প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ পেলেন ভোলার সেই বৃক্ষপ্রেমী ইমাম

পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে নার্সারি গড়ে তোলা, নিজের অর্থ ও শ্রমে তিন দশকের বেশি সময় ধরে হাজার হাজার গাছ লাগানো—ভোলার চরফ্যাশনের ইমাম মো. রেজাউল কিবরিয়া বাবুলের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ এবার পৌঁছেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন রেজাউল কিবরিয়া বাবুল। এ সময় তার দীর্ঘদিনের বৃক্ষরোপণ উদ্যোগের প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী এবং এ ধরনের জনকল্যাণমূলক কাজ অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

নিজ নিজ কাজ ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগের মাধ্যমে সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী আরও দুজনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পান বাবুল। তারা হলেন বুয়েট থেকে পাস করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা বেছে নেওয়া নায়লা শারাফ এবং দুই হাত না থাকা সত্ত্বেও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা মো. আলতাফ হোসেন।

MixCollage-14-Oct-2026-09-47-PM-4531

প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তাদের জীবনসংগ্রাম ও সমাজকল্যাণমূলক কাজের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। তাদের উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, ‘দেশ গঠনে আপনাদের মতো মানুষের অনেক প্রয়োজন। আপনাদের মতো সবাই এগিয়ে এলে দেশ গঠন সহজ হবে।’

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন ভোলার এই বৃক্ষপ্রেমী ইমাম। এর আগে তার দীর্ঘদিনের বৃক্ষরোপণ উদ্যোগ নিয়ে দেশ রূপান্তরে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেই প্রতিবেদনে উঠে আসে, কীভাবে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে নার্সারি গড়ে তুলে তিনি গ্রামের সড়কগুলোকে সবুজে সাজানোর কাজ শুরু করেছিলেন।

চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা রেজাউল কিবরিয়া বাবুল (৬০) কালাপানিয়া বাজারের বাইতুল মামুর জামে মসজিদে প্রায় দুই যুগ ধরে ইমামতি করছেন। ইমামতির পাশাপাশি ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় আট লাখ টাকা দিয়ে ভূঁইয়ারহাট এলাকায় একটি নার্সারি গড়ে তোলেন তিনি। সেখান থেকে চারা উৎপাদন ও সংগ্রহ করে এলাকার বিভিন্ন সড়কের পাশে গাছ লাগাতে শুরু করেন। মাইকিং করে স্থানীয় মানুষকে বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করার পাশাপাশি অনেককে বিনা মূল্যে চারা দিতেন।

রেজাউল কিবরিয়া বাবুলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিন দশকের বেশি সময়ে তিনি প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছেন। এর মধ্যে তালগাছের বীজ ও চারা রয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার। নানা কারণে অনেক গাছ টিকে না থাকলেও বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যার কাজ বন্ধ করেননি তিনি।

MixCollage-14-Oct-2026-09-47-PM-1210
তার দীর্ঘদিনের উদ্যোগের সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ ওমরপুর গ্রামের বাউল সড়ক। সড়কটির দুই পাশে সারি সারি তালগাছ বড় হয়ে উঠেছে। গাছের ছায়ায় স্বস্তি পান পথচারী ও কৃষকেরা। সবুজে ঘেরা সড়কটির সৌন্দর্য দেখতে আশপাশের এলাকা থেকেও মানুষ আসেন। বাউল সড়কের পাশাপাশি গ্রামের আরও চারটি সড়কের পাশে গাছ লাগানো ও পরিচর্যা করছেন তিনি।

বাবুলের কাছে বৃক্ষরোপণ কেবল সড়কের সৌন্দর্য বাড়ানোর কাজ নয়; এটি পরিবেশ রক্ষা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মাধ্যম। তিনি গাছ লাগানোকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দেখেন। মসজিদের জুমার খুতবা ও ধর্মীয় আলোচনায়ও মুসল্লিদের বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করেন। বজ্রপাতের ঝুঁকি বিবেচনায় তালগাছ লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।

পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে যে নার্সারির মাধ্যমে সবুজের পথে যাত্রা শুরু করেছিলেন রেজাউল কিবরিয়া বাবুল, সেই উদ্যোগ আজ একটি গ্রামের সড়কের চেহারা বদলে দিয়েছে। তার লাগানো গাছগুলো এখন ছায়া দিচ্ছে, ফল দিচ্ছে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখছে। এবার তার দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত উদ্যোগের কথা পৌঁছাল প্রধানমন্ত্রীর কাছে। এই স্বীকৃতি ও উৎসাহ তাঁর বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমকে আরও এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে বলে প্রত্যাশা করা যায়।