ভোট তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে চলা বিক্ষোভ নতুন মোড় নিয়েছে। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ও বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলির পূর্বঘোষিত 'লেহরা দো তিরাঙ্গা' বা ভারতের জাতীয় পতাকা 'তেরঙা যাত্রা' কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাজধানীতে তীব্র উত্তেজনা ছড়ায়। প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দিল্লি পুলিশ সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপক এবং আইসার ছাত্র নেত্রী নেহা বোরাকে আটক করেছিল। শনিবার (১৭ অক্টোবর) ভোরে নেহা বোরা মুক্তি পেলেও অভিজিৎ দীপককে এসইএম কোর্টে পেশ করার কথা জানিয়েছে দিল্লি পুলিশ। খবর দ্য হিন্দু'র।
শুক্রবার পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী শত শত বিক্ষোভকারী, ছাত্র ও কর্মীরা জাতীয় পতাকা হাতে কনাট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কের কাছে জড়ো হতে শুরু করেন। নির্ধারিত সময়সূচির দুই ঘণ্টা আগেই বিকেল ৩টা থেকে সেখানে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে।
তবে বড় ধরনের জমায়েত বা বিশৃঙ্খলা এড়াতে পুলিশ কনাট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্ক চত্বর ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলে এবং তা সাধারণের নাগালের বাইরে রাখা হয়।
এর আগে, মিছিলের উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় দিল্লি পুলিশ সিজেপি নেতা অভিজিৎ দীপক এবং আইসা প্রধান নেহা বোরাকে আটক করে।
দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, দিল্লি পুলিশ অ্যাক্টের ১৯৬৫ ধারার অধীনে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর নেহা বোরাকে মুক্তি দেওয়া হয়। অন্যদিকে, বিএনএসএস-এর ১২৬/১৭০ ধারার অধীনে অভিজিৎ দীপকের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং তাকে এসইএম কোর্টে হাজির করা হবে।
এই আটক ও দমনপীড়নের তীব্র সমালোচনা করেছেন বিরোধী নেতারা। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন এবং আপ প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের আটকের তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে তার মুক্তির দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য বিক্ষোভ- প্রতিবাদের ওপর এই নিষেধাজ্ঞাকে 'ভারতের দ্বিতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
বিতর্ক কেবল দেশের সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। দিল্লির ছাত্র বিক্ষোভে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও আটকের ঘটনার বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক আইনপ্রণেতাদের একটি দল—যাদের মধ্যে প্রমিলা জয়পাল ও ইলহান ওমরও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন—মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে চিঠি দিয়েছেন।
আগামী সপ্তাহে ভারত সফরে এসে ভারতীয় সমকক্ষদের সঙ্গে বৈঠকে এই বিষয়টি উত্থাপন করার জন্য তারা রুবিওকে অনুরোধ জানিয়েছেন। চিঠিতে বলা হয়েছে, ভারতে ছাত্র বিক্ষোভের সময় নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক দমনপীড়ন এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।
দিল্লির পাশাপাশি অন্যান্য অঞ্চলেও এর প্রভাব পড়েছে। মুম্বাইয়ের আজাদ ময়দানেও ‘লেহরা দো তিরাঙ্গা’ ব্যানারে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, এসআইআর বাতিল এবং দিল্লিতে আটক আন্দোলনকারীদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। কেরলের তিরুয়ানন্তপুরমের মানবীম ভিথী চত্বরে আয়োজিত সমাবেশে অভিনেতা ও সমাজকর্মী প্রকাশ রাজ বলেছেন, দেশের যুবসমাজের ক্ষোভ, বেদনা ও দায়িত্ববোধ এই শাসনব্যবস্থাকে বদলে দেবে। তিনি যুবসমাজকে হাসিমুখে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা নির্বাচন কমিশন ও কর্ণাটক সিইও কার্যালয় জানিয়েছে যে, বিশেষ নিবিড় সংশোধন -এর অধীনে জারি করা নোটিশের ওপর কর্ণাটকে ৯৯%-এর বেশি শুনানি ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে মাত্র ১৯,৩৬৫টি শুনানি বাকি রয়েছে। সবচেয়ে বেশি শুনানি বাকি রয়েছে কালবুরাগীতে।
তবে এই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব এখানেই থামছে না। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন ও সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আগামী ২৩ অক্টোবর দিল্লি অভিমুখে লংমার্চ বা বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার ব্যানারে বিভিন্ন কৃষক সংগঠন।
এসকেএম নেতা ও অল ইন্ডিয়া কিষাণ সভার সভাপতি অশোক ধাওয়ালে জানিয়েছেন, ওই দিন দেশের সমস্ত জেলা, তালুক ও ব্লক সদর দফতরে একযোগে কৃষকরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করবেন। সব মিলিয়ে, নির্বাচন কমিশনের নীতি ও সরকারের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ছাত্র, কৃষক ও রাজনৈতিক দলগুলির আন্দোলন আগামী দিনে আরও তীব্র রূপ নেওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।