সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য অনেক চেষ্টা করেন মা-বাবা। ভালো স্কুলে ভর্তি করা, প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে দেওয়া, পড়াশোনার খোঁজ রাখা, সব কিছুতেই থাকে তাদের আন্তরিকতা। কিন্তু এসবের পাশাপাশি সন্তান কেমন মানুষ হয়ে উঠছে, সেটিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। বর্তমান সময়ে সন্তান প্রতিপালনের ধরনে এসেছে পরিবর্তন। প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় শিশুদের অবসর কাটানোর বড় অংশজুড়ে রয়েছে মোবাইল ফোন। এতে তারা অনেক সময় পরিবার, প্রকৃতি ও বাস্তব জীবনের নানা অভিজ্ঞতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। অথচ শিশুর মানসিক বিকাশ ও সুন্দর চরিত্র গঠনে বাবা-মায়ের সঙ্গ, পারিবারিক শিক্ষা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার গুরুত্ব অপরিসীম।
সন্তান আমানত : মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।’ (সুরা তাহরিম ৬)
এই আয়াতের শিক্ষা হলো, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব কেবল ভরণ-পোষণে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের ইমান, চরিত্র ও জীবনাচরণ নিয়েও অভিভাবককে ভাবতে হবে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। (সহিহ বুখারি ৭১৩৮) সুতরাং সন্তানকে বড় করে তোলাই শেষ কথা নয়, তাকে সঠিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই অভিভাবকের বড় দায়িত্ব।
সঠিক ব্যবহার : প্রযুক্তি আধুনিক জীবনের প্রয়োজনীয় অংশ। শিক্ষা, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে মোবাইলের যথেষ্ট উপকার রয়েছে। কিন্তু সেটি যখন শিশুর বিনোদন, বন্ধুত্ব, শিক্ষা, অবসরসহ সবকিছুর বিকল্প হয়ে যায়, তখন বিষয়টি নতুন করে ভাবার প্রয়োজন আছে।
সন্তানকে প্রযুক্তি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নয়, তাকে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শেখাতে হবে। কতক্ষণ ব্যবহার করবে, কী দেখবে, কোন বিষয় এড়িয়ে চলবে, এসব বিষয়ে অভিভাবকের সচেতন থাকা জরুরি।
এর পাশাপাশি স্ক্রিনের বাইরে একটি সমৃদ্ধ পৃথিবীর সঙ্গে শিশুর পরিচয় ঘটাতে হবে। নির্দিষ্ট একটা বয়স পর্যন্ত শিশুদের হাতে মোবাইল না দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
বাস্তব জীবনের শিক্ষা : সন্তানকে নিজের বই-খাতা গুছাতে দিন। নিজের বিছানা ঠিক করতে শেখান। ঘরের সামান্য কাজে অংশ নিতে দিন। বাজারে সঙ্গে নিয়ে যান। বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়, অতিথিকে কীভাবে সম্মান করতে হয়, এসব হাতে-কলমে শেখান।
কখনো তাকে নিয়ে মাঠে যান। কখনো গাছ লাগাতে দিন। কখনো গ্রামের মানুষের জীবন দেখান। বুঝতে দিন, খাবার টেবিলে আসার আগে কৃষকের ঘাম ঝরে, একটি ঘর পরিচালনার পেছনে মায়ের শ্রম থাকে, আর অর্থ উপার্জনের পেছনে বাবার পরিশ্রম রয়েছে। এভাবে সে ধীরে ধীরে শ্রমের মর্যাদা, সময়ের মূল্য ও দায়িত্বের অর্থ বুঝতে শিখবে।
দ্বীনি শিক্ষা : সন্তান প্রতিপালনে ইসলামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, শৈশব থেকেই তাকে দায়িত্বশীলতার প্রতি অভ্যস্ত করা। রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমাদের সন্তানরা সাত বছর বয়সে উপনীত হলে তাদের নামাজের নির্দেশ দাও...। (সুনানে আবু দাউদ ৪৯৫)
আদব ও দ্বীনি শিক্ষা নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে দিতে হয়। বাবা-মাকে নিজের আচরণ দিয়েই সন্তানের সামনে আদর্শ স্থাপন করতে হয়। কোরআনে হজরত লুকমান হাকিম তার সন্তানকে দেওয়া উপদেশেও আমরা এর সুন্দর দৃষ্টান্ত দেখি। তিনি সন্তানকে শিরক থেকে বেঁচে থাকা, নামাজ কায়েম করা, সৎকাজের নির্দেশ, অসৎকাজ থেকে নিষেধ, ধৈর্য ও বিনয়ের শিক্ষা দিয়েছেন। (সুরা লুকমান ১৩-১৯) এখানে সন্তানের চিন্তা, চরিত্র ও আচরণকে গড়ে তোলার বিষয়টি স্পষ্ট।
সব চাহিদা পূরণ করা ভালোবাসা নয় : সন্তান কিছু চাইলেই কিনে দেওয়া অভিভাবকত্বের সাফল্য নয়। বরং কোনটি প্রয়োজন আর কোনটি নিছক আকাক্সক্ষা, এই পার্থক্য তাকে বোঝানো দরকার। কখনো তাকে অপেক্ষা করতে দিন। কখনো বলুন, ‘এটা এখন প্রয়োজন নেই।’ নিজের সামর্থ্যরে মূল্য বুঝতে দিন। পকেটমানি দিলে সেটার হিসাব রাখতে শেখান। শৈশবেই যদি সে সীমাবদ্ধতা, অপেক্ষা ও পরিশ্রমের মূল্য বুঝতে শেখে, তাহলে ভবিষ্যতের বাস্তবতাও তার কাছে তুলনামূলকভাবে সহজবোধ্য হবে।
সন্তানকে সময় দেওয়া : অল্প সামর্থ্যরে পরিবারেও বাবা-মায়ের আন্তরিক সঙ্গ একটি শিশুর জন্য অমূল্য সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। তার সঙ্গে কথা বলুন। প্রশ্ন করতে উৎসাহ দিন। তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। একসঙ্গে বই পড়ুন। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিন। অসুস্থ কিংবা দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিন। এসব অভিজ্ঞতা শিশুর মনে এমন শিক্ষা তৈরি করে, যা কোনো স্ক্রিন তাকে দিতে পারে না।
ভালো ফলের সঙ্গে ভালো চরিত্র : আমরা সন্তানের পরীক্ষার ফল নিয়ে যতটা উদ্বিগ্ন থাকি, তার চরিত্র নিয়েও কি ততটা ভাবি? সে কত নম্বর পেল, এটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সে সত্য কথা বলে কি না, আমানত রক্ষা করে কি না, ছোটদের স্নেহ করে কি না, বড়দের সম্মান করে কি না, অন্যের কষ্ট বুঝতে পারে কি না, এসবও তো তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়।
একজন শিক্ষিত মানুষ সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। কিন্তু সৎ, দায়িত্বশীল ও বিনয়ী মানুষ হওয়ার জন্য প্রয়োজন বিশেষ শিক্ষা। তাই সন্তানের জন্য ভালো স্কুল যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন ভালো পারিবারিক পরিবেশ, সৎসঙ্গ, দ্বীনি শিক্ষা এবং দায়িত্বশীল অভিভাবকত্ব।
সন্তানের হাতে মোবাইল দেওয়ার আগে তাকে পৃথিবীর সঙ্গে পরিচিত করুন। বইয়ের পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতা দিন। খেলনার পাশাপাশি দায়িত্ব দিন। শিক্ষার সঙ্গে আদব ও আখলাক শেখান। তাকে শুধু ভবিষ্যতের চাকরির জন্য প্রস্তুত করবেন না, জীবনের জন্য প্রস্তুত করুন। কারণ সন্তানকে কত দামি জিনিস দিয়েছেন, সময়ের সঙ্গে সেটার অনেকটাই হারিয়ে যেতে পারে। কিন্তু শৈশবে শেখানো একটি ভালো অভ্যাস, একটি সুন্দর আদব কিংবা একটি দৃঢ় নৈতিক শিক্ষা সারা জীবন তার সঙ্গে থেকে যাবে।
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া আশরাফুল মাদারিস, তেজগাঁও, ঢাকা