দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে ডিএমপি

এবারের শারদীয় দুর্গাপূজায় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। তিন বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা গতকাল শুক্রবার মন্দির পরিদর্শন শেষে পৃথক সংবাদ সম্মেলনে পূজা ঘিরে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানের কথা জানিয়েছেন।

ঢাকেশ^রী জাতীয় মন্দির পরিদর্শন শেষে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ জানান, ঢাকা মহানগরে শারদীয় দুর্গোৎসব যেন শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হতে পারে, সে লক্ষ্যে ডিএমপি প্রয়োজনীয় সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। কোনো ধরনের অনাকক্সিক্ষত পরিস্থিতি যেন সৃষ্টি না হয়, সেজন্য যেকোনো আশঙ্কাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ বছর ঢাকা মহানগরে সর্বমোট ২৫৭টি পূজাম-পে দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি ম-পের গুরুত্ব, ভক্ত ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি এবং সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ম-পগুলোকে চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়েছে। এসব ম-পে ২৪ ঘণ্টা পুলিশের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। পূজাম-প ও আশপাশের এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে সিসি ক্যামেরা এবং বডি ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি করা হচ্ছে। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথগুলোতে আর্চওয়ে স্থাপন করা হয়েছে, যেন নিরাপত্তা ও তল্লাশি কার্যক্রম কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়। ডিএমপির বিভিন্ন বিভাগের পুলিশ সদস্যদের সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে জানিয়ে কমিশনার বলেন, পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে সর্বমোট ২১০০ জন পুলিশ সদস্য ২৫৭টি পূজাম-পে ডিউটিতে নিয়োজিত থেকে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। পূজাম-পের আশপাশে নিয়মিত টহল, সন্দেহজনক ব্যক্তি এবং বস্তু সম্পর্কে সতর্ক নজরদারি এবং যেকোনো অনাকক্সিক্ষত পরিস্থিতি দ্রুত মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সোয়াট, বোম ডিসপোজাল ইউনিট, ডগ স্কোয়াড এবং ক্রাইম সিন ইউনিট সার্বক্ষণিকভাবে প্রস্তুত রয়েছে। বিজয়া দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে রাজধানীতে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শোভাযাত্রার পথ, জনসমাগম এবং সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা হবে। সংশ্লিষ্ট সভার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে শোভাযাত্রা নির্বিঘœ রাখা এবং জনসাধারণের চলাচল স্বাভাবিক রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নগরবাসীকে আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, কেউ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট কিংবা উৎসবের পরিবেশ নষ্ট করার অপচেষ্টা করলে সমন্বিতভাবে সেটাকে প্রতিহত করা হবে। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে। দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে গুজব, ভুল তথ্য এবং অপতথ্য প্রতিরোধে ডিএমপির সাইবার মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। কোনো তথ্য যাচাই না করে সামাজিক মাধ্যমে প্রচার না করতে নগরবাসীর প্রতি অনুরোধ জানান তিনি। কোনো সন্দেহজনক ঘটনা অথবা নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য চোখে পড়লে দ্রুত নিকটস্থ থানা অথবা সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোরও অনুরোধ করেন তিনি।

আসন্ন ডিসেম্বর ঘিরে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে। এ নিয়ে পূজায় কোনো নাশকতার শঙ্কা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই পূজাকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের নাশকতায় আশঙ্কা বা ভীতি সঞ্চারের আশঙ্কা আমাদের কাছে এ পর্যন্ত নেই। কিন্তু আমরা প্রস্তুত আছি, যেকোনো ধরনের নাশকতার চেষ্টা, ভীতি সঞ্চারের চেষ্টা আমরা খুব শক্তভাবে দমন করব। ঢাকা মহানগরে ৯টি বৃহৎ ম-প রয়েছে। সেই ৯টি বৃহৎ ম-পে পুলিশ এবং আনসার সদস্য মিলে ৫০ জন করে সদস্য দায়িত্ব পালন করছে। অন্য ম-পগুলোতে শ্রেণিবিভাগ ভেদে সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছে। প্রত্যেকটি ম-পে যে সিসি ক্যামেরা আছে, সেই সিসি ক্যামেরা ডিএমপির কন্ট্রোলরুমে সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টা কন্ট্রোলরুমে বসে এই ২৫৭টি পূজাম-পের যে পরিস্থিতি সেটি পর্যবেক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি সব পূজাম-পে যেসব পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের বডিওর্ন ক্যামেরা দেওয়া আছে, সেই ক্যামেরার মাধ্যমেও কন্ট্রোলরুম থেকে লাইভ মনিটরিং করা হবে।

৩ জেলায় বিজিবি মোতায়েন : রাজধানীর পিলখানায় বিজিবি সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে বাহিনীর পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহবুব মুর্শেদ রহমান জানিয়েছেন, পূজার নিরাপত্তা নিশ্চিতে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর পাশাপাশি গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও ফরিদপুরে বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হবে। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও পূজা উদযাপন কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। সারা দেশে ২ হাজার ৭২৭টি পূজাম-পের নিরাপত্তায় বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে সীমান্তের আট কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪২৫টি পূজাম-প। ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরের তিন কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে ১ হাজার ১১৯টি এবং দুর্গম ও দূরবর্তী এলাকায় রয়েছে ১৮৩টি পূজাম-প। পূজাম-পগুলো ইতিমধ্যে সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়েছে। যাতায়াতের পথ, স্থানীয় পরিবেশ ও যোগাযোগব্যবস্থা বিবেচনায় নিয়ে নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। দুর্গম ও দূরবর্তী এলাকার পূজাম-পগুলোতে নিরাপত্তা সহায়তা সহজ করতে প্রায় ২১টি বেজ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। নিরাপত্তা কার্যক্রম সমন্বয়ে ‘শারদীয় সুরক্ষা’ অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, বিজিবি সদর দপ্তর ও মাঠপর্যায়ে একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। এতে তথ্য আদান-প্রদান, পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হবে। গুজব, অপতথ্য ও সাম্প্রদায়িক উসকানি প্রতিরোধে বিশেষ নজরদারি থাকবে। কোনো সংবেদনশীল তথ্য প্রচারের আগে এর সত্যতা যাচাই করতে সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

মাঠে সাড়ে ৩ হাজার কোস্ট গার্ড সদস্য : পূজার নিরাপত্তা নিশ্চিতে দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার সদস্য মোতায়েনের কথা জানিয়েছেন কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. মঈনুল হাসান। এ ছাড়া উপকূলীয় ও নদীতীরবর্তী চারটি জোনের আওতাধীন ৬১৫টি মন্দির ও পূজাম-পের নিরাপত্তায় কাজ করছে। গতকাল মিরপুর কেন্দ্রীয় মন্দিরে দুর্গাপূজার নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান তিনি।

কোস্ট গার্ড মহাপরিচালক বলেন, উপকূলীয় এলাকার মধ্যে পূর্ব জোনের ৬৩টি, পশ্চিম জোনের ১৪৪টি, দক্ষিণ জোনের ৩৭১টি এবং ঢাকা জোনের ৩৭টি মন্দির ও পূজাম-পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে ৬১৫টি মন্দির ও পূজাম-পের নিরাপত্তায় কাজ করছে কোস্ট গার্ড। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা যেন শান্তিপূর্ণ, প্রাণবন্ত ও নিরাপদ পরিবেশে দুর্গাপূজা উদ্যাপন করতে পারেন, সে লক্ষ্যে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করছে কোস্ট গার্ড। পূজা চলাকালে নৌ-দুর্ঘটনা এড়াতে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম ও সার্বক্ষণিক টহল অব্যাহত রয়েছে। প্রতিমা বিসর্জনের স্থানগুলোতে সম্ভাব্য দুর্ঘটনা মোকাবিলায় কোস্ট গার্ডের বিশেষ ডুবুরি দল প্রস্তুত থাকবে। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে সহায়তা পেতে কোস্ট গার্ডের জরুরি সেবা নম্বর ১৬১১১-এ যোগাযোগের আহ্বান জানান মহাপরিচালক।