স্বাভাবিক লেনদেনে ফিরেছে ন্যাশনাল ব্যাংক

দীর্ঘদিনের তারল্যসংকট ও টাকা উত্তোলনে গ্রাহকদের ভোগান্তির পর স্বাভাবিক লেনদেনে ফিরেছে বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক। গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে ব্যাংকটির সব শাখায় গ্রাহকেরা স্বাভাবিক নিয়মে টাকা তুলতে পারছেন। পাশাপাশি এটিএম বুথসহ প্রচলিত ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমেও লেনদেনের সুযোগ পাচ্ছেন তাঁরা। এতে গ্রাহকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। তবে ব্যাংকটির আগের মতো স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং গ্রাহকদের পূর্ণ আস্থা অর্জন করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

ব্যাংকটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্রাহকদের আস্থা ফিরে এসেছে বলে মনে হচ্ছে। আমি চাই, ব্যাংকটি এভাবেই সামনের দিকে এগিয়ে যাক। ব্যাংক কর্মকর্তাদের কঠোর পরিশ্রম, সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার ওপর নির্ভর করছে ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ। আমরা পরিচালনা পর্ষদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা দিয়ে যাব।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন পর্যন্ত টাকা উত্তোলনের জন্য আমাদের কাছে যে পরিমাণ আবেদন এসেছে, তা পূরণ করা কোনো বিষয় হবে না। সব মিলিয়ে আস্থা ফিরে আসায় অনেক গ্রাহক টাকা তুলতে আসেননি। আমি নিজে আজ ব্যাংকের অনেক শাখা পরিদর্শন করেছি। ব্যবস্থাপনা পরিচালকও এখনো বিভিন্ন শাখা পরিদর্শনে রয়েছেন। শাখাগুলোতে টাকা উত্তোলনের জন্য গ্রাহকদের ভিড় থাকলেও আমরা চাই, ব্যাংকটিতে আগের সেই স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত পরিবেশ ফিরে আসুক।’

ব্যাংকটির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি গ্রাহকদের টাকা উত্তোলনের ভোগান্তি কমাতে এবং লেনদেনের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে প্রথমে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা উত্তোলনের চাহিদা ও আবেদন সংগ্রহ করা হয়। পরে পর্যায়ক্রমে টাকা উত্তোলনের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার থেকে সব শাখায় স্বাভাবিক নিয়মে টাকা উত্তোলনের সুযোগ চালু করা হয়েছে।

ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখায় টাকা উত্তোলনের জন্য গ্রাহকদের উপস্থিতি দেখা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে জমা টাকা প্রয়োজনমতো তুলতে না পারায় যেসব গ্রাহক উদ্বেগে ছিলেন, তাঁদের অনেকে এখন টাকা তুলতে পেরে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তবে ব্যাংকটির প্রতি পূর্ণ আস্থা ফিরতে আরও সময় লাগবে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

ব্যাংকটির উত্তরা শাখার গ্রাহক আজাদ সুলাইমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিজের প্রয়োজনে ব্যাংকে টাকা জমা রেখেছিলাম। কিন্তু প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে না পারলে স্বাভাবিকভাবেই দুশ্চিন্তা তৈরি হয়। এখন টাকা তুলতে পারছি, এটা স্বস্তির বিষয়। তবে ভবিষ্যতেও যেন প্রয়োজনের সময় টাকা পাওয়া যায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।’

আরেক গ্রাহক বলেন, ‘ব্যাংকে টাকা রাখার প্রধান কারণ নিরাপত্তা ও প্রয়োজনের সময় তা ব্যবহার করতে পারা। এখন টাকা উত্তোলন স্বাভাবিক হওয়ায় ভালো লাগছে। ব্যাংকটির সেবা যেন আগের মতো স্বাভাবিক হয় এবং গ্রাহকদের আর ভোগান্তিতে পড়তে না হয়, সেটাই প্রত্যাশা।’

ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি ও তারল্যসংকটের কারণে কয়েকটি ব্যাংক চাপে রয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আমানতকারীদের আস্থায়ও। ন্যাশনাল ব্যাংকও দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক চাপ ও তারল্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। ফলে গ্রাহকদের টাকা উত্তোলনের সুযোগ স্বাভাবিক করা ব্যাংকটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

তবে শুধু টাকা উত্তোলনের সুযোগ চালু করলেই গ্রাহকদের আস্থা পুরোপুরি ফিরবে না। আমানতকারীদের চাহিদা অনুযায়ী নগদ অর্থের জোগান নিশ্চিত করা, আমানত সংগ্রহ বাড়ানো, ঋণ আদায় জোরদার করা এবং ব্যাংকের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাও জরুরি।

এদিকে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু রাখতে সোনালী ব্যাংক থেকে সাত হাজার কোটি টাকা ধার নিয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে ১০ শতাংশ সুদে ন্যাশনাল ব্যাংককে এ অর্থ ধার দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে ন্যাশনাল ব্যাংক টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যাংক সেই অর্থ পরিশোধ করবে। ব্যাংকটির কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতেই এ ঋণ দেওয়া হয়েছে।

এর আগে ব্যাংকটির স্বাভাবিক লেনদেন চালুর বিষয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবীন ও ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুল হকের সঙ্গে বৈঠক করেন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। ওই বৈঠকে আমানতকারীদের চাহিদা অনুযায়ী টাকা ফেরত দিতে ন্যাশনাল ব্যাংকের সব শাখা ও এটিএম বুথে প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ সরবরাহের নির্দেশনা দেওয়া হয়।