আন্তর্জাতিক মর্যাদাপূর্ণ স্থাপত্য পুরস্কার পেল রংপুরের কারখানা

বাংলাদেশের রংপুরে অবস্থিত একটি কার্পেট কারখানা জিতেছে স্থাপত্যশিল্পের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পুরস্কার। সবুজে ঘেরা নান্দনিক নকশা, পুকুরপাড়ের হাঁটার পথ, খোলামেলা উঠান এবং শ্রমিকদের কল্যাণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার জন্য ‘রিবা ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ’ পেয়েছে সাততলা গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) এ পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। সিএনএন এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ কারখানার সবুজ চিত্র।    

যুক্তরাজ্যভিত্তিক রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টস (রিবা) আয়োজিত এই দ্বিবার্ষিক পুরস্কারের বিচারকেরা কারখানাটির স্থাপত্যকে 'নীরব বিনয়' হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

১ লাখ ৪৪ হাজার বর্গফুটেরও বেশি জায়গাজুড়ে বিস্তৃত কারখানাটির নকশায় প্রকৃতিকে কর্মপরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সবুজ বাগান, গাছপালায় ঘেরা বারান্দা এবং লতাপাতায় আচ্ছাদিত প্রধান দেয়াল ভবনটিকে এক অনন্য রূপ দিয়েছে। রিবার মতে, এই নকশার মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে প্রকৃতিকে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে।

গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি

২০১৭ সালে কারখানাটির যাত্রা শুরু হলেও করোনা মহামারিসহ বিভিন্ন কারণে রিবার বিচারকেরা সরেজমিনে এটি পরিদর্শন করতে পারেননি। চলতি বছর সেপ্টেম্বরে তাঁরা কারখানাটি পরিদর্শন করেন।

বাংলাদেশি স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান নকশাবিদ আর্কিটেক্টসের নকশায় নির্মিত এই কারখানার পরিকল্পনায় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী বসতবাড়ি। এসব বাড়িতে সাধারণত উঠান, পুকুর এবং খোলা জায়গার সমন্বয় দেখা যায়। সেই ঐতিহ্যকে আধুনিক শিল্পস্থাপত্যে রূপ দিয়েছেন স্থপতিরা। 

নারী শ্রমিকদের কল্যাণে বিশেষ গুরুত্ব 

কারখানাটির নকশায় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে সেখানে কর্মরত প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিকের জীবনযাত্রা ও কল্যাণ। তাঁদের অধিকাংশই নারী। শ্রমিকদের জন্য ভবনের ছাদে রয়েছে শিশুদের পরিচর্যাকেন্দ্র, চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ব্যবস্থা এবং অবসর কাটানো ও সামাজিক যোগাযোগের জন্য ছায়াঘেরা জায়গা। কারখানার প্রবেশপথে স্থাপন করা হয়েছে এক নারীর বিশাল ভাস্কর্য, যা নারীর ক্ষমতায়নের শক্তির প্রতীক বলে জানিয়েছেন স্থপতিরা।

গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি

সাততলা ভবনটির চারটি তলায় বস্ত্র উৎপাদনের কাজ হয়। বাকি তলাগুলোতে রয়েছে পণ্য প্যাকেজিংয়ের ব্যবস্থা ও গুদাম।

রিবার বিচারকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কর্মীরা কাজের সময়ের বাইরেও অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কারখানার বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করেন। তাঁদের মতে, গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি শিল্পকারখানার নকশা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি বিকল্প দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

কারখানাটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, শ্রমিক, ব্যবস্থাপক ও মালিক—সবার জন্য একই প্রধান প্রবেশপথ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের বড় কারখানাগুলোতে সাধারণত শ্রমিক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য পৃথক প্রবেশপথ থাকে। এই প্রচলিত ব্যবস্থার বিপরীতে সবার জন্য অভিন্ন প্রবেশপথকে বিচারকমণ্ডলী সমমর্যাদা ও সমতার প্রতীক হিসেবে দেখেছে।

পুরস্কারের বিচারকমণ্ডলীর প্রধান বিজয় জৈন তাঁর মূল্যায়নে এই প্রবেশপথকে ‘সমতাভিত্তিক অভিন্ন প্রবেশদ্বার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

কারখানা শুধু উৎপাদনের যন্ত্র নয়, মানুষেরও আশ্রয়স্থল

নকশাবিদ আর্কিটেক্টসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান স্থপতি বায়েজিদ এম. খন্দকার বলেছেন, তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে শিল্পপ্রতিষ্ঠানও মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করতে, লালন করতে এবং অনুপ্রাণিত করতে পারে।

তাঁর ভাষায়, 'আমরা একটি সহজ প্রশ্ন তুলেছিলাম—যদি কারখানার নকশা প্রথমেই সেখানে কর্মরত মানুষদের জন্য একটি বাড়ি হিসেবে করা হয়, তাহলে কেমন হবে? প্রতিটি উঠান, বাগান, জলাশয় ও ছায়াঘেরা বারান্দার পরিকল্পনা এই প্রশ্ন থেকেই এসেছে। কারখানা এমন কোনো যন্ত্র হওয়া উচিত নয়, যা মানুষের শক্তি নিঃশেষ করে দেয়। বরং এটি এমন একটি জীবন্ত জায়গা হওয়া উচিত, যা মানুষের শক্তি ফিরিয়ে দেয়।'

কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড পরিচালিত গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরিতে হাতে তৈরি কার্পেটের পাশাপাশি দরজার সামনে ব্যবহারের ম্যাট ও বাথম্যাটসহ বিভিন্ন বস্ত্রপণ্য উৎপাদিত হয়।

এবারের পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় চারটি স্থাপনা ছিল, যার মধ্যে বাংলাদেশের দুটি প্রকল্প স্থান পায়। রংপুরের গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরির পাশাপাশি ছিল ঢাকার জলবায়ু-উপযোগী ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। অন্য দুটি প্রকল্পই বেলজিয়ামের—একটি ১৯৬০-এর দশকের অফিস ভবনের আধুনিক সংস্কার এবং অন্যটি সম্প্রসারিত একটি শিল্পকলা প্রতিষ্ঠান। 

বাংলাদেশের শিল্পকারখানার নকশায় নতুন দৃষ্টান্ত

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বস্ত্র উৎপাদনকারী দেশ বাংলাদেশে পোশাক ও বস্ত্রশিল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। 

২০১৩ সালে ঢাকার অদূরে সাভারে রানা প্লাজা ধসে প্রায় ১ হাজার ১০০ মানুষের মৃত্যু হয়। ভবনটিতে একাধিক পোশাক কারখানা ছিল। ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ার পরও শ্রমিকদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগ উপেক্ষা করে কাজে ফিরতে বাধ্য করার অভিযোগ ওঠে। এই বিপর্যয় বাংলাদেশের শিল্পকারখানায় কাঠামোগত নিরাপত্তার পাশাপাশি শ্রমিকদের অধিকার ও কর্মপরিবেশের গুরুত্বও সামনে নিয়ে আসে।

রিবার মতে, গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরির নকশা শ্রমিকদের সুস্থতা ও কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রচলিত সামাজিক স্তরবিন্যাসকে চ্যালেঞ্জ করেছে।

গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি

২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত রিবা ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজকে একটি একক ভবনের জন্য বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্থাপত্য পুরস্কার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উদ্ভাবনী চিন্তা, দূরদর্শী পরিকল্পনা ও স্থাপত্যের উৎকর্ষকে স্বীকৃতি দেওয়াই এই পুরস্কারের লক্ষ্য।

২০২৪ সালে স্পেনের বার্সেলোনায় নির্মিত ছয়তলা কাঠের সামাজিক আবাসন প্রকল্প এই পুরস্কার জিতেছিল। এর আগের বিজয়ীদের মধ্যে রয়েছে ব্রাজিলের গ্রামীণ এলাকার একটি বিদ্যালয়, পেরুর একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশের বন্যাপ্রবণ প্রত্যন্ত অঞ্চলে নির্মিত একটি হাসপাতাল।

গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরির এই স্বীকৃতি প্রমাণ করে, শিল্পকারখানার নকশায় উৎপাদন ও বাণিজ্যিক চাহিদার পাশাপাশি শ্রমিকদের মর্যাদা, সুস্থতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানকেও গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব।