বসবাসের লোক নেই, আরও হচ্ছে নতুন ১৭৪টি ভবন

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মিত আবাসিক বাসার প্রায় অর্ধেক খালি পড়ে আছে। তারপরও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় আরও ১৭৪টি আবাসিক ইউনিট নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এতে ব্যয় হবে শতকোটি টাকার বেশি। এ অবস্থায় বিদ্যমান খালি বাসাগুলোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং নতুন বাসাগুলো কীভাবে কাজে লাগানো হবে, তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।

বিশ্ববিদ্যালয় এস্টেট অফিসের তথ্যমতে, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত ছয় ধরনের মোট ৪৭৪টি বাসার মধ্যে ২২৪টি বাসা খালি রয়েছে। এর মধ্যে ‘এ’ টাইপের ২৪টি বাসার ১২টি, ‘বি’ টাইপের ৬২টির মধ্যে ২৭টি, ‘সি’ টাইপের ৭৪টি মধ্যে ৩৮টি এবং ‘ডি’ টাইপের ১০৪টির মধ্যে ৩২টি খালি পড়ে আছে। অন্যদিকে, কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত ‘ই’ টাইপের ১১৮টি বাসার মধ্যে ৪৬টি এবং ‘এফ’ টাইপের ১০০টি বাসার মধ্যে ৭৯টি খালি রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, তুলনামূলক বেশি ভাড়া এবং নিজস্ব বাড়ি বা ফ্ল্যাটে থাকার সুযোগ থাকায় তারা ক্যাম্পাসের বাসায় থাকতে আগ্রহী না। সাভারের অরুণাপল্লী হাউজিং সোসাইটির তথ্য মতে, সেখানে প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষক বসবাস করছেন। এ ছাড়া আমবাগান, ইসলামনগরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকে নিজস্ব বাসা কিংবা বাড়ি থেকে যাতায়াত করেন। তাদের যাতায়াতের জন্য রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস।

নির্ধারিত বাসা খালি, টিনের ঘরে কর্মচারীরা : কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত ‘ই’ ও ‘এফ’ টাইপের বাসার বড় একটি অংশ খালি পড়ে থাকলেও কর্মচারীদের একাংশ ক্যাম্পাসের কলাবাগান ও রাঙ্গামাটি এলাকায় নিজেদের তৈরি টিনের ঘরে বসবাস করছেন। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কর্মচারীদের একটি অংশ এসব এলাকায় বসবাস করে আসছেন। কোয়ার্টারের বাসাভাড়াও বেশি। বাসাভাড়া কমানো হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ কর্মচারী কোয়ার্টারে থাকতে আগ্রহী হবেন।’

নতুন আবাসনে ব্যয় প্রায় শতকোটি টাকা : বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ২০১৮ সালে ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প’ অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় শিক্ষক, কর্মকর্তা, প্রভোস্ট, হাউস টিউটর ও হরিজন সম্প্রদায়ের জন্য ১৭৪টি আবাসিক ইউনিট নির্মাণের কাজও প্রায় শেষের দিকে। প্রকল্প কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষকদের জন্য ৪০টি এবং কর্মকর্তাদের জন্য ৪০টি ফ্ল্যাট নির্মাণে ২৮ কোটি টাকা করে মোট ব্যয় ৫৬ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এ ছাড়া প্রভোস্টদের জন্য ১৮টি আবাসিক ইউনিট নির্মাণে ১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা, হাউজ টিউটরদের জন্য ৩৬টি ইউনিটের ফ্ল্যাট করতে ১৯ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং হরিজন সম্প্রদায়ের জন্য ৪০টি আবাসিক ইউনিট নির্মাণে ১১ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এসব আবাসিক ভবন নির্মাণে মোট ব্যয় প্রায় ১০৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

নতুন আবাসনের আগে চাহিদা যাচাইয়ের পরামর্শ : বিদ্যমান আবাসিক বাসার প্রায় অর্ধেক খালি থাকার পাশাপাশি নতুন আবাসন নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ অবস্থায় নতুন বাসা নির্মাণের আগে পুরনোগুলোর ব্যবহার, খালি থাকার কারণ এবং ভবিষ্যতের চাহিদা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, নতুন করে আবাসন নির্মাণের আগে ক্যাম্পাসে আবাসনের প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ করা জরুরি। ভবিষ্যতে আরও কত আবাসনের প্রয়োজন হবে, সেটিও নিরীক্ষা করা দরকার। বিদ্যমান বাসাগুলো খালি হওয়ার কারণ খুঁজে দেখা প্রয়োজন ছিল। প্রকল্প গ্রহণের সময় কীভাবে নতুন আবাসনের চাহিদার যৌক্তিকতা উপস্থাপন করা হয়েছিল, সেটিও দেখা প্রয়োজন। নতুন ফ্ল্যাট  ও বিদ্যমান আবাসনের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতে অংশীজনের মতামত নেওয়া উচিত।

বাইরে থেকে হল পরিচালনা : আবাসিক হলগুলোর দায়িত্বে থাকা প্রভোস্টদের ক্যাম্পাসে সার্বক্ষণিক অবস্থানের শর্ত থাকলেও ২১টি হলের মধ্যে অন্তত ১১টি হলের প্রভোস্ট ক্যাম্পাসের বাইরে থেকে হল পরিচালনা করছেন। প্রভোস্টদের কেউ কেউ থাকছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি আমবাগান, ইসলামনগর ও গেরুয়া এলাকায়। আবার কেউ থাকেন অরুণাপল্লী কিংবা ঢাকায়। বেগম খালেদা জিয়া হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মঞ্জুর এলাহী বলেন, ‘বাচ্চাদের পড়াশোনার জন্য মূলত ঢাকায় থাকা হয়। তবে আমার বোনের বাসা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই ইসলামনগর এলাকায়। অনেক সময় সেখানেও থাকা হয়। তবে যেকোনো প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত হতে পারি।’ বেগম সুফিয়া কামাল হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা জানান, বাসার জন্য আবেদন করেও এখনো নির্ধারিত বাসায় উঠতে পারিনি। গত বছরের অক্টোবরে বাসার জন্য আবেদন করি। কিন্তু এত দিনেও বুঝে পাইনি। শহীদ রফিক-জব্বার হলের প্রভোস্ট ড. আবদুস সাত্তার বলেন, ‘আমি গেরুয়া বাজারে থাকি। আমার হলের কোনো প্রভোস্ট বাংলো নেই। হাউজ টিউটরদেরও বাসা নেই।’

প্রভোস্ট কমিটির চেয়ারম্যান ও শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. খোন্দকার লুৎফুল এলাহী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী প্রভোস্টদের জন্য নির্ধারিত বাসা থাকার কথা। তবে বিশ্ববিদ্যালয় এখনো সব প্রভোস্টের জন্য সেই আবাসনের ব্যবস্থা করতে পারেনি। অবশ্য প্রভোস্ট কোয়ার্টারের কাজ চলমান রয়েছে, যেখানে ১৮ জন প্রভোস্ট থাকতে পারবেন। আমি আল-বেরুনী হলসংলগ্ন বাসায় অবস্থান করছি।’

খালি বাসা ব্যবহারে প্রশাসনের কী পদক্ষেপ : খালি পড়ে থাকা বাসাগুলোর ব্যবহারে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ বিষয়ে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষক নিয়োগের সময়ই বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায় অবস্থানের বিষয়টি নিয়োগ-সংক্রান্ত শর্তে উল্লেখ থাকে। তবে এরপরও অনেক শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ে বসবাস করেন না।’ নতুন আবাসন নির্মাণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নতুন বাসাগুলোর নির্মাণকাজ শেষ হলে এর ব্যবহার নিয়ে সরকার ও ইউজিসির সঙ্গে আলোচনা করব। খালি থাকা বাসাগুলো কীভাবে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত বা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাবাগান ও রাঙ্গামাটি এলাকায় কর্মচারীদের বসবাসের বিষয়ে নজরুল ইসলাম বলেন, ‘কর্মচারীরা সেখানে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছেন। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংরক্ষণ কমিটির পক্ষ থেকে কিছু পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কোনো কর্মচারী অবসরে গেলে সংশ্লিষ্ট বাসাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনা হবে, যাতে অন্য কারও কাছে তারা বাসাটি বরাদ্দ দিতে না পারেন। এভাবেই কমানো যেতে পারে।’

ওই এলাকাগুলোয় বিদ্যুতের মিটার টেম্পারিংয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে উপ-উপাচার্য বলেন, ‘সেখানে বিদ্যুতের মিটার টেম্পারিংয়ের ঘটনা ঘটছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যুৎ বাবদ মাসে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। এ বিষয়ে পরবর্তী সভায় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সেখানে প্রত্যেকের আলাদা মিটার থাকবে এবং সেই অনুযায়ী বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হবে।’

প্রভোস্টদের আবাসন বিষয়ে অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব আবাসিক বাসা রয়েছে, সেগুলো প্রভোস্টরা চাইলে ব্যবহার করতে পারেন। এ ছাড়া প্রভোস্টদের জন্য নির্ধারিত ১৮টি বাসার নির্মাণকাজ শেষ হলে প্রতিটি হলের প্রভোস্টের জন্য বাসা নির্ধারণ করা হবে। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নোটিস দিয়ে তাদের হলে অবস্থানের জন্য আহ্বান জানানো হবে।’