বীমাসেবা শহরের গণ্ডি পেরিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দিতে হবে

‘স্মার্ট ইকোনমি’ বাস্তবায়নে বীমা খাত কীভাবে অবদান রাখছে?

‘স্মার্ট ইকোনমি’ মানে শুধু ডিজিটাল লেনদেন নয়, এটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সমন্বিত ব্যবস্থা। বীমা খাত পরিবার ও উদ্যোগকে ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেয়, জাতীয় সঞ্চয় গঠনে সহায়তা করে এবং অবকাঠামো ও শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি তহবিল জোগায়। এই ব্যবস্থায় বীমা খাতের ভূমিকা শুধু আর্থিক ক্ষতি পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ভিত্তি শক্তিশালী করাও এর অন্যতম দায়িত্ব। ইসলামী জীবনবীমা বা তাকাফুলের দর্শনে পারস্পরিক সহযোগিতা, দায়িত্বশীলতা ও শরিয়াহসম্মত আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমরা মনে করি, এই মূল্যবোধকে আধুনিক প্রযুক্তি ও পেশাদার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সমন্বয় করতে পারলে বীমা খাত স্মার্ট অর্থনীতি গঠনে আরও কার্যকর অবদান রাখতে পারবে।  

দেশে বীমার প্রসার বাড়াতে আপনাদের মূল কৌশল কী?

আমাদের মূল কৌশল চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে। প্রথমত, শরিয়াহসম্মত ও গ্রাহক প্রত্যাশিত পণ্য উদ্ভাবন; দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার; তৃতীয়ত, এজেন্ট ও বিকল্প চ্যানেলের বিস্তার; চতুর্থত,  জনসচেতনতা ও গ্রাহকের আস্থা বৃদ্ধি। পাশাপাশি ক্ষুদ্র বীমা, গ্রুপ বীমা, ব্যাংকাস্যুরেন্স এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সঙ্গে অংশীদারিত্ব বাড়াচ্ছি। গ্রাহকের আস্থা অর্জনই আমাদের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।

গ্রাহকসেবা সহজ করতে আপনারা কী ধরনের ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করেছেন?

 স্মার্ট ইন্স্যুরেন্সের মূল উদ্দেশ্য হলো গ্রাহকের প্রয়োজনীয় সেবা যেন সহজে, দ্রুত, স্বচ্ছভাবে এবং কম ভোগান্তিতে দেওয়া যায়। গ্রাহকসেবা সহজ করতে আমরা মোবাইল অ্যাপ ও অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে পলিসির তথ্য দেখা, প্রিমিয়াম পরিশোধ ও সেবার অনুরোধ জানানোর সুবিধা দিচ্ছি। অটোমেশনের মাধ্যমে পলিসি ইস্যু, রিনিউয়াল রিমাইন্ডার ও দাবির আবেদন প্রক্রিয়া দ্রুততর হচ্ছে। এআইভিত্তিক চ্যাটবট ও ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে গ্রাহকের চাহিদা বুঝে সেবা দেওয়ার উদ্যোগও আমরা নিয়েছি। আমাদের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইনে প্রিমিয়াম পরিশোধ, কোটেশন নেওয়া, পলিসি-সংক্রান্ত তথ্য দেখা, ই-রসিদ সংগ্রহ এবং গ্রাহকসেবার বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে।

প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষের কাছে বীমাসেবা পৌঁছে দিতে কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হলে বীমাসেবাকে শহরের গণ্ডি পেরিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দিতে হবে। বিশেষ করে কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, অনিয়মিত আয়ের মানুষ, নারী, তরুণ এবং প্রবাসী পরিবারের সদস্যদের আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সেবা সাজানো প্রয়োজন। গ্রামীণ ও উপজেলা পর্যায়ে শাখা ও উন্নয়ন কার্যালয় বাড়াচ্ছি। স্থানীয় যুবক-যুবতিদের বীমা প্রতিনিধির প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। ছোট অঙ্কের প্রিমিয়ামের সহজ পণ্য চালু করছি। মোবাইল প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রিমিয়িাম জমা ও সেবা প্রাপ্তি সহজ করার চেষ্টাও চলছে।

ইনসারটেক বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ কতটুকু কার্যকর ভূমিকা রাখছে?

ইনসারটেক বা বীমা-প্রযুক্তি এবং মোবাইল আর্থিক সেবা বীমা খাতের সেবা ব্যবস্থাকে সহজ ও বিস্তৃৃত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এক্ষেত্রে বিকাশ, নগদ, রকেটসহ মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে গ্রাহক ঘরে বসেই প্রিমিয়াম দিতে পারেন, পলিসি নবায়ন করতে পারেন এবং দাবির টাকা পেতে পারেন। এতে খরচ কমেছে, সময় বেঁচেছে এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আস্থা বেড়েছে।

ক্যাশলেস ও পেপারলেস বীমাসেবা চালু করার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

গ্রাহকদের অনেকের ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতি, ইন্টারনেট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, ডেটা নিরাপত্তা ও সাইবার ঝুঁকি, প্রতারণা ও জালিয়াতির ঝুঁকি, পুরনো আইটি সিস্টেমের সঙ্গে সমন্বয় ও প্রচলিত পদ্ধতিতে অভ্যস্ত মানুষের মানসিকতা পরিবর্তন বড় চ্যালেঞ্জ। ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণ, সচেতনতা ও নীতি-সহায়তার মাধ্যমে এগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। পেপারলেস হওয়াই একমাত্র সাফল্য নয়, বরং কাগজের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি তথ্যের নিরাপত্তা, সেবার নির্ভুলতা ও গ্রাহকের অধিকার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

জলবায়ু পরিবর্তনসহ সমসাময়িক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে গ্রাহকের চাহিদায় যে পরিবর্তন এসেছে, সেগুলো মোকাবিলার বিষয়ে আপনারা কী ভাবছেন? 

কৃষি ও ফসল বীমা, স্বাস্থ্য বীমা এবং সাইবার নিরাপত্তা বীমার চাহিদা বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি, স্বাস্থ্যব্যয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মানুষের আর্থিক ঝুঁকিকে জটিল করে তুলছে। ফলে বীমা পণ্যের ধরন ও সেবার কাঠামো সময়ের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। নতুন চাহিদার কথা মাথায় রেখে ফসল ও কৃষি বীমা, স্বাস্থ্য ও মাইক্রো-হেলথ বীমা, সাইবার নিরাপত্তা বীমা, জলবায়ুু ঝুঁকিভিত্তিক প্যারামেট্রিক বীমা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বীমা এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ কভারেজের পরিকল্পনা রয়েছে।

তরুণ প্রজন্মকে বীমার আওতায় আনতে কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি?

তরুণদের জন্য ডিজিটাল-ফার্স্ট, কম প্রিমিয়ামের সঞ্চয় ও সুরক্ষা প্ল্যান দরকার। তারা যাতে সহজে, স্বল্প খরচে, মোবাইল থেকে এবং অনলাইনের মাধ্যমে বীমা করতে পারে, সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।

গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। আপনারা কীভাবে এ চ্যালেঞ্জ

মোকাবিলা করেন?

বীমা মূলত দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি ও আস্থার সম্পর্ক। গ্রাহক ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার প্রত্যাশায় বীমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। তাই শুধু পলিসি বিক্রি নয়, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেবা দেওয়া এবং গ্রাহকের অধিকার রক্ষা করা প্রতিষ্ঠানের মূল দায়িত্ব। আস্থা তৈরির প্রধান ভিত্তি হলো স্বচ্ছতা, নৈতিকতা, সুশাসন ও জবাবদিহি। পলিসির শর্ত স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা, গ্রাহকের সামর্থ্য অনুযায়ী উপযুক্ত পণ্য নির্বাচনে সহায়তা করা, তথ্যের নির্ভুলতা বজায় রাখা এবং দাবি নিষ্পত্তিতে দায়িত্বশীল থাকা অপরিহার্য। আমরা স্বচ্ছতা, দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি, নৈতিক ব্যবসা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা মেনে চলাকে অগ্রাধিকার দেই।