নদী ও সাগরের মোহনায় জেগে ওঠা, বিস্তীর্ণ চর আর জেলেদের ব্যস্ত জীবনযাত্রায় ঘেরা এক শান্ত জনপদ পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী। দিগন্তজোড়া নীল জলরাশি আর উপকূলীয় প্রকৃতির এই রূপ-সৌন্দর্য এতদিন দেশের মানুষের কাছেও অচেনাই ছিল।
তবে নিভৃত এই দ্বীপাঞ্চলের জানা-অজানা রূপকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে দিচ্ছেন স্থানীয় এক উদ্যমী তরুণ-শাওন আহমেদ। নিজের পিতৃহারা ব্যক্তিগত শোক ও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েও পটুয়াখালী করিম মৃধা কলেজের এই শিক্ষার্থী কেবল নিজের ভাষার দক্ষতায় জার্মানি, ইতালি কিংবা সুইজারল্যান্ডের বিদেশি পর্যটকদের কাছে তুলে ধরছেন নিজ মাতৃভূমির গল্প।
পটুয়াখালীর প্রান্তিক উপকূলকে বিশ্ব পর্যটন মানচিত্রে একটি অনন্য ঠিকানা হিসেবে পরিচিত করার স্বপ্ন নিয়েই পথ চলছেন এই তরুণের।
এখন পর্যন্ত আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ জন বিদেশি পর্যটককে তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। এর মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে তাঁর নিজের গ্রাম তিল্লা ও পটুয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চল।
উদ্যোক্তা শাওন আহমেদ বলেন, আমার উদ্দেশ্য হলো নিজের গ্রাম তিল্লা ও রাঙ্গাবালীর সৌন্দর্য সোশ্যাল মিডিয়ার ভিডিওর মাধ্যমে বিশ্বদরবারে তুলে ধরা। বিদেশি পর্যটকদের আগমনের মাধ্যমে স্থানীয় জেলে, মাঝি ও ব্যবসায়ীদের কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ানোই আমার মূল লক্ষ্য।
ইতালীয় পর্যটক স্টেফ বলেন, রাঙ্গাবালীর শান্ত পরিবেশ, নদ-নদী, সবুজ মাঠ ও মানুষের আন্তরিকতা সত্যিই অসাধারণ। ঢাকা থেকে ১৬ ঘণ্টার লঞ্চ যাত্রা এবং গ্রামের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা আমার জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিদেশি পর্যটকদের জন্য এটি চমৎকার একটি গন্তব্য।
স্থানীয় ট্রলারের মাঝি বেল্লাল খান বলেন, শাওন প্রায়ই বিদেশি পর্যটকদের নিয়ে আয় ( আসে)। আগে হুদা (শুধু) মাছ ধইরা (ধরেই) সংসার চলত, এখন পর্যটক মোগো আর্শীবাদ। তাগোর লগে হারাদিন থাকলে টাহা দেয় (তাদের ঘুরিয়ে আমাদের বাড়তি আয় হচ্ছে)। মোরা হ্যাগোর ভাষা বুঝি না তয় (ভাষা না বুঝলেও) শাওন আমাদের কথা ওদের বুঝিয়ে দেয়।
টোয়াক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মিরাজ বলেন, রাঙ্গাবালীর পর্যটন খাতে অপার সম্ভাবনা রয়েছে। শাওনের মতো তরুণদের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। পরিকল্পিত উন্নয়ন, দক্ষ গাইড, নিরাপদ নৌযান ও পরিবেশ রক্ষা নিশ্চিত করা গেলে এটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠবে।
কুয়াকাটা ট্যুরিস্ট বোট মালিক সমবায় সমিতি সহ সভাপতি বলেন, কুয়াকাটায় আসা পর্যটকদের আমরা বোটের মাধ্যমে চর বিজয়, সোনার চর, জাহাজমারা ও লেম্বুরবনের মতো স্থানে ঘুরিয়ে আনি। সমন্বিত ও পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে এ অঞ্চলের পর্যটন সম্ভাবনা আরও বিকাশ লাভ করবে।
রাঙ্গাবালী ট্যুরিস্ট নিরাপত্তা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব খান বলেন, শাওনের উদ্যোগকে সরকারি সহায়তা ও উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন। এতে বিদেশি পর্যটক বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে।
রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাজমুল হাসান বলেন, শাওন আহমেদের উদ্যোগ সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে তাঁর সঙ্গে বসব। উপকূলীয় পর্যটনের সেবার মান বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।