কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানীতে সমুদ্রসৈকত সংলগ্ন মেরিন ড্রাইভের পাটোয়ারটেক এলাকায় 'টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্ট'-এ অগ্নিকাণ্ডে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১০ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে একই পরিবারের আটজন সদস্য রয়েছেন। এই দুর্ঘটনায় আরও অন্তত সাতজন গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সম্পূর্ণ কাঠে নির্মিত রিসোর্টটি আগুনে পুড়ে সম্পূর্ণ ছাই হয়ে গেছে। এই ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কন্ট্রোল রুম অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে। তবে আহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা তারা তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেনি। দুর্ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ এবং সিআইডির সদস্যরা নিবিড়ভাবে উদ্ধারকাজ ও আলামত সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
নিহত ১০ জনের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করা গেছে। তারা হলেন—ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭) এবং চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) ও ফায়িজান আহম্মেদ (৫)। বাকি চারজনের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে, অগ্নিকাণ্ডে আহত ছয়জনের মধ্যে রয়েছেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) এবং সামিদা (৩২)।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল ৭টার দিকে মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাটোয়ারটেক সৈকত এলাকার এই রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সকালে রিসোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে হঠাৎ একটি বিকট শব্দ শোনা যায়। শব্দের পরপরই মুহূর্তের মধ্যে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে শুরু করে এবং অতি দ্রুত তা পুরো রিসোর্টে ছড়িয়ে পড়ে। সম্পূর্ণ কাঠ দিয়ে তৈরি নয় কক্ষবিশিষ্ট এই স্থাপনাটিতে আগুন ভয়াবহ রূপ নেওয়ায় ভেতরে থাকা পর্যটকদের দ্রুত বেরিয়ে আসার পথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ হয়ে যায়।
দুর্ঘটনার সময় রিসোর্টটিতে পর্যটক ও কর্মী মিলিয়ে প্রায় ৩০ জনের মতো লোক অবস্থান করছিলেন। আকস্মিক অগ্নিকাণ্ড ও ধোঁয়ায় পুরো এলাকা আচ্ছন্ন হয়ে পড়লে চার থেকে পাঁচজন অতিথি তড়িঘড়ি করে বাইরে বের হতে সক্ষম হলেও অনেকেই আগুনের লেলিহান শিখায় ভেতরে বন্দি হয়ে পড়েন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের তিনটি ইউনিট দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছে সকাল ৮টা থেকে আগুন নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্ধার অভিযান শুরু করে। দীর্ঘ দুই ঘণ্টার প্রাণপণ চেষ্টার পর সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে এবং বেলা ১১টার দিকে তা সম্পূর্ণরূপে নির্বাপণ করা সম্ভব হয় বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া কর্মকর্তা তালহা বিন জসীম।
দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান। তিনি জানান, ফায়ার সার্ভিসের নেতৃত্বে পরিচালিত যৌথ উদ্ধারকারী দল প্রথমে ছয়টি মরদেহ উদ্ধার করে এবং আহতদের দ্রুত কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে পাঠায়। পরবর্তীতে উদ্ধারকাজ আরও এগিয়ে নিলে এবং ধ্বংসস্তূপ তল্লাশি করার পর মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১০ জনে দাঁড়ায়। সিআইডি কক্সবাজারের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, রিসোর্টের বিভিন্ন কক্ষে পর্যটকদের আটকা পড়ার খবর থাকায় শুরু থেকেই প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ার শঙ্কা ছিল।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আতিকুল ইসলাম মজুমদার জানান, আগুনের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে অবস্থান নেয়। রিসোর্টটি কাঠে তৈরি হওয়ায় আগুন নেভানো এবং ভেতরের দগ্ধ অংশ থেকে মরদেহ উদ্ধারে উদ্ধারকর্মীদের তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। তিনি আরও বলেন, ‘দুর্ঘটনাটির পর থেকে পলাতক থাকা রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের সন্ধান চালানো হচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।’
এদিকে, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ এক প্রেস ব্রিফিংয়ে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করে জানান যে, দুর্ঘটনা কবলিত 'টুপটুপ রিসোর্টটি' সম্পূর্ণ অনুমোদনহীনভাবে পরিচালিত হচ্ছিল এবং এর কোনো ফায়ার লাইসেন্সও ছিল না। গত জুনে পরিদর্শনের পর রিসোর্টটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে সতর্কবার্তা বা নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সতর্কতাকে উপেক্ষা করে কর্তৃপক্ষ অবৈধভাবে রিসোর্টটির কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল।
অগ্নিকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করতে জেলা প্রশাসন গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। ইনানী ও মেরিন ড্রাইভ এলাকার অন্যান্য রিসোর্টের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অগ্নিনির্বাপণ সক্ষমতা নিয়ে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা নতুন করে গভীর প্রশ্ন ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।