ওয়াজ মাহফিলে সংযম ও দায়িত্বশীলতা

শীতের রাত, গ্রামের মাঠে প্যান্ডেল, মাইকের ধ্বনি আর দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসা ধর্মপ্রাণ মানুষের সমাগমে শীতকালীন ওয়াজ মাহফিল বাংলার চিরায়ত ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্যের এক পরিচিত দৃশ্য। কোরআন তেলাওয়াত, হামদ-নাত, দ্বীনি আলোচনা ও নসিহতের মাধ্যমে এসব মাহফিল মানুষের হৃদয়ে আল্লাহভীতি, রাসুলপ্রেম ও নৈতিকতার চেতনা জাগ্রত করে।

দুঃখজনক ব্যাপার হলো, কিছু ওয়ায়েজিনের ব্যক্তিগত আক্রমণ, গিবত, অপবাদ, কুৎসা ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য মাহফিলের ধর্মীয় আলোচনার পরিবেশকে কলুষিত করছে। যে মঞ্চ মানুষের আত্মশুদ্ধি ও চরিত্র গঠনের জন্য, সেই মঞ্চই যদি বিভেদ ও পরনিন্দার উপলক্ষ হয়ে ওঠে, তবে মাহফিলের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে ভবিষ্যতে প্রশ্ন উঠতে পারে।

মতপার্থক্য ইসলামি জ্ঞানচর্চার স্বাভাবিক বিষয়। তবে মতভেদ কখনো ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, অপমান কিংবা চরিত্রহননের অজুহাত হতে পারে না। সত্যনিষ্ঠ সমালোচনা ও গিবত এক নয়। সংশোধনের আহ্বান ও অপমানও এক নয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা একে অপরের গিবত করো না।’ (সুরা হুজুরাত ১২)

রাসুলুল্লাহ (সা.) গিবত সম্পর্কে বলেন, কারও অনুপস্থিতিতে তার এমন বিষয় আলোচনা করা, যা সে অপছন্দ করে, তা গিবত। (সহিহ মুসলিম ২৫৮৯)

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে এলে তোমরা তা যাচাই করে নাও।’ (সুরা হুজুরাত ৬)

বক্তার দায়িত্ব হলো প্রজ্ঞা, শালীনতা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে মানুষকে সত্যের পথে আহ্বান করা। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আপনি আপনার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করুন হেকমত (প্রজ্ঞা) ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে বিতর্ক করুন উত্তম পন্থায়। নিশ্চয়ই আপনার প্রতিপালক ভালো জানেন কে তার পথ থেকে ছিটকে পড়েছে এবং তিনি এও ভালো জানেন কারা সৎপথে রয়েছে।’ (সুরা নাহল ১২৫)

মাহফিলের সার্থকতা শুধু জনসমাগমে নয়। কত মানুষ নামাজে যতœবান হলো, কত পরিবারে শান্তি ফিরল, কত তরুণ মাদক থেকে দূরে সরে এলো এবং কত হৃদয়ে মানবিকতা জাগ্রত হলো, এগুলোর মধ্যেই মাহফিলের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত।

শীতকালীন ওয়াজ মাহফিলের ঐতিহ্য রক্ষায় আলেম, আয়োজক ও শ্রোতা সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। মাইক্রোফোন হোক হেদায়েতের কণ্ঠস্বর, বিদ্বেষের অস্ত্র নয়। মঞ্চ হোক আত্মশুদ্ধির আয়না, প্রতিপক্ষকে হেয় করার স্থান নয়। গিবতের পরিবর্তে আত্মসমালোচনা, বিদ্বেষের পরিবর্তে ভালোবাসা এবং বিভেদের পরিবর্তে ঐক্যের চর্চাই ফিরিয়ে আনতে পারে ওয়াজ মাহফিলের প্রকৃত মর্যাদা।

লেখক : সুফিচিন্তাবিদ ও ধর্মীয় নিবন্ধকার