বীমায় সুশাসন ও গ্রাহকের আস্থা ফেরাতে কাজ চলছে

বীমা খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, গ্রাহকের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং অনিষ্পন্ন দাবি নিষ্পত্তির মাধ্যমে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। দীর্ঘদিন ধরে বীমা দাবি পরিশোধে বিলম্ব, গ্রাহকসেবার সীমাবদ্ধতা এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতা এ খাতের প্রতি মানুষের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এমন পরিস্থিতিতে বীমা কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা, আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

আইডিআরএর লক্ষ্য হলো প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, আধুনিক ও গ্রাহকবান্ধব বীমা খাত গড়ে তোলা। এ লক্ষ্য অর্জনে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর তদারকির পাশাপাশি বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীলতা, দাবি নিষ্পত্তিতে আন্তরিকতা এবং গ্রাহকের অধিকার রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ জরুরি। এর মাধ্যমে বীমা খাতের প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে এ খাতের অবদান আরও বাড়ানো সম্ভব।

আইডিআরএর তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ সেপ্টেম্বর দেশের বীমা খাতে গ্রাহকদের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার দাবি অনিষ্পন্ন ছিল। ওই সময় সামগ্রিকভাবে দাবি নিষ্পত্তির হার ছিল ৫৭ শতাংশ। এ হার অন্তত ৭৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণের কথা জানিয়েছেন আইডিআরএর চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন। এ পরিস্থিতিতে বকেয়া দাবি পরিশোধের পাশাপাশি গ্রাহকের অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং বীমা কোম্পানিগুলোর দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেন তিনি।

আইডিআরএ বীমা খাতের উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দায়িত্ব পালন করে আসছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১০-এর আওতায় পরিচালিত সংস্থাটির কাজের মধ্যে রয়েছে বীমা ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, বীমা শিল্পের উন্নয়নে উদ্যোগ গ্রহণ এবং আইন ও বিধিবিধানের প্রয়োগ নিশ্চিত করা। বীমা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা পর্যবেক্ষণ, হিসাব নিরীক্ষা এবং গ্রাহকের স্বার্থবিরোধী কার্যক্রম প্রতিরোধেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

সাম্প্রতিক সময়ে বকেয়া দাবি পরিশোধের উদ্যোগও নিয়েছে আইডিআরএ। গত ৩ সেপ্টেম্বর প্রথম দফায় সাতটি জীবন বীমা কোম্পানির ২ হাজার ৫৪৯ জন গ্রাহকের প্রায় ১৪ কোটি ৫১ লাখ টাকার দাবি পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ১৪ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় দফায় পাঁচটি কোম্পানির ৫ হাজার ৮৬৮ জন গ্রাহকের প্রায় ২৩ কোটি ৩ লাখ টাকার দাবি পরিশোধের কার্যক্রম শুরু হয়। দুই দফায় মোট ৮ হাজার ৪১৭ জন গ্রাহকের প্রায় ৩৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকার দাবি পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তবে বীমা খাতে দীর্ঘদিনের অনিষ্পন্ন দাবি নিষ্পত্তিতে এ ধরনের উদ্যোগের পাশাপাশি কোম্পানিগুলোর নিয়মিত আর্থিক সক্ষমতা যাচাই এবং কার্যকর তদারকি প্রয়োজন। কারণ, পলিসি গ্রহণের সময় গ্রাহক যে আর্থিক নিরাপত্তার প্রত্যাশা করেন, দাবি উত্থাপনের পর তা নিশ্চিত করতে না পারলে বীমার প্রতি আস্থা তৈরি করা কঠিন।

এ ছাড়া বীমা পলিসির শর্ত সম্পর্কে গ্রাহককে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া, দাবি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া সহজ করা এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি। অনেক গ্রাহক পলিসির শর্ত, দাবি দাখিলের নিয়ম এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় জটিলতার মুখে পড়েন। এ ক্ষেত্রে বীমা কোম্পানিগুলোর স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ ও গ্রাহকসেবা উন্নয়নে আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।

অন্যদিকে, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে বীমা খাতে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। অনলাইনে পলিসি গ্রহণ, প্রিমিয়াম জমা, দাবি আবেদনের অগ্রগতি জানা এবং অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা সহজলভ্য হলে গ্রাহকের ভোগান্তি কমতে পারে। একই সঙ্গে বীমা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের কাছে বীমার সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা তুলে ধরাও গুরুত্বপূর্ণ।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বীমা খাতে টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধু নতুন পলিসি বিক্রি বাড়ানো যথেষ্ট নয়; বরং গ্রাহকের বৈধ দাবি সময়মতো পরিশোধ, কোম্পানির আর্থিক শৃঙ্খলা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হলে বীমা খাতের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়বে। পাশাপাশি দেশের আর্থিক নিরাপত্তা জোরদার এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নেও এ খাত আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।