বেঞ্চে ‘ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলে’ মাঠে ইতিহাস গড়লেন এনদ্রিক 

মাঠে দলের হতাশা আর বেঞ্চে বসে থাকার দীর্ঘ অপেক্ষা, ফুটবল মাঠে এই চিত্র একজন তরুণ স্ট্রাইকারের মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু ব্রাজিলের এনদ্রিকের গল্পটা পুরোপুরি আলাদা। রোমার বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগে সেই মহানাটকীয় রাতে বেঞ্চে বসে মনে মনে  ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলার পরই মাঠে নেমে ম্যাচের রুপরেখা বদলে দিলেন তিনি। মাত্র ৭ মিনিট ৪৩ সেকেন্ডের অবিশ্বাস্য ঝড়ে রিয়াল মাদ্রিদকে পরাজয়ের মুখ থেকে টেনে তুলে এনে ৪-৩ গোলের অবিশ্বাস্য জয় উপহার দেন এই তরুণ ফরোয়ার্ড।

চলতি মৌসুমে রিয়ালের জার্সিতে মাঠের বাইরে প্রায় ব্রাত্যই ছিলেন এনদ্রিক। এর আগে সুযোগ পেয়েছিলেন মাত্র ৪ মিনিট। এবার রোমার অলিম্পিকো স্টেডিয়ামে যখন ৮২ মিনিট পর্যন্ত ৩-১ গোলে পিছিয়ে রিয়াল ধুঁকছে, সেখানে ম্যাচের ৫৯ মিনিটে হোসে মরিনহো আস্থার প্রতীক হয়ে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন তিনি। 

মাঠে নেমেই ডান দিক থেকে ঝড় তোলেন এই ব্রাজিলিয়ান। ৮৩ মিনিটে তার নেওয়া শট থেকেই ফিরতি বলে গোল করে ব্যবধান কমান কার্লোস এস্পি। এরপর নিজের দুর্দান্ত হেডে রোমার রক্ষণ দুর্গ ভেঙে দলকে এনে দেন সমতা (৩-৩)। পরে ম্যাচের শেষ মিনিটে গোল করে দলের জয় নিশ্চিত করেন রুডিগার। তবে ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন সেই এনদ্রিকই, যার এই এক পারফরম্যান্স যেন নিমিশেই বদলে দিল তার রিয়াল ক্যারিয়ারের সমীকরণ।

রোমার বিপক্ষে দারুণ পারফর্ম করে ম্যাচসেরার ট্রফি হাতে এনদ্রিক, ছবি: সংগৃহীত

এই জয়ে অনন্য এক ইতিহাসও গড়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো দল দুই গোল বা তার বেশি ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েও সর্বমোট ৪টি ম্যাচে ঘুরে দাঁড়িয়ে জয়ের অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়ল। এর আগে ২০০৪ সালে রোমা, ২০২৩ সালে লিভারপুল এবং ২০২৪ সালে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের বিপক্ষেও অন্তত দুই গোলে পিছিয়ে পড়ে জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছিল লস ব্লাঙ্কোরা। একইসঙ্গে প্রতিপক্ষের মাঠে দ্রুততম সময়ে দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও ম্যাচ জেতার এক নতুন নজির স্থাপন করল স্প্যানিশ জায়ান্টরা।

ম্যাচ শেষে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে এনদ্রিক শোনালেন সেই রোমাঞ্চকর মুহূর্তের কথা। ম্যাচ পরবর্তী সাক্ষাৎকারে ম্যাচসেরা এই ব্রাজিলিয়ান তরুণ তারকা বলেন, ‘ম্যাচের আবেগ এখনো আমার মধ্যে কাজ করছে। আমি তখন বেঞ্চে বসে ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলছিলাম। পাশে তাকাতেই দেখি নুনো আমাকে ডাকছে। আমি মাঠে নামলাম এবং ঈশ্বরের সঙ্গে কথা চালিয়ে গেলাম, কারণ ভাবিনি এত কম সময়ে আমাকে নামানো হবে।’ 

ম্যাচ যখন প্রতিপক্ষের দখলে চলে যাচ্ছিল, তখন দলের মানসিকতা কেমন ছিল সে বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে এনদ্রিক বলেন, ‘মরিনহো সঙ্গে কথা বলার সময় তাকিয়ে দেখি রোমা আরেকটি গোল করল। স্কোর যেমনই হোক না কেন, আমরা রিয়াল মাদ্রিদ, আর আমরা ম্যাচে লড়াই করতেই নামি। ৩-১ থেকে আমরা যেভাবে ৪-৩ করলাম, তাতেই প্রমাণ হয় যে আমরা শেষ পর্যন্ত লড়ে যাব।’ 

চলতি মৌসুমে কোচের পরিকল্পনা ও দলে নিজের ভূমিকা নিয়ে এই ব্রাজিলিয়ান তরুণ অত্যন্ত স্পষ্টবাদী। নিজের ভবিষ্যৎ ও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে এনদ্রিক স্পষ্টভাবে জানান, ‘আমি জানি না আমার স্ট্যাটাস বদলাবে কি না, কারণ কোচরা কোনো একক খেলোয়াড়ের জন্য সেরাটা করেন না, তারা দলের জন্য যা ভালো সেটাই করেন। আমি প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করে যাব, যাতে যেকোনো উপায়ে দলকে সাহায্য করতে পারি।’ 

‘জানুয়ারিতে যেতে হলে যাব’ দলবদল নিয়ে এনদ্রিকের ইঙ্গিত

ম্যাচে এমন অবিশ্বাস্য পারফর্ম্যান্সের পরও এনদ্রিকের মাদ্রিদ ক্যারিয়ারের দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎ নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। এসি মিলান ও এই ম্যাচের প্রতিপক্ষ রোমার মতো ইতালিয়ান জায়ান্টরা তাকে দলে নিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। সেখানে আগামী দলবদল নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এনদ্রিক বলেন, ‘আমি প্রতিটি দিন ধরে এগোচ্ছি। জানুয়ারিতে যদি আমাকে ক্লাব ছাড়তে হয় তবে আমি চলে যাব, আর যদি থাকতে হয় তবে থাকব। ঈশ্বর আমার হৃদয়ে যা দেবেন আমি সেটাই করব।’ 

পরের রিয়াল বস মরিনহো প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এনদ্রিক আরও যোগ করেন, ‘আমি মরিনহোর প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। তিনি প্রথম দিকের কয়েকজন কোচের একজন যিনি মন খুলে আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। আমি তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করি। তিনি আমার জন্য যা করছেন, তার জন্য আমি তার এবং রিয়াল মাদ্রিদের জন্য মাঠে লড়াই করে যাব।’ 

অন্যদিকে এনদ্রিককে লোন বা স্থায়ী চুক্তিতে অন্য কোনো ক্লাবে পাঠানোর সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছেন রিয়াল কোচ। রোমা ম্যাচের আগে টিএনটি স্পোর্টসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মরিনহো বলেন, ‘ভুলে যান, যেকোনো ক্লাবের আগ্রহের কথা ভুলে যান। যারা তাকে চায় তাদের বসে থাকতে হবে, নয়তো অপেক্ষা করতে করতে তারা ক্লান্ত হয়ে যাবে। ও এমন একজন খেলোয়াড় যাকে আমি ভালোবাসি এবং ওর দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে। তাকে লোনে পাঠানোর কোনো প্রয়োজন নেই।’