রপাত ও অগ্নিকাণ্ডের মতো প্রাণঘাতী ঘটনাগুলো কমাতেও লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ জরুরি। আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবসের তাৎপর্য শুধু সচেতনতা তৈরিতে সীমাবদ্ধ নয়। ঝুঁকি শনাক্ত করা, নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা, স্থানীয় সরকার ও স্বেচ্ছাসেবকদের সক্ষমতা বাড়ানো এবং দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির নির্ভরযোগ্য তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও কার্যকর প্রস্তুতির মাধ্যমে দুর্যোগ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব না হলেও প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।