হুতিদের হামলায় আক্রান্ত রিয়াদ: মক্কা জোটের কার্যকারিতা কোথায়?

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি যখন চরম অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে, ঠিক তখনই সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের নিরাপত্তাবলয় ভেদ করে আঘাত হেনেছে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। রিয়াদের প্রাণকেন্দ্র কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চালানো এক মারাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ১২ জন নিরপরাধ মানুষ। নিহতদের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক ছাড়াও রয়েছেন দুজন বাংলাদেশি কর্মী। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিসরের নাগরিকরাও এই মর্মান্তিক ঘটনার শিকার হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও তিন শতাধিক মানুষ।

চলতি সপ্তাহেই কিং খালেদ বিমানবন্দরে এটি তৃতীয়বারের মতো হামলার ঘটনা। ঘটনার পরপরই হুতিদের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল-বুখাইতি এই হামলার পুরো দায় স্বীকার করে দাবি করেছেন, ইয়েমেনে সৌদি পরিচালিত সামরিক অভিযান ও বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের জবাব হিসেবেই তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে। রিয়াদ ছাড়াও সম্প্রতি সৌদি আরবের চারটি গুরুত্বপূর্ণ শহর ও একটি বড় কৌশলগত তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়ে নিজেদের দূরপাল্লার সামরিক সক্ষমতার শক্ত জানান দিয়েছে হুতিরা।

এই অগ্নিকুণ্ডের ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে যে প্রশ্নটি আজ বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে সোচ্চার হয়ে উঠেছে, তা হলো—গত মাসে মহাসমারোহে স্বাক্ষরিত বহুল আলোচিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ বা ‘মক্কা জোট’ (Mecca Defence Alliance)-এর বাস্তব কার্যকারিতা আসলে কোথায়? ‘একজনের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা’—ন্যাটোর আদলে গড়া এই উচ্চাভিলাষী প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি কি কেবলই এক ফাঁপা কূটনৈতিক শব্দজাল, নাকি সংকটকালে এটি বাস্তব প্রতিরক্ষার দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে সক্ষম?

২০২৬ সালের আগস্ট মাসে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে যৌথ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’। মুসলিম বিশ্বের তিন পরাশক্তিকে একই সামরিক ছাতার নিচে নিয়ে আসার এই উদ্যোগকে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। চুক্তির অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যেকোনো একটি সদস্যরাষ্ট্রের সামরিক বা আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা জোটের বাকি সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে এবং সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।

কিন্তু চুক্তির বয়স এক মাস পার হতে না হতেই বাস্তবে নেমে এসেছে আগুনের পরীক্ষা। জোট গঠনের পর থেকে হুতিরা সৌদি ভূমিতে তাদের হামলার মাত্রা কমায়নি, বরং কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরপর তিনবার আক্রমণ, বিমান চলাচল অচল করে দেওয়া, জিজান ও আবহা বিমানবন্দরে আক্রমণ এবং কৌশলগত তেল শোধনাগারকে লক্ষ্যবস্তু করা স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, হুতিদের রকেট ও ড্রোনের আঘাত ঠেকাতে এই জোটের কথিত ‘প্রতিরোধক্ষমতা’ (Deterrence) প্রথম ধাপেই ব্যর্থ হয়েছে।

সাম্প্রতিক হামলাগুলোর ভৌগোলিক বিস্তার ও মানবিক ক্ষয়ক্ষতি পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, জিজান ও আবহা বিমানবন্দর এবং গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগারগুলো হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় সৌদি আরবের বেসামরিক ও কৌশলগত অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রিয়াদের বিমানবন্দরে ১২ জনের প্রাণহানি, তাঁদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু এবং তিন শতাধিক মানুষের আহত হওয়ার ঘটনা এই সংকটের মানবিক মূল্য সামনে নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার হুতিদের সামরিক সক্ষমতার বিষয়টিকেও নতুন করে আলোচনায় এনেছে। অন্যদিকে, জোটের প্রতিক্রিয়া এখন পর্যন্ত মূলত কূটনৈতিক নিন্দা ও সংহতি প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে যে ধারণা তৈরি হয়েছে, তা সরাসরি সম্মিলিত সামরিক প্রতিরোধের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

রিয়াদে রক্তঝরার পর যখন চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী বা তুরস্কের বিমানবাহিনীর তাৎক্ষণিক পাল্টা আঘাত হানার কথা, তখন বাস্তবতা দেখা গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসলামাবাদ এবং আঙ্কারা—দুই রাজধানী থেকেই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে এবং সৌদি আরবের সার্বভৌমত্বের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো দেশই সরাসরি ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযানের ঘোষণা দেয়নি।

বিশ্লেষকদের অভিমত, তুরস্ক ও পাকিস্তান উভয় দেশই এখন মারাত্মক কৌশলগত দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে। তুরস্ক আঞ্চলিকভাবে নিজেকে শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে দেখাতে চায়। মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি একটি নতুন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া, বিশেষ করে ইয়েমেনের জটিল ভূখণ্ডে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করা, আঙ্কারার জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। তদুপরি, ইয়েমেনের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ইরানের সঙ্গে কৌশলগত সুসম্পর্ক বজায় রাখাও আঙ্কারার জন্য জরুরি। তাই তুরস্ক রিয়াদকে কারিগরি সহযোগিতা, ড্রোন সক্ষমতা ও আকাশ প্রতিরক্ষায় সহায়তা দিতে আগ্রহী হলেও সরাসরি আক্রমণাত্মক অভিযানে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিতে পারে।

অন্যদিকে, পাকিস্তানেরও নিজস্ব সংকট ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দেশটিতে সেনাসদস্য মোতায়েন ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের দীর্ঘ ইতিহাস থাকলেও ভঙ্গুর অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার কারণে সরাসরি ইয়েমেনের মাটিতে হুতিদের বিরুদ্ধে পদাতিক বা বিমান হামলায় অংশ নেওয়া পাকিস্তানের জন্য অত্যন্ত জটিল। যদিও জোট সচল করার অংশ হিসেবে পাকিস্তানি সেনা ও আকাশ প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তথাপি সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে দেশটি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

ফলে, জোট কার্যকর করার ক্ষেত্রে সহযোগিতা বলতে এখন মূলত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় (Intelligence sharing), রাডারব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, ড্রোন প্রযুক্তি এবং আকাশ প্রতিরক্ষায় সহায়তার বিষয়গুলোই সামনে আসছে। এসব সহযোগিতা সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রশ্ন থেকে যায়, এগুলো কি সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে ধারাবাহিক হামলা থেকে রক্ষা করতে যথেষ্ট? যদি একটি প্রতিরক্ষা জোট তার সদস্যরাষ্ট্রের ওপর হামলার ঝুঁকি কমাতে না পারে, তাহলে তার ঘোষিত প্রতিরোধক্ষমতার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এ কারণেই মক্কা চুক্তির বাস্তব প্রয়োগ ও সামরিক সক্ষমতা এখন গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে।

সৌদি আরবের ওপর হুতিদের এই অব্যাহত আঘাত কেবল একটি দেশের সীমান্ত সুরক্ষার প্রশ্ন নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও এক চরম বিপর্যয়ের বার্তা। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী দেশ হিসেবে সৌদি আরব যদি তার রাজধানী এবং শোধনাগারগুলোর নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহব্যবস্থা পঙ্গু হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা বা সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতে।

এই হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে শুরু করেছে বলে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। একই সঙ্গে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে প্রশ্ন উঠেছে—তেল সরবরাহকারী হিসেবে সৌদি আরব কতটা নির্ভরযোগ্য থাকবে? সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’-এর মূল ভিত্তিই হলো বিদেশি বিনিয়োগ টেনে আনা এবং অর্থনীতিকে বহুমুখী করা। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যদি বিদেশি নাগরিক ও যাত্রীরা প্রাণ হারান, তবে রিয়াদ নিরাপদ বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। এর ফলে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অর্থনৈতিক সংস্কার ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনাও মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

মক্কা জোটের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় প্রকাশের পেছনে এই অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একটি প্রতিরক্ষা জোটের সাফল্য শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; বরং সম্ভাব্য আক্রমণকারীকে আগেই নিরুৎসাহিত করা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে স্বাভাবিক রাখার ক্ষমতাও এর কার্যকারিতার অংশ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মক্কা জোট যদি হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারে, তবে এটি ন্যাটোর একটি দুর্বল অনুকরণ হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে—যা কাগজে-কলমে শক্তিশালী হলেও মাঠপর্যায়ে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ।

হুতিদের সাম্প্রতিক হামলা তাই কেবল সৌদি আরবের সীমান্ত ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তার দুর্বলতাই উন্মোচন করেনি, বরং সদ্য গঠিত এই জোটের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক আস্থা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষা। যদি এই চুক্তি কেবল কাগজে-কলমে বা রাজনৈতিক বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে হুতি বিদ্রোহীরা আরও উৎসাহিত হবে এবং সৌদির তেল অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে হামলার মাত্রা আরও বাড়াতে পারে। অন্যদিকে, তুরস্ক ও পাকিস্তান যদি বাস্তবসম্মত ও দৃশ্যমান সামরিক পদক্ষেপ, যেমন যৌথ আকাশ প্রতিরক্ষাবলয় স্থাপন বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারে, তবে জোটটির প্রতি সৌদি আরবের আস্থায় ফাটল ধরা স্বাভাবিক।

পরিশেষে বলা যায়, ‘মক্কা জোট’ কি কেবল রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার কূটনৈতিক হাতিয়ার হয়ে থাকবে, নাকি একটি কার্যকর যৌথ সামরিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে—তা নির্ধারিত হবে আগামী দিনগুলোতে ইসলামাবাদ ও আঙ্কারার বাস্তব সিদ্ধান্তের ওপর। রিয়াদের কিং খালেদ বিমানবন্দরে ঝরে যাওয়া রক্ত ও বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রাণহানি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ফাঁকা প্রতিশ্রুতি দিয়ে আর যাই হোক, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থামানো যায় না।

 ________________

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।

ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com