ঊর্ধ্বতন থেকে থানায় ঘুরেও মেলেনি সহায়তা $ ৩ দিন অপহরণকারীদের কবলে, পরে নিজেই মুক্ত ফরহাদ

রাজধানীর উত্তরা থেকে চট্টগ্রামগামী বাসে উঠে অপহরণের শিকার হন মো. ফরহাদ (২৪)। পরে তার মোবাইল থেকেই পরিবারের সদস্যদের কাছে ফোন করে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারীরা। তাকে উদ্ধারে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার চেষ্টা করেও প্রথমে ব্যর্থ হন পরিবারের সদস্যরা। তাদের অভিযোগ, পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করেও কার্যকর সহায়তা পাননি তারা। তিন দিন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার পর শেষ পর্যন্ত পুলিশের অভিযানে নয়, নিজের বুদ্ধি ও কৌশলে অপহরণকারীদের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন ফরহাদ। এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তার পরিবার।

ফরহাদের বাড়ি ভোলার মনপুরা উপজেলায়। তিনি উত্তরায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। গত কোরবানির ঈদে বিয়ে করা ফরহাদ স্ত্রীকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রামের বাড়িতে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ জন্য কেনাকাটা করে সঙ্গে এক লাখ টাকা নিয়ে গত ১১ তারিখ দুপুর সোয়া ১২টার দিকে আব্দুল্লাহপুর থেকে স্টারলাইন পরিবহনের একটি বাসে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হন তিনি। চট্টগ্রামে বোনের বাসায় বেড়াতে আসা মাকে নিয়ে তার গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল।

বাসে ওঠার পর মাকে ফোন করে যাত্রার কথা জানান ফরহাদ। দুপুর আড়াইটার দিকে স্ত্রীর সঙ্গেও কথা হয় তার। তবে বেলা ৩টার পর থেকে পরিবারের সদস্যরা তার মোবাইল বন্ধ পান। পরে বিভিন্ন বাস কাউন্টারে খোঁজ নিয়েও তার যাত্রার বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেননি তারা।

পরদিন ১২ তারিখ সকালে ফরহাদের নম্বর থেকে তার বড় ভাই আব্দুস সাত্তারের কাছে ফোন আসে। অপর প্রান্তের ব্যক্তি ফরহাদ তাদের কাছে আছেন জানিয়ে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। এরপর কিছুক্ষণ পরপর ফোন করে টাকা চাওয়া হতে থাকে।

ফরহাদকে উদ্ধারের জন্য উপায় না পেয়ে প্রথমে উত্তরখান থানায় যান তার ভাই আব্দুস সাত্তার। সেখান থেকে তাঁকে উত্তরা পশ্চিম থানায় যেতে বলা হয়। পশ্চিম থানায় গেলে তাঁকে উত্তরা পূর্ব থানায় পাঠানো হয়।

সাত্তারের অভিযোগ, উত্তরা পূর্ব থানায় গেলে পুলিশ জানায়, টাকা আদায়ের জন্য তার ভাই অপহরণের নাটক সাজিয়েছেন। তাই জিডি করার প্রয়োজন নেই, অপেক্ষা করে দেখতে হবে। এভাবে সারাদিন তিন থানায় ঘুরেও জিডি করতে না পেরে পরিচিত এক পুলিশ কর্মকর্তা ও এক সাংবাদিকের সহায়তা চান তিনি।

পরে তাঁদের মাধ্যমে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পর উত্তরা পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কাছে যান সাত্তার। এরপর জিডি নেওয়া হয়। জিডি নম্বর ৮৪১। তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় উপপরিদর্শক (এসআই) মঞ্জুরুল হককে।

সাত্তার জানান, ফরহাদের নম্বর থেকে বারবার মুক্তিপণ চাওয়ার বিষয়টি তিনি তদন্ত কর্মকর্তাকে দেখান। ১২ তারিখ রাতে এসআই তাকে ফরহাদকে উদ্ধারের চেষ্টা করার কথা জানান। কিন্তু পরদিন সকাল পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি না দেখে যোগাযোগ করলে বলা হয়, ফরহাদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

পরে তাকে জানানো হয়, ফরহাদ চট্টগ্রামে আছেন এবং সেখান থেকে মুক্তিপণ চাওয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় ঢাকায় থেকে কীভাবে তাকে উদ্ধার করা সম্ভব, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয় বলে অভিযোগ সাত্তারের। এদিকে অপহরণকারীদের ফোন আসা অব্যাহত থাকে। পরে ওই সাংবাদিকের মাধ্যমে এসআরবি-১-এর সহায়তা চান তিনি। সেখানে জিডির কপি ও লিখিত আবেদন জমা দেন।

ওই সাংবাদিক জানান, ১২ তারিখ উত্তরা বিভাগের একজন অতিরিক্ত উপকমিশনারের (এডিসি) হস্তক্ষেপে জিডি করা হয়। পরে জিডির কপি ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) ওসমান গনি এবং উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার রেজাউল করিমের কাছে পাঠিয়ে সহায়তা চাওয়া হয়। অতিরিক্ত কমিশনার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে উত্তরা বিভাগের উপকমিশনারকে নির্দেশ দেন।

পরদিন উপকমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সড়ক অবরোধ সামলাতে ব্যস্ত থাকার কথা জানিয়ে ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার মো. ইলিয়াস কবিরের কাছেও সহায়তা চাওয়া হয়। তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট ক্রাইম জোনের উপকমিশনার সহায়তা চাইলে তারা কাজ করতে পারেন।

এরই মধ্যে ১৩ তারিখ সন্ধ্যার দিকে গ্রামের বাড়ি থেকে সাত্তারের কাছে ফোন আসে। তাকে জানানো হয়, ফরহাদ অপহরণকারীদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে কুমিল্লার চান্দিনা থানার আওতাধীন একটি সড়কের পাশের দোকানে আশ্রয় নিয়েছেন।

সাত্তার জানান, এরপর উত্তরা পূর্ব থানা পুলিশ চান্দিনা থানায় যোগাযোগ করে ফরহাদকে হেফাজতে নেওয়ার অনুরোধ জানায় এবং তাদের সেখানে যেতে বলে। তারা চান্দিনা থানায় পৌঁছালে বুধবার দিবাগত রাত ১টার দিকে ফরহাদকে তাদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। পরে তাকে ঢাকায় এনে হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়।

পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সাত্তার বলেন, পুলিশ এতটা অসহযোগিতা করবে, তা তিনি কল্পনাও করেননি। তার অভিযোগ, প্রথম দিনই পুলিশ আব্দুল্লাহপুর বাস কাউন্টারে গিয়ে তার ভাইয়ের যাত্রাসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে পারত। কিন্তু বারবার তাকে বলা হয়েছে, মোবাইলে অবস্থান শনাক্ত করে দেখা হবে। এমন অভিজ্ঞতার পর আর কখনো পুলিশের কাছে যেতে না হওয়ার আক্ষেপও প্রকাশ করেন তিনি।

মুক্ত হওয়ার পর ফরহাদ জানান, বাসটি নারায়ণগঞ্জ পার হওয়ার পর চালক ও সুপারভাইজার একজন যাত্রীকে বাসে তোলেন। ওই ব্যক্তি তার পাশের আসনে বসেন। কিছুদূর যাওয়ার পর যাত্রীটি বিরিয়ানির প্যাকেট খুলে ফরহাদকে খেতে দেন। কিন্তু তিনি তা খেতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর কী ঘটেছিল, তা তাঁর মনে নেই।

গভীর রাতে জ্ঞান ফিরলে নিজেকে একটি কক্ষে হাত-পা ও মুখ বাঁধা অবস্থায় দেখতে পান ফরহাদ। সেখানে চার-পাঁচজন ব্যক্তি তাঁর কাছ থেকে পরিবারের সদস্যদের মোবাইল নম্বর নিয়ে সকালে বড় ভাইকে ফোন করে মুক্তিপণ দাবি করেন।

ফরহাদের অভিযোগ, মুক্তিপণের টাকা না পেয়ে তাকে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়, বুকে ইনজেকশন দেওয়া হয় এবং মারধর করা হয়। তার সঙ্গে থাকা এক লাখ টাকাও নিয়ে যায় অপহরণকারীরা। ১১ তারিখ থেকে তাকে কোনো খাবার দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ফরহাদ জানান, অপহরণকারীরা কয়েক ঘণ্টা পরপর কক্ষে এসে তাঁকে নির্যাতন করত। তিনি তাদের একে অপরকে শফিক ও বাপ্পি নামে ডাকতে শুনেছেন।

১৩ তারিখ সন্ধ্যার আগে অপহরণকারীরা কক্ষে এলে ফরহাদ নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকার ভান করেন। তার কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে তারা কক্ষ থেকে চলে যায়। যাওয়ার সময় তার চোখের বাঁধন খুলে দিয়ে যায়। পরে হাতের বাঁধন নাড়াচাড়া করতে করতে গিঁট আলগা হলে তা খুলে ফেলেন তিনি।

ফরহাদ জানান, কক্ষটিতে কয়েকটি শাবল, বন্দুক ও লোহার রডসহ দেশীয় অস্ত্র দেখতে পান। এরপর একটি শাবল দিয়ে দরজায় আঘাত করতে থাকেন। একপর্যায়ে দরজা খুলে গেলে বাইরে বন-জঙ্গল দেখতে পান তিনি। মানুষের চলাচলের চিহ্ন অনুসরণ করে একটি পথ ধরে প্রায় এক ঘণ্টা দৌড়ে পাকা সড়কে ওঠেন। পরে এক রিকশাচালকের সহায়তায় একটি দোকানে আশ্রয় নিয়ে বাড়িতে ফোন করেন।

ফরহাদের ধারণা, বাসের চালক ও সুপারভাইজারও অপহরণের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। তার অভিযোগ, তারা পথিমধ্যে যাত্রীবেশে থাকা অপহরণকারীকে বাসে তুলে দেন এবং পরে তাকে বাস থেকে নামিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

এ বিষয়ে উত্তরা পূর্ব থানার ওসি মোরশেদ আলমের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে বলেন, তিনিই চান্দিনা থানার ওসিকে ফোন করে ফরহাদকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করেছেন।

তবে ফরহাদ নিজেই কৌশলে মুক্ত হয়েছেন—এ তথ্য জানানো হলে ওসি প্রশ্ন তোলেন, ফরহাদ অপহৃত হয়েছিলেন কি না, তা কীভাবে বোঝা যাবে; কারণ তারা তো থানায় আসেননি।

ওসি আরও দাবি করেন, পরিবারের সদস্যরা উত্তরখান ও উত্তরা পশ্চিম থানায় ঘুরে সহায়তা না পাওয়ার পর মানবিক দিক বিবেচনায় তিনি জিডি নিয়েছেন। এখন পরিবার চাইলে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা করতে পারে।