ন্যাশনাল ব্যাংককে ৭ হাজার কোটি টাকা সোনালীর ঋণ

তারল্য সংকটে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংককে গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতে ৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে সোনালী ব্যাংক। তবে এই বিপুল অঙ্কের অর্থ সময়মতো ফেরত দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ন্যাশনাল ব্যাংক ঋণের অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান। আরিফ হোসেন খান বলেন, ন্যাশনাল ব্যাংকের তারল্য সংকটের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সোনালী ব্যাংকের পক্ষ থেকে সহায়তার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গতকাল মঙ্গলবার তিনি এ তথ্য জানান।  

সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শওকত আলী খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ন্যাশনাল ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগের অংশ হিসেবে সাত হাজার কোটি টাকা ছাড়ের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ন্যাশনাল ব্যাংকের তারল্য সংকট মোকাবিলা এবং গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে সহায়তা হবে। আমানতকারীরা যাতে তাদের জমা টাকা ফেরত পেতে পারেন, সে লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) বৈঠকে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। গ্রাহকরা যে পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করতে চাইবেন, তাদের সেই পরিমাণ অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ন্যাশনাল ব্যাংকের তারল্য সংকট থাকলেও গ্রাহকরা ব্যক্তিগতভাবে নানা সংকটে রয়েছেন। তাই ব্যাংকের তারল্য সংকটের অজুহাতে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়া থেকে বিরত থাকা যাবে না। প্রয়োজনে ধার করে হলেও গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলনের চাহিদা পূরণ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, অতীতে কিছু ব্যাংকে আমানত ফেরতের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নিয়ে অভিযোগ উঠেছিল। ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত ব্যক্তিরা আগে টাকা পেয়েছেন, অথচ সাধারণ গ্রাহকরা বঞ্চিত হয়েছেন, এমন অভিযোগের সত্যতা যা-ই হোক, ন্যাশনাল ব্যাংকের ক্ষেত্রে এ ধরনের অভিযোগ কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। সব গ্রাহককে তাদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ দিতে হবে।

ন্যাশনাল ব্যাংককে অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, ঋণগ্রহীতা ব্যাংকটি সময়মতো সেই অর্থ ফেরত দিতে পারবে কি না। কারণ, যে ব্যাংক নিজেই দীর্ঘদিন ধরে তারল্য সংকটে রয়েছে, তার পক্ষে নতুন করে ঋণের অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘদিন ধরে অর্থ উত্তোলনে সীমাবদ্ধতায় থাকা ন্যাশনাল ব্যাংকের গ্রাহকদের জন্য আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে ফেরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য গত ১১ অক্টোবর থেকে গ্রাহকদের নিজ নিজ শাখায় অর্থ উত্তোলনের চাহিদা জানিয়ে আবেদন জমা নেওয়া শুরু হয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, গ্রাহকরা শাখার কাউন্টার, এটিএম বুথ, অ্যাপ ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ পাবেন। তবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নগদ অর্থের সংস্থান এবং গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ সরবরাহ নিশ্চিত করাই হবে ব্যাংকটির জন্য বড় পরীক্ষা।

সোনালী ব্যাংকসহ অন্য ব্যাংক থেকে পাওয়া অর্থ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় ন্যাশনাল ব্যাংকের গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াকে কতটা গতিশীল করতে পারে, তা নির্ভর করবে অর্থের প্রকৃত পরিমাণ, সরবরাহের সময় এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ওপর।

খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, অন্য ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়ে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ সাময়িকভাবে নগদ অর্থের সংকট কমাতে পারে। কিন্তু ধার করা অর্থ পরিশোধের জন্য ন্যাশনাল ব্যাংককে নিজস্ব তহবিলের সংস্থান, ঋণ আদায় ও নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। অন্যথায় একদিকে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে গিয়ে অন্যদিকে ঋণ পরিশোধের চাপ তৈরি হতে পারে।