গ্রাহকের আস্থার বড় পরীক্ষার একটি দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি

‘স্মার্ট ইকোনমি’ বাস্তবায়নে বীমা খাত কীভাবে অবদান রাখছে?

‘স্মার্ট ইকোনমি’ এমন একটি অর্থনীতি যেখানে প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, স্বচ্ছতা, উৎপাদনশীলতা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সমন্বয় থাকবে। এ ধরনের অর্থনীতি গড়ে তুলতে বীমা খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দেশে বীমার প্রসার বাড়াতে আপনার কোম্পানির মূল কৌশল কী?

প্রথমেই মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে। বীমা সম্পর্কে মানুষের ধারণা, পণ্য সম্পর্কে জ্ঞান, দাবি নিষ্পত্তির অভিজ্ঞতা এবং সেবার সহজলভ্যতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রাহকসেবা, পলিসিহোল্ডার ধরে রাখা এবং সেবার মান উন্নয়নে কয়েকটি বিষয়ে ওপর গুরুত্ব দিই। প্রথমত, গ্রাহকের বয়স, আয়, পারিবারিক অবস্থা ও আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী উপযোগী জীবন বীমা পণ্য পৌঁছে দেওয়া। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত জীবন বীমার পাশাপাশি গ্রুপ লাইফ ও গ্রুপ হেলথ ইন্স্যুরেন্সের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের আর্থিক সুরক্ষার আওতায় আনা। তৃতীয়ত, ব্যাংকাস্যুরেন্স ও ডিজিটাল চ্যানেলের মতো বিকল্প বিতরণব্যবস্থার কার্যকর ব্যবহার। চতুর্থত, গ্রাহকসেবা ও দাবি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করা।

গ্রাহকসেবা সহজ করতে আপনারা কী ধরনের ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করেছেন?

দ্রুত, সহজ ও নির্ভরযোগ্য সেবা দিতে আমরা সেবাপ্রক্রিয়ায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি, যাতে গ্রাহক যেন প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবা পেতে অপ্রয়োজনীয় সময় ব্যয় না করেন এবং প্রতিটি ধাপে সঠিক তথ্য পান। আমরা ইন-হাউস কল সেন্টার চালু করেছি, যার মাধ্যমে পলিসিহোল্ডাররা পলিসি সার্ভিসিং-সংক্রান্ত তথ্য, জিজ্ঞাসা ও সহায়তা পেতে পারেন। এ ছাড়া করপোরেট স্বাস্থ্য বীমার ক্ষেত্রে হাসপাতালভিত্তিক রিয়েল-টাইম ক্লেইম প্রসেসিং, ডিজিটাল যাচাইয়ের মাধ্যমে দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি এবং মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের মতো প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার ব্যবহার বীমাসেবাকে আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি করেছে।

প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে বীমাসেবা পৌঁছে দিতে কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?

বীমাসেবা শহরে মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে জাতীয় পর্যায়ে বীমার প্রকৃত প্রসার ঘটবে না। প্রত্যন্ত অঞ্চলে বীমা সম্প্রসারণের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, সহজ ভাষায় পণ্যের ব্যাখ্যা এবং গ্রাহকের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রিমিয়াম নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তথ্য প্রদান, ডিজিটাল প্রিমিয়াম পরিশোধ, দূরবর্তীভাবে গ্রাহকের পরিচয় যাচাই এবং অনলাইনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গ্রহণের ব্যবস্থা বিস্তৃত হলে ভৌগোলিক দূরত্ব অনেকটাই কমে আসবে।

ইনসারটেক বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ কতটুকু কার্যকর ভূমিকা রাখছে?

ইনসারটেক বা বীমা প্রযুক্তি এবং মোবাইল আর্থিক সেবার সমন্বয় বাংলাদেশের জীবন বীমা খাতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। প্রচলিতব্যবস্থায় পলিসি গ্রহণ, প্রিমিয়াম জমা ও দাবি নিষ্পত্তির বিভিন্ন ধাপে গ্রাহককে সময় দিতে হয়। প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের মাধ্যমে এসব ধাপ সহজ করা সম্ভব। এতে সেবার গতি ও স্বচ্ছতা বাড়ে। মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে প্রিমিয়াম পরিশোধ এবং দাবি বা সুবিধার অর্থ গ্রহণের সুযোগ বাড়লে গ্রাহকের যাতায়াত ও লেনদেনের ঝামেলা কমে।

সম্পূর্ণ ক্যাশলেস ও পেপারলেস বীমাসেবা চালু করার ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী?

ক্যাশলেস ও পেপারলেস বীমাসেবা চালু করার পথে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, গ্রাহকের ডিজিটাল দক্ষতা, তথ্যের নির্ভুলতা, সাইবার নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়  এসবই বড় চ্যালেঞ্জ। জীবন বীমার ক্ষেত্রে গ্রাহকের পরিচয় যাচাই, নমিনির তথ্য, পলিসির শর্ত, প্রিমিয়াম পরিশোধের রেকর্ড এবং দাবি-সংক্রান্ত নথি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ ও যাচাই করতে হলে নিরাপদ প্রযুক্তি, নির্ভরযোগ্য ডেটাবেজ এবং কার্যকর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা থাকতে হবে। পেপারলেস ও ক্যাশলেস ব্যবস্থায় যেতে হবে পরিকল্পিতভাবে, ধাপে ধাপে। পাশাপাশি প্রচলিত নথির নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল রেকর্ড, তথ্য সুরক্ষা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা নিশ্চিত করতে হবে।

তরুণ প্রজন্মকে বীমার আওতায় আনতে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি?

তরুণ প্রজন্মকে বীমার আওতায় আনার জন্য তাদের জীবনযাপন, আয় ও আর্থিক পরিকল্পনার ধরন বুঝতে হবে। কর্মজীবনের শুরুতে অনেক তরুণের আয় সীমিত থাকে। তাই তাদের জন্য সহজে বোঝা যায় ও সামর্থ্যরে মধ্যে রাখা যায় এমন বীমা সমাধান গুরুত্বপূর্ণ।

নারীদের জন্য আপনাদের বিশেষ কী স্কিম আছে?

নারীদের জন্য বীমা পরিকল্পনা তৈরির ক্ষেত্রে তাদের জীবনপর্যায়, স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন, আর্থিক সামর্থ্য এবং পরিবারের দায়িত্ব বিবেচনা করা প্রয়োজন। যেসব নারী নিজের আয় থেকে প্রিমিয়াম পরিশোধ করেন, তাদের জন্য সহজ প্রিমিয়াম পরিশোধ ও পলিসি ব্যবস্থাপনার সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ।

দাবি নিষ্পত্তি দ্রুত ও স্বচ্ছ করতে স্মার্ট প্রযুক্তি কীভাবে সহায়ক?

বীমা প্রতিষ্ঠানের প্রতি গ্রাহকের আস্থার বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হলো দাবি নিষ্পত্তি। পলিসি গ্রহণের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবে পূরণ করতে পারলেই বীমার প্রকৃত মূল্য প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যু বা অসুস্থতার মতো কঠিন সময়ে দ্রুত ও ন্যায্য দাবি নিষ্পত্তি গ্রাহকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দাবি-সংক্রান্ত নথি সঠিকভাবে জমা হলে এবং পলিসির শর্ত ও প্রয়োজনীয় যাচাই সম্পন্ন হলে দ্রুত নিষ্পত্তির পথ সহজ হয়। ইলেকট্রনিক নথি, ডিজিটাল তথ্য যাচাই, স্বয়ংক্রিয় কাজ বণ্টন, দাবি নিষ্পত্তির অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা সময় কমাতে সহায়ক।

গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখা বীমা খাতের বড় একটি চ্যালেঞ্জ। আপনারা কীভাবে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেন?

বীমা ব্যবসার ভিত্তি হলো আস্থা। গ্রাহককে পলিসি বিক্রির সময় যা বলা হচ্ছে, পলিসির প্রকৃত শর্তের সঙ্গে তার মিল থাকতে হবে। কোনো সুবিধা সম্পর্কে অতিরঞ্জিত প্রতিশ্রুতি দেওয়া বা গুরুত্বপূর্ণ শর্ত গোপন রাখা দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করে। আমরা গ্রাহকসেবা উন্নয়ন, দাবি নিষ্পত্তি, পলিসি-সংক্রান্ত তথ্য প্রদান এবং গ্রাহকের প্রশ্ন ও অভিযোগের সমাধানকে গুরুত্ব দিই।

আইডিআরএ থেকে দেওয়া নির্দেশনা পালনে আপনাদের অভিজ্ঞতা কেমন?

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বা আইডিআরএর নির্দেশনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্ধারিত নিয়মের মধ্যে পরিচালিত হতে, জবাবদিহি বাড়াতে  গ্রাহকের অধিকার রক্ষা করতে সহায়তা করে। নিয়ন্ত্রকের নির্দেশনা পরিপালনকে আমরা দায়িত্বশীল ও টেকসই বীমা ব্যবসার অংশ হিসেবে বিবেচনা করি।

আগামী পাঁচ বছরে প্রগতি লাইফের লক্ষ্য কী?

আমাদের ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকারের মধ্যে থাকবে ডিজিটাল সেবার পরিধি বাড়ানো, পলিসি ব্যবস্থাপনা সহজ করা, দাবি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করা এবং গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ উন্নত করা। প্রগতি লাইফের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আমরা এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চাই, যেখানে গ্রাহক সহজে সময় যথাযথ সহায়তা পাবেন ।