এক মাসে শাহ আমানত বিমানবন্দরে ৯ দফা চুরি, ঝুঁকিতে উড্ডয়ন-অবতরণ

চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট ওঠানামা চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর এলাকা থেকে সংঘবদ্ধ চোর চক্র রাতের আঁধারে ভূগর্ভস্থ ক্যাবল, রানওয়ের লাইট, লাইটিং ট্রান্সফরমারসহ বিপুল পরিমাণ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চুরি করে নিয়ে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গত এক মাসে রানওয়ে ও স্পর্শকাতর ‘ভিওআর’ (ভয়েস ওভার রেঞ্জ) এলাকা থেকে ৯ দফা চুরির ঘটনা ঘটেছে। 

চোরের দল বিমানবন্দরের সীমানার ভেতরে স্পর্শকাতর এলাকায় ঢুকে উড়োজাহাজের উড্ডয়ন-অবতরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্ধকোটি টাকার বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চুরি করে নিয়ে গেছে। অভিযোগ রয়েছে, সম্প্রতি সংঘবদ্ধ চোর চক্রের এক সদস্যকে চুরি করা মালামালসহ হাতেনাতে আটক করেও ছেড়ে দিয়েছেন নিরাপত্তা শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নিরাপত্তা শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চরম গাফিলতি ও অবহেলার কারণে প্রতিনিয়ত এসব চুরির ঘটনা ঘটছে। এ নিয়ে বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) সন্ধ্যায় মুঠোফোনে জানতে চাইলে গত এক মাসে ৯ দফা চুরির বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা শাখার প্রধান তারেক জিয়াউদ্দীন সজিব। এ বিষয়ে বিমানবন্দরের পরিচালকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিয়ে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।
এ বিষয়ে সিভিল এভিয়েশনের মেম্বার সেক্রেটারি এয়ার কমোডর নাঈমুজ্জামান শাহ আমানত বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর এলাকা থেকে একাধিকবার বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চুরির ঘটনা স্বীকার করে বলেন, ‘যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’ তবে একই বিষয়ে বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে কল করা হলেও সাড়া দেননি শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মো. নুর হোসেন। পরে তাঁর মুঠোফোনে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।

জানা গেছে, আগামী ২৬ অক্টোবর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ইউনিভার্সাল সিকিউরিটি অডিট প্রোগ্রাম কন্টিনিউয়াস মনিটরিং অ্যাপ্রোচ (ইউএসএপি-সিএমএ) অডিট করতে আসার কথা রয়েছে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) নিরাপত্তা অডিট দলের। তারা বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদর দপ্তর, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, হযরত শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিমান নিরাপত্তাব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন কাঠামো খতিয়ে দেখবে।

এমন পরিস্থিতিতে মানোন্নয়ন সূচকে চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দর কতটা এগোবে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের অভিযোগ, গত এক মাসে বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর ভিওআর এলাকা থেকে ৯ বার চুরির ঘটনা ঘটলেও বেবিচক তো দূরের কথা, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকেও বিষয়টি জানায়নি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।


তথ্যসূত্র বলছে, গত এক মাসে বিমানবন্দরের এয়ারসাইডে (যেসব স্থানে উড়োজাহাজ চলাচল ও অবস্থান করে) রানওয়ের লাইট, লাইটিং ট্রান্সফরমার, সেকেন্ডারি ক্যাবল কিট, ৫০০ গজ দূরত্বের স্ট্রিট লাইট, তামার ক্যাবল, ভিওআরের পাওয়ার ক্যাবল (ভিএইচএফ) এবং বৈদ্যুতিক ক্যাবলসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম চুরির ৯টি ঘটনা ঘটেছে। দফায় দফায় স্পর্শকাতর এলাকা থেকে চুরি হলেও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে সদর দপ্তরকে বিষয়টি জানায়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ৬ অক্টোবর দিবাগত রাত সোয়া ৯টায় এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (এটিসি) থেকে বিমানবন্দরের ইলেকট্রোমেকানিক্যাল বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্তদের জানানো হয়, পতেঙ্গা বোট ক্লাব থেকে পশ্চিম দিকে সমুদ্রসৈকতের দিকে সাড়ে ১০ হাজার ফুট দূরত্বে রানওয়ের ২৩ থেকে ০৫ এলাকা পর্যন্ত অ্যাপ্রোচ লাইট জ্বলছে না। এ সময় বৈদ্যুতিক শাখার কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে রানওয়ের অ্যাপ্রোচ লাইট না জ্বলার প্রমাণ পান। সেদিন চোরের দল ২০টি ট্রান্সফরমারের সেকেন্ডারি কিট ও রানওয়ের লাইটসহ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চুরি করে নিয়ে যায়।

এর আগে গত ৯ অক্টোবর সংঘবদ্ধ চোরের দল রানওয়ের ২৩ নম্বর অ্যাপ্রোচ এলাকা থেকে মাটির পাঁচ ফুট নিচে থাকা ভূগর্ভস্থ বৈদ্যুতিক ক্যাবল কেটে তামার তার চুরি করে নিয়ে যায়। এ সময় চোরের দল কাটা ক্যাবলের ওপরের ইনসুলেশন বা আবরণ রেখে দেয়। এ ছাড়া ২৩ নম্বর অ্যাপ্রোচ এলাকায় রানওয়ের লাইটিং সিস্টেমের ম্যাগনেটিক কন্টাক্ট, লুপিং ক্যাবল, ডিভাইস ও ভূগর্ভস্থ ক্যাবল চুরি করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।

এর আগে গত ২৪ সেপ্টেম্বর কার্গো শাখার পশ্চিম প্রান্ত থেকে রানওয়ের শেষ প্রান্তের ০৫ নম্বর অ্যাপ্রোচ এলাকার সিকিউরিটি লাইটের ক্যাবল কেটে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। ক্যাবল চুরির কারণে দুই দিন ওই এলাকা অন্ধকারে ছিল। এ সময় নিরাপদে অবতরণ করতে না পেরে কয়েকটি উড়োজাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে হয় বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

এদিকে বিমানবন্দরের দক্ষিণ প্রান্তে নিজাম মার্কেটের ঠিক সামনের সীমানার ভেতর থেকে গত এক মাসে দুইবার বৈদ্যুতিক ক্যাবল চুরির ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে সূত্রটি। তাদের ভাষ্য, বিমানবন্দরের সবচেয়ে স্পর্শকাতর এলাকাগুলোর একটি হলো ভিওআর (ভেরি হাই ফ্রিকোয়েন্সি ওমনি-ডিরেকশনাল রেঞ্জ)। উড়োজাহাজের নেভিগেশনে এ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্পর্শকাতর এ এলাকা থেকে একাধিকবার ক্যাবল চুরির ঘটনা ঘটেছে। বারবার ভূগর্ভস্থ ক্যাবল চুরির কারণে বিকল্প হিসেবে ওভারহেড লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল করা হয়। কিন্তু সেখান থেকেও চোরের দল ক্যাবল চুরি করে নিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিমানবন্দর সূত্র জানায়, এর আগে ভিওআর এলাকা থেকে বৈদ্যুতিক ক্যাবল চুরির সময় মালামালসহ চোর চক্রের এক সদস্যকে কর্তব্যরত আনসার সদস্যরা হাতেনাতে আটক করে নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের কাছে সোপর্দ করেন। তবে ওই ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে বিমানবন্দর আবাসিক এলাকার জাপানি গেট থেকে ২০ গজ দূরত্বের মধ্যে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) হ্যাঙ্গার এলাকা থেকে চোরের দল ১২ হাজার কিলোভোল্টের বৈদ্যুতিক ক্যাবল কেটে নিয়ে গেছে বলে জানা গেছে। অথচ বিমানবন্দর আবাসিক এলাকার জাপানি গেটসহ তিনটি গেটে বেবিচকের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিমানবন্দরের সীমানা এলাকায় আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ করা অদক্ষ আনসার সদস্যদের দিয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শাহ আমানত বিমানবন্দরের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, গত এক বছরে বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর এলাকা থেকে বহুবার গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চুরি হয়েছে। কয়েক দিন আগেও রানওয়ের লাইট দৃশ্যমান না হওয়ার বিষয়টি এটিসিকে জানিয়েছেন দেশি-বিদেশি কয়েকটি এয়ারলাইনসের পাইলট।

সূত্রমতে, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রতিদিন ১৮ থেকে ২৪টি আন্তর্জাতিক এবং ৩২ থেকে ৪০টি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে প্রায় সাড়ে চার হাজার যাত্রী ওঠানামা করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘আইকাও অডিটে কাগজে-কলমে থাকা প্রটোকলের চেয়ে মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রয়োগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শাহ আমানত বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর এলাকা থেকে বারবার গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চুরির ঘটনা নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আইকাও কোনো নির্দিষ্ট বিমানবন্দর নয়, বরং দেশের সামগ্রিক এভিয়েশন নিরাপত্তা তদারকি ও বাস্তবায়নব্যবস্থা খতিয়ে দেখবে। এ সময় তাদের মুখোমুখি হতে হবে শাহ আমানত বিমানবন্দরের নিরাপত্তা শাখার কর্মকর্তাদের।’

ওই বিশেষজ্ঞের ভাষ্য, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা শাখায় সাতজন কর্মকর্তা রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য চারজন হলেন তারেক জিয়াউদ্দীন সজিব, বাদশা ফয়সাল, পলাশ সাহা ও রাশেদুল ইসলাম। প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা তারেক জিয়াউদ্দীন সজিব। সাতজনের মধ্যে চলতি বছরের শুরুতে তিনজন নিয়োগ পেয়েছেন। বাকি চারজন নিয়োগ পেয়েছেন ২০২৩ সালে। অভিযোগ রয়েছে, সাতজন একই ব্যাচের হওয়ায় তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় ও চেইন অব কমান্ডের ঘাটতি রয়েছে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত জনবল থাকা সত্ত্বেও নিরাপত্তা শাখার কার্যক্রমে গতি আসছে না। চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থায় চারটি ইউনিট রয়েছে। এগুলো হলো বেবিচকের নিরাপত্তা শাখা, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), বিমানবাহিনীর টাস্কফোর্স ও আনসার সদস্যরা। এসব ইউনিটের কার্যক্রম সমন্বয় করে বেবিচকের নিরাপত্তা শাখা।

বিমানবন্দরের নিরাপত্তা শাখার অধীনে ১৫০ জন কর্মচারী, বিমানবাহিনীর টাস্কফোর্সের ১৮০ জন সদস্য, এপিবিএনের অর্ধশত সদস্য এবং ২০০ জন আনসার সদস্য রয়েছেন। নিরাপত্তা শাখার সাত কর্মকর্তার কেউই এখন পর্যন্ত শিক্ষানবিশ পর্যায় অতিক্রম করতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম আন্তর্জাতিক এ বিমানবন্দরে সদ্য যোগ দেওয়া পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মো. নুর হোসেন নিরাপত্তাব্যবস্থাপনা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।