চলনবিল বাঁচলেই বাঁচবে পর্যটনের সম্ভাবনা

বর্ষায় চলনবিল যেন নিজের সমস্ত সৌন্দর্য খুলে দেয়। দিগন্তজোড়া জলরাশি, ভাসমান নৌকা, দূরের গ্রাম আর আকাশভরা মেঘ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অন্যরকম ভূদৃশ্য। শরতে নীল আকাশের প্রতিবিম্ব পড়ে জলের আয়নায়, হেমন্তে বিলপাড়ে ছড়িয়ে পড়ে পাকা ধানের সোনালি রং, শীতে কুয়াশার ভেতর ভেসে আসে অতিথি পাখির ডাক। ঋতু বদলায়, চলনবিলও বদলায়, কিন্তু তার আকর্ষণ ফুরায় না।

একসময় এই বিল ছিল মূলত জীবন ও জীবিকার অবলম্বন। মাছ ধরা, কৃষিকাজ, নৌযান, জলজ সম্পদ—সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বিলপাড়ের মানুষের দিনযাপন। এখন সেই পুরোনো পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরেকটি সম্ভাবনা—পর্যটন।

চলনবিল কোনো একক জলাশয় নয়। নদী, খাল, ছোট-বড় বিল এবং বিস্তীর্ণ জলাভূমি মিলিয়ে এটি এক বিশাল প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই জলভূমির বুক চিরে বয়ে গেছে আত্রাই, বড়াল, গুমানীসহ নানা নদ-নদী ও খাল। বর্ষায় নৌকায় চলতে চলতে কখনো মনে হয় নদীপথে এগোচ্ছেন, আবার কখনো চারপাশের জলরাশি দেখে মনে হয় প্রবেশ করেছেন সীমাহীন কোনো জলরাজ্যে। 

এই জলপথই হতে পারে চলনবিলের পর্যটনের সবচেয়ে বড় শক্তি।

পরিকল্পিতভাবে পর্যটন গড়ে তোলা গেলে শুধু দর্শনার্থীই বাড়বে না, তৈরি হতে পারে স্থানীয় মানুষের নতুন কর্মসংস্থানও। নিরাপদ নৌভ্রমণ, প্রশিক্ষিত স্থানীয় গাইড, বিলের মাছ ও ঐতিহ্যবাহী খাবার, কৃষিপণ্য, হস্তশিল্প, লোকগান ও গ্রামীণ সংস্কৃতিকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে ছোট ছোট উদ্যোগ। এতে পর্যটনের আয় সরাসরি বিলপাড়ের মানুষের ঘরেও পৌঁছাতে পারে।

কিন্তু সম্ভাবনার এই ছবির বিপরীতে রয়েছে উদ্বেগের আরেক বাস্তবতা। দখল, পলি জমা, নদী-খাল ভরাট, অপরিকল্পিত অবকাঠামো, নির্বিচারে পুকুর খনন, নিষিদ্ধ জাল এবং পানিপ্রবাহে নানা বাধায় চলনবিলের স্বাভাবিক চরিত্র ক্রমেই বদলে যাচ্ছে। কোথাও বর্ষার পানি আটকে থাকছে, কোথাও শুষ্ক মৌসুমে নদী-খাল প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়ছে। জলজ উদ্ভিদ ও কচুরিপানার অস্বাভাবিক বিস্তারও অনেক এলাকায় নৌচলাচল ও বিলের সৌন্দর্য ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

তাই চলনবিলকে শুধু একটি ‘পর্যটন স্পট’ হিসেবে দেখলে চলবে না। যে প্রকৃতি পর্যটককে টানবে, আগে সেই প্রকৃতিকেই টিকিয়ে রাখতে হবে।

পর্যটনের নামে বিলপাড়ে যদি অপরিকল্পিত কংক্রিটের স্থাপনা, শব্দদূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য কিংবা নির্বিচার মোটরচালিত নৌযান বাড়তে থাকে, তবে পর্যটনের উন্নয়নই একসময় বিলের জন্য নতুন হুমকি হয়ে উঠতে পারে। প্রয়োজন এমন পরিকল্পনা, যেখানে পর্যটন থাকবে প্রকৃতিনির্ভর এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ থাকবে কেন্দ্রীয় জায়গায়।

নির্দিষ্ট নৌপথ, নিরাপদ ঘাট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র, পাখি ও মাছের আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিয়ে পরিকল্পনা করা গেলে চলনবিল বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রকৃতিনির্ভর পর্যটন অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।

একই সঙ্গে নদী ও খালের নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষা, অবৈধ দখল ও ক্ষতিকর জাল নিয়ন্ত্রণ এবং জলাভূমির প্রাকৃতিক চরিত্র অক্ষুণ্ণ রাখার বিষয়টিকেও পর্যটন পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।

কারণ চলনবিলের আসল সৌন্দর্য কোনো কৃত্রিম রিসোর্টে নয়, তার সৌন্দর্য জলের বিস্তারে, আকাশের প্রতিবিম্বে, নৌকার ছইয়ে, পাখির ডানায়, জেলের জালে আর কৃষকের মাঠে।

পর্যটনের জন্য চলনবিলকে সাজানোর আগে তাই চলনবিলকে বাঁচাতে হবে। জল যদি হারিয়ে যায়, নদী যদি শুকিয়ে যায়, জীববৈচিত্র্য যদি নিঃশেষ হয়—তবে পর্যটকের জন্য পড়ে থাকবে শুধু একটি নাম।

চলনবিলকে ঘিরে পর্যটনের স্বপ্ন অবশ্যই দেখা যায়। তবে সেই স্বপ্নের প্রথম শর্ত একটাই—বিলকে তার নিজের মতো করে বাঁচতে দেওয়া।