তালতলীতে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বর্জ্য নদীতে, প্রতিবাদে মানববন্ধন

বরগুনার তালতলীতে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বর্জ্য পায়রা নদীতে ফেলার অভিযোগে মানববন্ধন করেছেন এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রের ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে নদীর পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি মাছ ও জলজ প্রাণীর ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নদীর ওপর নির্ভরশীল জেলে ও স্থানীয় বাসিন্দারা পরিবেশগত ক্ষতির শঙ্কায় রয়েছেন। বিভিন্ন সময় অভিযোগ ও সংবাদ প্রকাশের পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেল ৫টার দিকে উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের জয়ালভাঙ্গা এলাকায় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশে পায়রা নদী ইলিশ রক্ষা কমিটির উদ্যোগে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রায় দুই শতাধিক ভুক্তভোগী ও স্থানীয় বাসিন্দা অংশ নেন। এ সময় নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ, পরিবেশসম্মত স্থানে বর্জ্য অপসারণ এবং নদী রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তারা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বরিশাল ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (বিইপিসিএল) ৩৫০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বর্জ্য অপসারণের জন্য স্থানীয় মিরাজের মালিকানাধীন মিরাজ এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, পরিবেশসম্মত ও নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলার কথা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য না ফেলে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও নৌকার মাধ্যমে পায়রা নদীর মাঝ বরাবর ফেলা হচ্ছে। এভাবে বর্জ্য ফেলা অব্যাহত থাকলে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ, মাছসহ জলজ প্রাণী এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জেলেরা।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া কামাল চৌকিদার, সুলতানসহ একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বর্জ্য ও এর কার্যক্রমের কারণে পায়রা নদীতে মাছ কমে গেছে। আগের মতো মাছ না পাওয়ায় জেলেদের আয়-রোজগার কমেছে। এতে পরিবার-পরিজন নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। আর্থিক সংকটের কারণে সন্তানদের লেখাপড়া, বিয়ে ও অন্যান্য পারিবারিক দায়িত্ব পালন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। নদীতে মাছ কমে যাওয়ায় ঋণ পাওয়াও কঠিন হয়ে উঠেছে বলে জানান তাঁরা। বিভিন্ন সময় প্রতিবাদ, অভিযোগ ও সংবাদ প্রকাশের পরও প্রতিকার না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে মানববন্ধনে দাঁড়িয়েছেন বলে জানান ভুক্তভোগীরা।

একাধিক জেলে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নদীতে মাছ না থাকায় তাদের আয় নেই। কোনো এনজিও থেকেও ঋণ পাওয়া যাচ্ছে না। সন্তানদের বিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছেন তারা। নদীর ওপর নির্ভর করেই তাদের জীবন চলে। নদী দূষিত হলে তাদের বেচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে। এ সময় তারা নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ, দূষণের প্রভাব তদন্ত এবং জেলেদের জীবন-জীবিকা রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।

স্থানীয় সংবাদকর্মী মো. মোস্তাফিজ বলেন, পায়রা নদী এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা ও প্রাকৃতিক সম্পদের অন্যতম প্রধান উৎস। নদীতে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বর্জ্য ফেলা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এতে নদীর পরিবেশ ও মৎস্যসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়বেন স্থানীয় জেলেরা। তাই বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ এবং নদী রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তিনি প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন, যাতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত ও পরিবেশসম্মত স্থানে বর্জ্য ফেলে এবং পায়রা নদী দূষণের হাত থেকে রক্ষা পায়।

পরিবেশকর্মী ও ফটোসাংবাদিক আরিফুর রহমান বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। বর্জ্য নদীতে ফেলা হলে দূষণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তার দাবি, গত তিন বছর ধরে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। এ নিয়ে প্রতিবাদ করলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রভাব খাটানো ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

নদীতে বর্জ্য ফেলার বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদার মিরাজ বলেন, ‘আমিই নদীতে বর্জ্য ফেলেছি। তবে এখন নতুন একটি স্থান নির্ধারণ করে সেখানে বর্জ্য ফেলা হবে।’

এ বিষয়ে তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অতীশ সরকার জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিবেশ নষ্ট করে ও নদীর পানি দূষিত করে কাউকে কোনো ধরনের অপকর্ম করতে দেওয়া হবে না। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।