নরকে স্বর্গীয় জয় বার্সেলোনার

ইস্তাম্বুলের রামস পার্কের নরকতুল্য গ্যালারি আর স্বাগতিক দর্শকদের কানফাটা গর্জন, কোনো কিছুই দমাতে পারলো না হান্সি ফ্লিকের দুর্বার বার্সেলোনাকে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে গালাতাসারাইয়ের আতিথেয়তা নিতে গিয়ে শুরুতেই গোল খেয়ে ব্যাকফুটে চলে গিয়েছিল কাতালানরা। তবে সেই এক গোলের ধাক্কা হজম করেই যেন জেগে উঠলো বার্সার আসল রূপ! এরপর নিখুঁত পরিকল্পনা আর একের পর এক অলৌকিক আক্রমণের তোড়ে স্বাগতিকদের রক্ষণভাগ চুরমার করে দিয়ে ৪-১ গোলের বিশাল জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছে স্প্যানিশ জায়ান্টরা। 

প্রথমার্ধের ধাক্কা সামলে দ্বিতীয়ার্ধে প্রতিপক্ষের জালে গোলবন্যা ভাসিয়ে চলতি মৌসুমে টানা ১০ ম্যাচে জয়ের ধারা অব্যাহত রাখলো ফ্লিকের শিষ্যরা।

ম্যাচের শুরু থেকেই রাজত্ব করছিল বার্সেলোনা। কিন্তু গ্যালারির গর্জনকে পুঁজি করে খেলার ধারার বিপরীতে ২৭তম মিনিটে প্রথম বিপত্তি ঘটায় গালাতাসারাই। বক্সে অ্যান্থনি গর্ডন পড়ে যাওয়ার সুযোগে এক তীব্র পাল্টা আক্রমণে ওঠে তুর্কি ক্লাবটি। বাঁ প্রান্ত দিয়ে এগোয় রাফায়েল লেয়াও, সেখান থেকে বক্সে ফাঁকায় থাকা অলেক্সি বাত্রাকভকে বাড়ানো বল তার জোরালো শটে বার্সা ফুলব্যাক জোয়াও কানসেলোর পায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে জালে জড়িয়ে যায় (১-০)। হুট করে খাওয়া এই গোল কিছুটা থমকে দিয়েছিল কাতালানদের।

দলটির তরুণ মিডফিল্ডার ফেরমিন লোপেজ ম্যাচ শেষে স্প্যানিশ সম্প্রচারমাধ্যম মোভিস্তারকে বলেন, ‘ওই গোলটি আমাদের জন্য সবকিছু কিছুটা অদ্ভুত করে তুলেছিল, কারণ আমরাই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ রাখছিলাম। তবে আমরা জানতাম কীভাবে এর সঠিক প্রতিক্রিয়া জানাতে হয় এবং ম্যাচে ফিরে আসতে হয়।’ 

এক গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়ার সেই থমথমে পরিস্থিতি থেকে দলকে টেনে তোলেন স্বয়ং কানসেলোই। গালাতাসারাইয়ের ভুল পাস থেকে পাওয়া বল দানি ওলমোর বাড়িয়ে দেওয়া সূক্ষ্ম থ্রু পাস ধরে বক্সে ঢুকে দারুণ এক ফিনিশিংয়ে বিরতির আগেই (৩৭তম মিনিটে) সমতা ফেরান এই পর্তুগিজ ডিফেন্ডার (১-১)।

বিরতির পর শুরু হয় ১৯ বছর বয়সী বিস্ময় বালক লামিন ইয়ামালের একচ্ছত্র জাদু। ৫০তম মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে তার হাওয়ায় ভেসে আসা মাপা ক্রস বক্সে খুঁজে নেয় লোপেজকে, যা দুর্দান্ত হেডে জালে পাঠিয়ে বার্সাকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন তিনি।

ইয়ামাল জাদু থামেনি সেখানেই। ৩ মিনিট পরেই গালাতাসারাইয়ের ডিফেন্ডার এরেন এলমালিকে বক্সে এক চুল জায়গায় তিনবার তিন ভিন্ন দিকে ড্রিবলিংয়ে পরাস্ত করে বল বাড়িয়ে দেন গোলপোস্টের ঠিক সামনে। সেখান থেকে সহজ আলতো আলতো স্পর্শে বল জালে পাঠাতে ভুল করেননি ইংলিশ ফরোয়ার্ড অ্যান্থনি গর্ডন (৩-১)। 

৬৫তম মিনিটে চতুর্থ গোলের নেপথ্যেও ছিলেন ইয়ামাল; তার বাড়ানো বল প্রতিপক্ষ বক্সে এলে বদলি নামা গ্যাব্রিয়েল জেসুস নিয়ন্ত্রণে নিতে ব্যর্থ হন, কিন্তু পাশে থাকা কারিম আদেইমি বুলেট গতির শটে স্কোরলাইন ৪-১ করে গালাতাসারাইয়ের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন।

গোল না পেলেও দুই অ্যাসিস্ট ও চার গোলের পেছনে মূল ভূমিকা রেখে ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন ইয়ামাল। তার এমন বিধ্বংসী পারফরম্যান্স নিয়ে ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বার্সেলোনা কোচ হান্সি ফ্লিক বলেন, ‘লামিনে দ্বিতীয়ার্ধে অসাধারণ খেলেছে। এই স্তরে ওর মতো একজন খেলোয়াড় থাকাটা সত্যি অবিশ্বাস্য। সে একাই আমাদের জন্য ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।’ 

ইস্তাম্বুলে এক গোল খেয়ে প্রতিপক্ষের জালে চার গোল জড়ানোর পর সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে চলতি মৌসুমে ৪৩ গোল পূর্ণ হলো বার্সেলেনোর। তবে এমন দুর্দান্ত সূচনাতেও আবেগে ভেসে না গিয়ে ট্রফি নিশ্চিত করার প্রতি জোর দিয়েছেন বার্সা বস। ‘ফুটবল খুব দ্রুত বদলে যেতে পারে। আমাদের এই ফর্মের ওপর পূর্ণ আস্থা রয়েছে, কিন্তু আমাদের মূল লক্ষ্য শিরোপা জেতা। অক্টোবরে কোনো ট্রফি পাওয়া যায় না; মে কিংবা জুনে আসল বড় শিরোপাগুলোর ফয়সালা হয়।’

চ্যাম্পিয়নস লিগে কাতালানদের পরের ম্যাচ পিএসজির বিপক্ষে, আগামী ২০ অক্টোবর। এর লা লিগায় আগামী শনিবার রিয়াল বেতিসের বিপক্ষে খেলবে বার্সেলোনা।