প্রশ্নফাঁস ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা

স্বপ্নগুলো যেখানে ওএমআর শিটে আঁচড় কাটার অপেক্ষায়, তখন আছড়ে পড়ল বজ্রপাত। মুহূর্তে যেন বদলে গেল লাখো বেকারের জীবনচিত্র। ৩ লাখ ১৯ হাজার প্রার্থী, ৯৫টি কেন্দ্র আর খাতার পাতায় কলম বসানোর ঠিক দুই মিনিটের মাথায়, পিনপতন নীরবতা চূর্ণ করে দেওয়া ঘোষণা ‘পরীক্ষা স্থগিত!’ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁসের খবরে এভাবেই ইতি টানা হলো। বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য, ঘটনাটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয় বরং তরুণদের লালিত স্বপ্ন ও আস্থার ওপর এক বিষাক্ত আঘাত। রাজপথে নেমে আসা ক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থীদের বিক্ষোভ আজ একটাই সত্য তুলে ধরছে অবহেলা ও গাফিলতির এই চড়া মাশুল আর কত দিন গুনবে দেশের বেকার সমাজ। প্রশ্ন ফাঁসের খবর পাওয়া মাত্রই পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়াকে হয়তো কর্তৃপক্ষ ‘দায়বদ্ধতা’ কিংবা ‘দ্রুত পদক্ষেপ’ বলে চালিয়ে দিতে চাইবে। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলেই থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়ে উন্মোচিত হয় চরম গাফিলতি ও দূরদর্শিতার কঙ্কালসার রূপ। প্রশ্ন হলো, ডিজিটাল প্রযুক্তির এই যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি কি পরীক্ষা শুরুর ঠিক দুই মিনিট আগেই কর্তৃপক্ষের নজরে এলো? প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা আর নজরদারির দায়িত্বে থাকা প্রশাসনিক কাঠামো তবে কী করেছে? পরীক্ষার আগের কয়েক ঘণ্টা কেন গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা গেল না, সেই দায় এড়ানো সম্ভব?  শেষ মুহূর্তে এমন সিদ্ধান্ত নিয়োগ ব্যবস্থার সেই পুরনো ভঙ্গুরতাকে নতুন করে প্রকাশ করল। ঘটনার পর ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি আর ৩ দিনের আলটিমেটাম এসব আমলাতান্ত্রিক গৎবাঁধা নাটক আমরা আগেও বহুবার দেখেছি। কিন্তু অতীত সাক্ষী এসব তদন্ত কমিটির ফাইল শেষ পর্যন্ত লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে ধুলা জমে আর অপরাধীরা অধরা থেকে যায়। একজন চাকরিপ্রার্থীর কাছে লিখিত পরীক্ষা কেবল দুই ঘণ্টার একটি পরীক্ষা নয়, এর পেছনে থাকে পরিবার-পরিজন থেকে দূরে মেসে কিংবা ভাড়া বাসায় কাটানো অভাব-অনটনের দিনগুলো, বছরের পর বছর ধরে চলা কৃচ্ছ্রসাধন এবং অদম্য এক আত্মত্যাগ। ৩ লাখ ১৯ হাজার বেকার তরুণের এই দীর্ঘযাত্রায় কতজনের যে টিউশন ছুটিয়ে ঢাকায় আসা, কতজন যে মেসের বকেয়া ভাড়া বাকি রেখে পরীক্ষার ফি আর টিকিটের টাকা জোগাড় করেছেন, তার হিসাব কোনো আমলাতান্ত্রিক নথিতে থাকে না। দুই মিনিটের মাথায় পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার মাধ্যমে কেবল ওএমআর শিটই তুলে নেওয়া হয়নি, বরং ওই মুহূর্তে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে লাখো প্রার্থীর দীর্ঘদিনের শ্রম ও মানসিক  স্থৈর্যকে। এ জাতীয় পুনরাবৃত্তিক ঘটনা তরুণ প্রজন্মকে কেবল হতাশাগ্রস্ত করছে না, বরং রাষ্ট্র ও তার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর থেকে তাদের ন্যূনতম বিশ্বাসটুকুও কেড়ে নিচ্ছে যা একটি দেশের টেকসই ভবিষ্যতের জন্য চূড়ান্ত অশনিসংকেত। এই হতাশার ঘোর কাটানোর একটিই পথ, প্রশাসনিক কাঠামোগত শুদ্ধি অভিযান। ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটিকে শুধু তিন দিনের ডেডলাইনের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিয়ে খালাস পেলে চলবে না; প্রশ্ন চোরদের সিন্ডিকেট এবং পর্দার আড়ালের ইন্ধনদাতাদের জনগণের সামনে দাঁড় করাতে হবে। সেই রিপোর্ট যেন ফাইলবন্দি না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। কাগজের প্যাকেটে কেন্দ্রভিত্তিক প্রশ্ন পাঠানোর সনাতন ব্যবস্থা অবিলম্বে জাদুঘরে পাঠাতে হবে। এর বদলে এনক্রিপ্টেড কোড ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কেন্দ্রেই প্রশ্ন প্রিন্ট বা সরাসরি সুরক্ষিত ডিজিটাল বিতরণের বন্দোবস্ত করতে হবে। পরীক্ষার আগের ৪৮ ঘণ্টা ফেসবুক, টেলিগ্রাম বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রশ্ন কেনাবেচার বাজার বন্ধে বিটিআরসি ও সাইবার বাহিনীকে শুধু নজর রাখলে হবে না, নামতে হবে সাঁড়াশি অভিযানে। সর্বোপরি, ১৬ অক্টোবরের নির্ধারিত তারিখটি যেন আর কোনো অজুহাতে না পেছায়, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে।

শুধু যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর নয়, দীর্ঘদিন ধরে দেশের অধিকাংশ সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো না কোনো অনিয়ম, প্রশ্ন ফাঁস কিংবা অনাকাক্সিক্ষত স্থগিতাদেশের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এই চক্র থেকে বের হতে হলে, প্রতিটি অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের পৃথক ও অদক্ষ নিয়োগ কাঠামোর বদলে একটি সুনির্দিষ্ট, কেন্দ্রীয় ও স্বতন্ত্র ‘নিয়োগ বোর্ড’ গঠন সময়ের দাবি। নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতি ধাপে, কারিগরি অডিট এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা বাধ্যতামূলক করতে হবে। শাস্তির নজির না থাকায়, প্রতিবার যদি অপরাধীরা পার পায়, তবে নতুন কোনো প্রযুক্তি নিয়ে এলেও, দুর্নীতির ছিদ্রপথ বন্ধ করা সম্ভব হবে না। স্বচ্ছতা ফেরাতে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ ও দৃষ্টান্তমূলক কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই।  যে দেশের তরুণদের কাঁধে ভর দিয়ে আগামীর স্বপ্ন আঁকা হয়, সেই তরুণ সমাজকে যখন বারবার পরীক্ষা হলের দোরগোড়ায় এসে অপমানিত হতে হয়, তখন তা কেবল দুঃখজনক নয় বরং চরম আশঙ্কাজনক। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের এই ক্ষতে প্রলেপ দেওয়ার সময় এসেছে। দেশের লাখ লাখ প্রার্থীর প্রতি সরকারের এখন একটাই দায়বদ্ধতা আজকের পরীক্ষাকে কোনো দাগ ছাড়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করা। তরুণরা কোনো করুণার ভিক্ষা চান না, তারা চান একটি সুরক্ষিত ব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি ওএমআর শিটে তাদের রক্তঘাম ঝরানো মেধার মূল্যায়ন হবে। তরুণদের আস্থাহীনতার অন্ধকার কাটুক, মেধার জয় হোক এটাই শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের দাবি।

লেখক : সিইও

ইটিসি ইভেন্টস লিমিটেড

antmail00111@gmail.com