গুয়াংজুতে বাংলাদেশের কনস্যুলেট চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন

চীনের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক শহর গুয়াংজুতে বাংলাদেশের কনস্যুলেট অফিস খোলার দাবি জানিয়েছেন সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশিরা। এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আবেদন করেছেন তারা। আবেদনকারীদের মতে, গুয়াংজু ও আশপাশের অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি বসবাস ও ব্যবসা করলেও সেখানে বাংলাদেশের কোনো কনস্যুলেট অফিস নেই। এতে কনস্যুলেট সেবা নিতে গিয়ে নানা ধরনের ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের।

গুয়াংজু ও আশপাশের অঞ্চলে বসবাসরত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও শিক্ষার্থীদের পক্ষে আবেদনটি করেছেন মো. সাখাওয়াত হোসেন কানন। তিনি গুয়াংজু ফ্রেন্ডশিপ ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেড এবং রাঁধুনী রেস্টুরেন্টের সঙ্গে যুক্ত। চীনের গুয়াংজু শহর থেকে করা এই আবেদনের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী, প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী, বেইজিংয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত এবং বিসিসিসিআইয়ের সভাপতির কাছেও।

আবেদনে বলা হয়েছে, গুয়াংজু চীনের গুয়াংডং প্রদেশের রাজধানী। অর্থনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাণিজ্যের দিক থেকে শহরটির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। চীনের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক শহর হিসেবে পরিচিত গুয়াংজু দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের হংকং ও ম্যাকাওকে ঘিরে গড়ে ওঠা শিল্প, বাণিজ্য ও ব্যবসার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।

প্রতি বছর দুবার গুয়াংজুতে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা ক্যান্টন ফেয়ার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার ক্রেতা-বিক্রেতার পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাও এতে অংশ নেন। এ ছাড়া চীনের দুটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গুয়াংডং প্রদেশে অবস্থিত, যা বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সম্ভাবনা ও বাণিজ্যিক সুবিধা তৈরি করতে পারে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আবেদনকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গুয়াংজু, শেনঝেন, ডংগুয়ান, ফোশান ও ঝোংশান শহরে ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশার প্রায় ২৫ হাজার বাংলাদেশি বসবাস করেন। পাশাপাশি প্রতি মাসে প্রায় ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার বাংলাদেশি ব্যবসা, পর্যটন ও চিকিৎসার প্রয়োজনে গুয়াংজুতে যাতায়াত করেন।

বাংলাদেশ বিমান, ইউএস-বাংলা, চায়না সাউদার্ন, চায়না ইস্টার্ন, শ্রীলঙ্কান, থাই ও মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনসসহ একাধিক বিমান সংস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশিরা গুয়াংজুতে যাতায়াত করেন। ঢাকা থেকে গুয়াংজু পৌঁছাতে উড়োজাহাজে সময় লাগে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা।

আবেদনে আরও বলা হয়েছে, বর্তমানে চীনে বাংলাদেশের কনস্যুলার সেবা মূলত বেইজিংয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস এবং কুনমিংয়ে অবস্থিত কনস্যুলেট জেনারেল অফিসের মাধ্যমে দেওয়া হয়। কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব চীনের গুয়াংডং, গুয়াংশি, ফুজিয়ান, হুনান ও হাইনান প্রদেশ এবং শেনঝেন, ডংগুয়ান, ফোশান ও ঝোংশান শহরে বসবাসরত বাংলাদেশিদের এসব সেবা নিতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়।

আবেদনকারীদের হিসাব অনুযায়ী, গুয়াংজু থেকে বেইজিংয়ের দূরত্ব প্রায় ২ হাজার ১২৬ কিলোমিটার এবং কুনমিংয়ের দূরত্ব প্রায় ১ হাজার ৩৪০ কিলোমিটার। ফলে প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সেবা নিতে এসব অঞ্চলের বাংলাদেশিদের সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়।

আবেদনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আরেকটি গুরুতর সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, চীনে কোনো বাংলাদেশি মারা গেলে তার মরদেহ দেশে পাঠাতে প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা প্রয়োজন হয়। এ জন্য বিভিন্ন ধরনের কাগজপত্র ও আনুষ্ঠানিকতাও সম্পন্ন করতে হয়।

আবেদনকারীদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থার সহায়তা ছাড়াই স্থানীয় বাংলাদেশিদের কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হয়। এতে মৃত ব্যক্তির পরিবার এবং সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশিরা আর্থিক ও মানসিক কষ্টের মুখে পড়েন। জরুরি কনস্যুলার সেবা পেতেও তাদের প্রচুর সময় ব্যয় করতে হয় এবং নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়।

চীনে ব্যবসা করতে গিয়ে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টিও আবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। আবেদনকারীদের অভিযোগ, এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারছেন না। তাদের মতে, গুয়াংজুতে বাংলাদেশের কনস্যুলেট অফিস চালু হলে প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে সহায়তা পাওয়া সহজ হবে।

আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশের কনস্যুলেট বা দূতাবাসের অফিস গুয়াংজুতে রয়েছে। কিন্তু সেখানে বাংলাদেশের কোনো কনস্যুলেট অফিস নেই বলে দাবি করেছেন আবেদনকারীরা।

তাদের দেওয়া তালিকায় এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, নেপাল, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, ইরান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাকের নাম রয়েছে।

ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, অস্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ড, ডেনমার্ক, নরওয়ে, ইতালি, স্পেন, গ্রিস, পর্তুগাল, পোল্যান্ড, রাশিয়া, ইউক্রেন ও বেলারুশ।

উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকো, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, চিলি, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, পেরু, কিউবা ও ভেনেজুয়েলা। এ ছাড়া আফ্রিকার নাইজেরিয়া, ইথিওপিয়া, ঘানা, মালি, অ্যাঙ্গোলা, কঙ্গো, তানজানিয়া, উগান্ডা, সুদান ও জাম্বিয়া এবং ওশেনিয়া অঞ্চলের অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের নামও তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে।

আবেদনকারীরা আশা প্রকাশ করেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গুয়াংজুতে বাংলাদেশের কনস্যুলেট অফিস স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলে ওই অঞ্চলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপস্থিতি আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবনযাত্রা সহজ হবে এবং তাদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কার্যকর সহায়তা পাওয়া যাবে।

ক্যান্টন ফেয়ার চীনের গুয়াংজু শহরে অনুষ্ঠিত বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা। ১৯৫৭ সাল থেকে প্রতিবছর বসন্ত ও শরৎকালে দুবার এ মেলা আয়োজন করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের শরৎকালীন ১৪০তম ক্যান্টন ফেয়ার গত ১৫ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে। মেলাটিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্রেতা-বিক্রেতারা অংশ নেন। বাংলাদেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারাও এই মেলায় অংশ নিয়ে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের সুযোগ পান।