সরকারিভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার হিড়িক পড়েছে। এই হিড়িক এত ব্যাপক যে, স্বল্প দূরত্বে অপরিকল্পিতভাবে দ্রুত অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় উচ্চশিক্ষা স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য করার অজুহাতে তাড়াহুড়া করে চালু করা হয়েছে এসব স্থাপনা। অধিকাংশ নতুন প্রতিষ্ঠান যোগ্য যথেষ্ট শিক্ষক পাওয়া, পর্যাপ্ত অবকাঠামোসহ স্থায়ী ক্যাম্পাস, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ গবেষণাগার এবং মানসম্পন্ন বইসহ লাইব্রেরি ছাড়াই শিক্ষার্থী ভর্তি করছে।
দেশ রূপান্তরে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ‘উচ্চশিক্ষার বারোটা’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫০ থেকে ১৮৪ কিলোমিটারের মধ্যে এমন ৯টি বিশ্ববিদ্যালয় করা হয়েছে, যার মধ্যে দুটি বাদে কোনোটিই পুরোপুরি কার্যকর হতে পারেনি। ১৫ বছর আগে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠান এখনো ধুঁকছে, নানা সংকটে। ৪টি প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো রকমে পাঠদান চলছে ভাড়া করা ভবনে। আরও দুটি প্রতিষ্ঠান শিগগির কার্যক্রম শুরু করবে ভাড়া করা ভবনে। শিক্ষার্থীর চেয়ে শিক্ষক-কর্মচারী সংখ্যায় বেশি, এমন প্রতিষ্ঠানও আছে। স্বজনপ্রীতিতে কাউকে নিয়োগ দিতে হবে এমন বিবেচনায় অপরিকল্পিতভাবে বিভাগ চালু হচ্ছে। শিক্ষক, অবকাঠামো, একাডেমিক পরিবেশ ও জনবল কাঠামো নিয়ে সংকটের শেষ নেই। একই সঙ্গে আছে দুর্নীতি ও অনিয়মের বহু অভিযোগ। দেশে বর্তমানে সরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় ৫৬টি। জাতীয় সংসদে অনুমোদিত আলাদা আইন অনুযায়ী স্বায়ত্তশাসিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচালিত হওয়ার কথা
থাকলেও বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠানের মূল নিয়ন্ত্রণ অনেক বছর ধরে যখন যে সরকারে থাকে, তারাই করে থাকে। উপাচার্য ও শিক্ষক নিয়োগে একাডেমিক, বিশ্ববিদ্যালয়-পর্যায়ে পড়ানো এবং গবেষণা পরিচালনার বাস্তব যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনা বেশি গুরুত্ব পাওয়ায় প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে স্বায়ত্তশাসন ও একাডেমিক স্বাধীনতা ক্ষুণœ হচ্ছে। আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণও একটি বড় বাধা। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীর জন্য উপযুক্ত আবাসনের ব্যবস্থা নেই। অনিরাপদ ও ঘিঞ্জি পরিবেশে থাকতে বাধ্য হচ্ছে তারা। সব মিলিয়ে পাঠদানে মানের দিকটি মোটেই বিবেচনায় নেই। এতে সনদসর্বস্ব ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে কাজের দক্ষতা ও জ্ঞানের অসামঞ্জস্যতা বিস্তারের ঝুঁকি বাড়ায় উচ্চশিক্ষিত বেকারও বাড়ছে।
এমন পরিস্থিতিতেও জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি আবার জোরালো হচ্ছে। জাতীয় সংসদের সর্বশেষ অধিবেশনে একদিনেই ১০ জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি তুলেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্যরা।
আমরা মনে করি, সরকারিভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে লোকরঞ্জনবাদী নীতি থেকে সরে এসে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের রাস টানা এখন সময়ের দাবি। খামখেয়ালিপনায় ভর করে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পরিবর্তে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিরাজমান সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য সামগ্রিক কাঠামোগত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া আগের অনুমোদন পুনরায় মূল্যায়ন করা দরকার। এ পর্যন্ত স্থাপিত কয়টি প্রতিষ্ঠান সত্যিকার অর্থে বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠতে পেরেছে, তাও খতিয়ে দেখতে হবে। কাছাকাছি অবস্থিত কিন্তু মৌলিক অবকাঠামো ও মানসম্পন্ন শিক্ষকের অভাবে ধুঁকছে, এমন প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনে একীভূত করা যেতে পারে। সাধারণ ডিগ্রিধারী বেকার তৈরির পরিবর্তে কর্মসংস্থানের চাহিদা বিবেচনায় বিশেষায়িত শিক্ষায় মনোযোগ দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও সেখানে কী কী বিষয়ে পড়ানো হবে, তার যৌক্তিকতা নির্ধারণে শুধু স্থানীয় চাহিদা নয়, আশপাশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ও দূরত্ব, সম্ভাব্য শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সরবরাহ, আঞ্চলিক অর্থনীতি এবং গবেষণার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নেওয়া দরকার। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যথাযথ অনুপাত বজায় রাখতে হবে।
গুণমান নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় একাডেমিক স্বায়ত্তশাসন ও সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করাও জরুরি। এক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক অতিমাত্রায় হস্তক্ষেপ কমাতে হবে। উপাচার্যসহ উচ্চপর্যায়ের নিয়োগ রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে স্বাধীন অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নির্দিষ্ট মানদ- অনুসরণ করে হতে পারে। শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে কঠোর মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) কেবল একটি পরামর্শক সংস্থা হিসেবে রাখার পরিবর্তে স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থায় রূপান্তর করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি প্রায় ১১৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও দেখভাল করে সংস্থাটি। নিম্নমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শাস্তির আওতায় আনার আইনি কার্যকর ক্ষমতা ও সক্ষমতা ইউজিসির থাকতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অর্থ বরাদ্দ পেতে মানসম্পন্ন পর্যাপ্ত শিক্ষক, স্বীকৃত গবেষণা প্রকাশনা ও আধুনিক গবেষণাগার থাকার শর্ত পূরণ করতে হবে। সব মিলিয়ে সংখ্যায় নয়, উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়তে হবে গুণমান বিবেচনায়।