১৬ অক্টোবর—ক্যালেন্ডারের আর দশটা সাধারণ তারিখের মতো মনে হলেও বার্সেলোনা এবং ফুটবল ইতিহাসের পাতায় এটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা এক বিশেষ দিন। ঠিক ২২ বছর আগে, ২০০৪ সালের এই দিনেই বার্সেলোনার হয়ে কোনো অফিশিয়াল প্রতিযোগিতায় পা রেখেছিলেন ১৭ বছরের এক কিশোর। নামটা লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।
কাতালান ডার্বিতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী এস্পানিওলের বিপক্ষে ম্যাচের ৮২তম মিনিটে ডেকোর বদলি হিসেবে যখন মাঠে নামেন, তখন বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যৎ মানচিত্রটাই বদলে যাওয়ার সংকেত পেয়েছিল। এরপর যা ঘটেছে, তা স্রেফ ইতিহাস। ২২ বছর পর সেই স্মৃতি আজও উজ্জ্বল ন্যু ক্যাম্প থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তের হৃদয়ে।
২২ বছর আগে শুরু সেই জাদুকরী অধ্যায়
২০০৪ সালের ১৬ অক্টোবর, বার্সেলোনা বনাম এস্পানিওল ম্যাচ। ইনজুরি সমস্যায় জর্জরিত বার্সেলোনার ডাগআউটে পাঁচজন তরুণ মুখ রেখেছিলেন তৎকালীন কোচ ফ্র্যাঙ্ক রাইকার্ড। ১৭ বছর ৩ মাস বয়সে ৩০ নম্বর জার্সি পরে মাঠের সাইডলাইনে দাঁড়িয়েছিলেন লিওনেল মেসি। ম্যাচের শেষ দিকে ব্রাজিলে জন্মগ্রহণকারী পর্তুগিজ তারকা ডেকোকে তুলে নিয়ে তরুণ মেসিকে মাঠে পাঠান রাইকার্ড।
বার্সেলোনার ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে মাত্র ৮ মিনিট খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন সেদিন। কিন্তু সেই অল্প সময়েই নিজের অসামান্য ড্রিবলিং আর স্কিলের ঝলক দেখিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, ফুটবল বিশ্ব পেতে যাচ্ছে নতুন এক রাজাকে। বার্সার হয়ে সর্বমোট ৭৭৮টি ম্যাচে রেকর্ড ৬৭২ গোল আর ৬টি ব্যালন ডি'অর জয়ের যে বিরল যাত্রা, তাঁর প্রথম পা ফেলেছিলেন ঠিক ২২ বছর আগের এই দিনেই।
যেভাবে দ্রাগাওয়ের মাটিতে প্রথম দেখা মেলে ‘মেসি’ নামের বিস্ময়ের
অফিশিয়াল অভিষেকের প্রায় এক বছর আগে, ২০০৩ সালের ১৬ নভেম্বর প্রথমবারের মতো বার্সেলোনার প্রথম দলের জার্সিতে মাঠে নেমেছিলেন ১৬ বছরের কিশোর মেসি। সেটি ছিল পর্তুগালের পোর্তোর নতুন স্টেডিয়াম 'এস্তাদিও দো দ্রাগাও'-এর উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত এক প্রীতি ম্যাচ। রাইকার্ড ম্যাচের ৭১তম মিনিটে ফার্নান্দো নাভারোর বদলি হিসেবে নামিয়েছিলেন লা মাসিয়ার সেই বিস্ময় বালককে। অফিশিয়াল ম্যাচ না হলেও সেই প্রীতি ম্যাচেই প্রথম বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছিল এক ফুটবল ঈশ্বরের আগমন বার্তা।
৩৫ ট্রফি ও অর্জনের পাহাড়সম রেকর্ড
বার্সেলোনার হয়ে ১৭টি মৌসুমে নিজেকে সর্বকালের সেরা হিসেবে গড়ে তুলেছেন মেসি। বার্সার জার্সিতে অর্জনের খাতা ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। ১০টি লা লিগা, ৪টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ৭টি কোপা দেল রে, ৮টি স্প্যানিশ সুপার কাপ, ৩টি ইউরোপিয়ান সুপার কাপ এবং ৩টি ক্লাব বিশ্বকাপসহ মোট ৩৫টি প্রধান শিরোপা জিতেছেন ক্লাবের হয়ে। পরবর্তীতে পিএসজির হয়ে আরও ৩টি আর বর্তমানে ইন্টার মায়ামির হয়ে ৪টি শিরোপা জিতলেও সেই ৩৫ ট্রফিই ছিল তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের ভিত্তিমূল।
বিশ্বের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে ৮টি ব্যালন ডি'অর জয়ের অনন্য কীর্তিটা তার দখলেই। ২০০৮-০৯ মৌসুমে পেপ গার্দিওলার অধীনে ট্রেবল জয় থেকে শুরু করে এক পঞ্জিকাবর্ষে ৬টি ট্রফি জেতার মতো অবিশ্বাস্য সব রেকর্ডের মহানায়ক ছিলেন তিনি। বড় ম্যাচের বড় তারকা হিসেবে বার্সার হয়ে ফাইনালেই করেছেন ৩১টি গোল, যার মধ্যে ২০০৯ ও ২০১১ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল এবং রোমের স্মরণীয় গোলগুলো রূপকথা হয়ে আছে।
২০২১ সালের সেই কান্না ভেজা বিদায়
সাফল্যের আলোয় ভাসতে থাকা ভালোবাসার এই গল্পের শেষটা ছিল চরম ট্র্যাজেডিতে ভরা। ২০২১ সালের আগস্টে ন্যু ক্যাম্পের সংবাদ সম্মেলন কক্ষে যখন এলেন, তখন কথা বলার আগেই চোখের জলে ভেসে যাচ্ছিলেন মেসি। স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জোর বাড়ানো টিস্যুতে চোখ মুছে থমথমে কণ্ঠে বিশ্ব গণমাধ্যমের সামনে বার্সেলোনার বিদায়ী সংবাদ সম্মেলনে কান্নাভেজা কণ্ঠে মেসি বলেছিলেন, ‘গত কয়েকদিন ধরে ভাবছিলাম কী বলব, কিন্তু সত্যি বলতে আমার মাথা কাজ করছিল না। এটা আমার জন্য খুব কঠিন, আমি এটার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে আমরা এখানেই, এই নিজেদের ঘরেই থাকব। আমি যা করতে পারতাম তার সবই করেছি থাকার জন্য। লা লিগার আর্থিক নিয়মের কারণে চুক্তি স্বাক্ষর করা সম্ভব হয়নি। প্রেসিডেন্ট লাপোর্তা বলেছেন লিগের নিয়মের কারণে এটা করা যায়নি, তবে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, থাকার জন্য আমার দিক থেকে যা করা সম্ভব ছিল, আমি সব করেছি।’
পিএসজি হয়ে বর্তমানে আমেরিকান ক্লাব মায়ামিতে খেললেও বার্সেলোনার ইতিহাস থেকে মেসিকে আলাদা করা অসম্ভব। আজকের দিনে শুরু হওয়া সেই ২২ বছরের পুরোনো অধ্যায়টি আজও ফুটবলপ্রেমীদের কাছে নিখাদ আবেগ ও অনুভূতির এক অমর রূপকথা।