প্লাস্টিকে শ্বাসরোধ লেম্বুরবনের

বঙ্গোপসাগর থেকে একের পর এক ঢেউ আছড়ে পড়ছে তীরে। স্রোতের টানে সরে যাচ্ছে সৈকতের বালু, এতে উন্মুক্ত হয়ে পড়ছে কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা গেওয়া গাছটির শিকড়। পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় লেম্বুরবন সৈকতে এই গাছের শিকড়ে আটকে আছে অসংখ্য প্লাস্টিক আর জেলেদের ফেলে যাওয়া ছেঁড়া জাল। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন গাছটি নিজের গলায় নিজেই ফাঁসি লাগিয়েছে! শুধু এই গেওয়া গাছটিই নয়, সমুদ্রের ভায়ন আর উপকূলীয় বর্জ্যরে চাপে এখন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে লেম্বুরবনের জীববৈচিত্র্য।

কুয়াকাটা সৈকতে সংলগ্ন লেম্বুরবনের আয়তন প্রায় ১ হাজার ৯০৪ একর। এটি উপকূলীয় অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বনভূমি। এ বনে গেওয়া, কেওড়া, বাইন, গড়ান, খইয়া বাবলা, ঝাউ, আকাশমণিসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রয়েছে। এসব বৃক্ষ উপকূলীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, মাটিক্ষয় রোধ এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু লেম্বুরবন বিচের পার্শ্ববর্তী এলাকায় পরিত্যক্ত ও ছেঁড়া জালের কারণে বনজ সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। প্রায় ৩০০ মিটার এলাকাজুড়ে এসব জালের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। এসব জাল গাছের কা- ও শিকড়ে আটকে এর ক্ষতিসাধন করছে।

বন বিভাগ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বলে জানিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পরিত্যক্ত জাল শনাক্ত ও অপসারণের পাশাপাশি গাছ ও শিকড়ের ক্ষতি কমাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় জেলে ও সংশ্লিষ্টদের পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল সাগর বা বনাঞ্চলের পাশে না ফেলার বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে।

বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরা স্থানীয় জেলে সোহেল মাঝি বলেন, সাগর থেকে ফেরার পর ছেঁড়া বা নষ্ট জাল অনেক সময় নৌকার আশপাশেই ফেলে রাখা হয়। মাছ ধরার সময় জালের ছেড়া অংশ সমুদ্রে ভেসে যায়। আবার সৈকতে জাল মেরামতের সময় কাটা বা ছেঁড়া অংশও আশপাশে পড়ে থাকে। জেলেদের জন্য জাল ও জালের বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট ব্যবস্থা করা হলে তারা সেখানে ফেলবেন। লেম্বুরবনের ব্যবসায়ী ফারুক বলেন, সৈকতে পর্যটকদের ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নানা ধরনের বর্জ্যও পড়ে থাকে। ছেঁড়া জালও পড়ে থাকতে দেখা যায়। এগুলো গাছপালা ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। নির্দিষ্ট জায়গায় জাল ও বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা থাকলে সবাইকে সেখানে ফেলতে উৎসাহিত করা যেত।

পরিবেশকর্মী নজরুল ইসলাম বলেন, সৈকতে বিক্ষিপ্তভাবে মাছ ধরার জালের ছেঁড়া অংশ ফেলার কারণে একদিকে সৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী ক্ষতির মুখে পড়ছে। প্লাস্টিক ও নাইলনের তৈরি পরিত্যক্ত জাল দীর্ঘদিন প্রকৃতিতে থেকে যায়। এসব জাল পর্যটকদের জন্যও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে। কুয়াকাটার সৈকত ও লেম্বুরবনকে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটিকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

ব্লু অ্যাকশন ফান্ডের অর্থায়নে পরিচালিত ডব্লিউসিএস ও ওয়ার্ল্ডফিশের সমন্বয়ে বাস্তবায়িত ‘সুস্থ সাগর’ প্রকল্পের গবেষণা সহকারী মো. বখতিয়ার রহমান বলেন, পরিত্যক্ত বা হারিয়ে যাওয়া জালে মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, কচ্ছপ, ডলফিন, তিমিসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী আটকে মারা যেতে পারে। সমুদ্রের তলদেশে আটকে থাকা জাল প্রবাল, সি, গ্রাসসহ বিভিন্ন জলজ আবাসস্থলের ক্ষতি করতে পারে। নাইলনসহ কৃত্রিম উপাদানে তৈরি এসব জাল সহজে পচে না। হারিয়ে যাওয়া জালে দীর্ঘ সময় অনিয়ন্ত্রিতভাবে মাছ ধরতে থাকলে তাতে মাছের মজুদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হয়।

বখতিয়ার রহমানের মতে, শুধু জাল পানিতে না ফেলার সচেতনতা তৈরি করলেই হবে না। জাল কেনা থেকে ব্যবহার, হারিয়ে গেলে রিপোর্ট করা, উদ্ধার ও পুনর্ব্যবহার পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। জালে মালিক বা নৌকার পরিচয় নম্বর যুক্ত করা, পুরনো ও ছেঁড়া জাল ফেরত দিলে প্রণোদনা দেওয়া এবং কুয়াকাটা, আলীপুর ও মহিপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ মাছ অবতরণকেন্দ্রে জাল সংগ্রহকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, স্বেচ্ছাসেবী দলগুলোর মাধ্যমে উপকূল ও সৈকতে পড়ে থাকা পরিত্যক্ত জাল নিয়মিত সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট কেন্দ্রে জমা দেওয়া এবং পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা করা দরকার। পাশাপাশি নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ ও জেলেদের প্রশিক্ষণ জরুরি।

বন বিভাগের লেম্বুরবন বিট কর্মকর্তা আমির হামজা বলেন, গেওয়া গাছ উপকূলীয় পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের গাছের শিকড় মাটি ও বালু ধরে রাখতে সহায়তা করে এবং উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। কিন্তু সমুদ্রের ঢেউ ও স্রোতের কারণে বালু সরে গিয়ে গাছটির শিকড় উন্মুক্ত হয়ে পড়ায় এটি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে পরিত্যক্ত জাল শিকড় ও কা-ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকলে গাছটির স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও টিকে থাকা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এই জাল অপসারণসহ সমুদ্রসৈকতে পরিত্যক্ত জাল না ফেলার বিষয়ে জেলে ও সংশ্লিষ্টদের সচেতন করা হবে।

ট্যুরিস্ট পুলিশ কুয়াকাটা জোনের পরিদর্শক মো. নাজমুল হাসান বলেন, জেলেদের পরিত্যক্ত জালে পরিবেশের ক্ষতির পাশাপাশি সৈকতের সৌন্দর্যও নষ্ট হচ্ছে। গভীর সমুদ্রে জাল ফেলে দেওয়া জেলেদের শনাক্ত করা কঠিন। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা সভায় মহিপুর ও আলীপুর মাছবাজারের গদি মালিকদের জানানো হবে। পাশাপাশি সৈকত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে পৌরসভাকেও অবহিত করা হবে। ট্যুরিস্ট পুলিশের সদস্যরা লেম্বুরবন, তিন নদীর মোহনা, কাউয়ারচর ও গঙ্গামতির চর এলাকায় দায়িত্ব পালনের সময় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে সমুদ্রে পরিত্যক্ত জাল না ফেলার বিষয়ে সচেতন করবেন। এরপরও কেউ এ ধরনের কাজ করলে এবং তা শনাক্ত হলে আইন অনুযায়ী জেল-জরিমানার ব্যবস্থা করা হবে।

কলাপাড়া ইউএনও মো. আরিফুজ্জামান বলেন, সৈকতে পরিত্যক্ত জাল ও অন্যান্য বর্জ্য অপসারণে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে সৈকতে এ ধরনের জাল ও বর্জ্য না ফেলা হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সচেতন করা হবে। হয়তো গেওয়া গাছটি কথা বলতে পারে না। কিন্তু মাটি থেকে বেরিয়ে আসা তার  শিকড় যেন বলছে, ‘আমার মাটিটুকু ফিরিয়ে দাও।’ ছেঁড়া জালে জড়িয়ে থাকা কা- যেন বলছে, ‘আমার গলাটা একটু খুলে দাও।’ আর সমুদ্রের দিকে ঝুঁকে পড়া ডালপালা যেন বলছে ‘আমি এখনও বাঁচতে চাই।