হোমো সেপিয়েন্স
ক্রো-ম্যাগনন মানুষেরা তাদের হাতিয়ারের হাতলে গুটি গুটি আঁচড় কেটে খোদাই করে রাখত চাঁদের নানা দশা। কাজ করার সময় সেসব মাথায় থাকত তাদের।
প্রাণী—দিগন্ত—পাত্রের জলে ভেসে ওঠা মুখচ্ছবি।
প্রতিটি গল্পই এমন একটি বিন্দুতে এসে ঠেকে, যখন সামনে আর কিছুই দেখতে পাই না। আমি এই সীমাপ্রাচীরের প্রতি বিতৃষ্ণ। এর কারণেই গল্পকারদের অন্ধ বলা হয়—কী এক উপহাস!
ক্রোমো-লুমিনারিজম
সূর্যরেণু ইউরোপীয়দের মাঝে উদাস ধীরতা আনে। সেই মানুষদের দিকে তাকাও, যারা সম্মোহিত হয়ে আছে স্যরার চিত্ররূপে। মোঁসিয়ের দিকে তাকাও—গভীর নিমগ্নতা নিয়ে বসে আছে। যখন কোনো ইউরোপীয় অতল ভাবনায় তলিয়ে যায়, তখন সে কোথায় যায়? স্যরা—বিস্ময়মানব—সেই জায়গাটিকে ফুটিয়ে তুলেছেন। সেটা দূরে, উদাস নৌবিহারের দূরত্বে, আমাদের অভিনিবেশের বাইরে। সেখানের বিকেলটা যেন শনিবারের নয়, উদাস রবিবারের। স্যরা এক অনন্য পদ্ধতিতে বিষয়টি ফুটিয়ে তুলেছেন। আমরা যখন জিজ্ঞেস করলাম, বিরক্ত হয়ে বললেন—‘আমার নিজস্ব পদ্ধতি’।
হিম সবুজ ছায়ার ভেতর দিয়ে যখন আমরা পরকীয়ায় লিপ্ত মানুষের মতো ছুটছিলাম, তিনি আমাদের ধরে ফেললেন। তরঙ্গিণীর পাথরের ঠোঁট এই বোজে, এই খোলে। স্যরাকে তার ঠোঁটের ফাঁকে টেনে নেয়।
ভোগবাদ
অতিরূপে আমার আশা ঝরে—কেন ঝরে, ভাবি না, কেবল এখান থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাই। প্যারিসের দিকে চোখ গেলে ইচ্ছে হয়—ওকে দুই পায়ে চেপে ধরি।
যখনই তুমি নাচের ঢেউ তোলো, চোখে ভেসে ওঠে—মড়ার মতো শান্ত সমুদ্রের বুকে থাকা নাবিকের মতো অনুভূতিহীন নিঃসহায় দিগন্ত। সারা রাত ধরে আমার ভেতর ফুটতে থাকে পীচ ফলের মতো গোল গোল সব কামনা, আর যেসব ফল ঝরে পড়ে, আমি তার কিছুই কুড়াই না।
ভ্যান গঘ
‘আমি শরাবে মজি এই হলুদ আকাশ, এই ছড়িয়ে থাকা বিপুল হলুদ আকাশের বুঝতে চাই বলে’, বললেন ভ্যান গঘ। তিনি যখন পৃথিবীর দিকে তাকাতেন, কতগুলো আলপিন দেখতে পেতেন, এই পিনগুলোই নানা বস্তুর সঙ্গে নানা রঙ আটকে রেখেছে। আরও লক্ষ করেন, পিনগুলোই মূলত যন্ত্রণাবিদ্ধ।
ল্য বন্যর দেত্র বিয়াঁ এমে (নির্মল পিরিতির পুলক)
দিনের পর দিন আমি ঘুম থেকে ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই তোমার কথা ভাবি। আর ফিল করি, কে যেন বাতাসের গায়ে সাজিয়ে রেখেছে মণিমুক্তার মতো পাখিদের ডাক।
ওভিড
এমনই এক রাতে তারে দেখতে পাই—হিমশীতল চারপাশ, রাস্তার বুক চিরে যেন বয়ে গেছে চাঁদের ফোয়ারা। তিনি ডিনার সেরে শোবার ঘরে যান। মেঝেতে রাখা রেডিওর উজ্জ্বল সবুজ ডায়ালটি মৃদুস্বরে বাজছে। তিনি একটি টেবিলের পাশে বসেন। নির্বাসিত মানুষেরা কত রকমের চিঠি লেখে। ওভিড এখন কাঁদছেন। প্রতি রাতে ঠিক এ সময়েই তিনি পোশাকের মতো মর্মপীড়াকে গায়ে জড়িয়ে নেন এবং লেখা চালিয়ে যান। অবসরে তিনি আঞ্চলিক ভাষা (গেটিক) শেখেন, যাতে এই ভাষায় একটা মহাকাব্য লিখতে পারেন, যা কোনো দিন কেউ পড়তে পারবে না।
গেইশা
গেইশা ও সেক্স—এ নিয়ে বরাবরই একটু জটিলতা আছে। কেউ এতে জড়ায়, কেউ জড়ায় না। তুমি তো জানো, প্রথম দিকের গেইশারা ছিল পুরুষ, তারা মূলত ভাঁড় ও ড্রামবাদক। তারা দ্রুতগতিতে জটিল ও চটুল কথা বলে অতিথিদের হাসাত। কিন্তু ১৭৮০-এর দিকে নারীরা গেইশা হতে শুরু করে, আর চা-বাড়ির আকর্ষণীয় ব্যবসাগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। কিছু গেইশা ছিল খাঁটি শিল্পী, তাদের ‘সাদা’ বলে ডাকা হতো। অন্যদের ডাকা হতো ‘বিড়াল’ বা ‘কবুতর’ বলে। তারা প্রশস্ত নদীর বালুচরের ঝুপড়িঘরে প্রতি রাত কাটাত, আর ভোর হলেই উধাও হয়ে যেত। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, তীব্র ব্যাকুলতায় কারও জন্য অপেক্ষায় থাকা। গায়ের কম্বলটি দীর্ঘ হোক কিংবা রাতটি, অথবা রাত কাটানোর জন্য ঘরটি দেওয়া হোক, কিংবা ঘরটি ঘুমানোর জন্য হোক, বড় কথা হলো কারও জন্য দীর্ঘ অধীর অপেক্ষায় থাকা, যতক্ষণ না সে হেঁটে আসছে আর ঘাসগুলো ধুলে উঠছে, আর তার হাতের তালুতে শোভা পাচ্ছে টেমেটো।
কোথায় ভ্রমণ করতে হয়
আমি ভ্রমণে যাই, জায়গাটা ধ্বংসস্তূপে ঠাসা। আধখোলা তিনটি দরজা, আর বাইরের দিকে ভাঙা একটা বেড়া। এটি নির্দিষ্ট কোনো ধ্বংসাবশেষ ছিল না। কোনো একটা জায়গা এখানে এসে নিজের ওপর যেন আছড়ে পড়েছিল। এরপর থেকে এটি একটি ধ্বংসস্তূপ, আর এর ওপর এসে পড়েছিল আলোর ঝরনা।
ব্রিজিত বার্দো
ব্রিজিত বার্দো শিকার খোঁজেন, ওত পেতে থাকেন। তিনি কী চান, দাস? নিজের ক্ষুধা মেটাতে আর নান্দনিক সব ছবি তুলতে? কার দাস, কে দাস—তাতে তার কিছু আসে-যায় না। তার জন্য নিজেকে দোষও দেন না। তেল মেখে দাসটিকে করে তুলবেন চকচকে—নিখুঁত, আর মনে মনে ভাববেন, লা ফোলি (পাগলামি)।
সংশোধন
কাফকা তার ঘড়িতে দেড় ঘণ্টা এগিয়ে রাখতে পছন্দ করতেন। ফেলিস এটা বারবার ঠিক করে দিতেন। তা সত্ত্বেও পাঁচ বছর ধরে প্রায় বিয়ে করেই ফেলছিলেন। কাফকা বিয়ের পক্ষে ও বিপক্ষের যুক্তিগুলোর একটা তালিকা করেন, যার মধ্যে রয়েছে নিজের জীবনের আঘাত সহ্য করার অক্ষমতা (পক্ষে) এবং সাড়ে দশটায় তার মা-বাবার বিছানায় পেতে রাখা রাতপোশাকের দৃশ্য (বিপক্ষে)।
রক্তক্ষরণ তাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। স্যানাটোরিয়ামে ডাক্তাররা যখন তাকে কথা বলতে বারণ করেছিলেন, তিনি সারা মেঝে কাচের তৈরি বাক্য ছড়িয়ে রেখেছিলেন। সেসব বাক্যের মধ্যে একটি এমন, ‘ফেলিসের মাঝে বড্ড বেশি নগ্নতা থিতিয়ে ছিল।’
পেছনের দিকে হাঁটা
আমার মা পেছনের দিকে হাঁটতে বারণ করতেন। তিনি বলতেন, মৃতেরা এভাবেই হাঁটে। এই বদ্ধমূল ধারণা তিনি কোথায় পেলেন? সম্ভবত লোকবিশ্বাস থেকে। যা-ই হোক না কেন, মৃতেরা পেছনের দিকে নয়, বরং আমাদের পেছনে পেছনে হাঁটেন। তাদের কোনো ফুসফুস নেই, তারা ডাক দিয়ে আমাদের থামাতেও পারে না, কিন্তু তারা চায় আমরা একবার পেছনে ফিরে তাকাই। তারা ভালোবাসার শিকার, তাদের অনেকেই তা-ই।
মোনালিসা
প্রতিদিন তিনি নিজের জিজ্ঞাসা তার ভেতর ঢেলে দিতেন, যেভাবে লোকেরা এক পাত্র থেকে অন্য পাত্রে জল ঢালে, জিজ্ঞাসাটিও সেভাবেই ফেরত আসে। আমাকে বোঝাতে এসো না যে তিনি তার মাকে আঁকছিলেন বা যৌনতা বা অন্য কিছু। এমনও মুহূর্ত আসে যখন জল না প্রথম পাত্রে থাকে, না দ্বিতীয় পাত্রে। আর তিনি ভেবেছিলেন, ক্যানভাসটি যখন পুরোপুরি শূন্য হয়ে যাবে, তিনি থেমে যাবেন। আর তিনি পাত্র চিনতেন, জল চিনতেন, বুঝতেন মানুষের নশ্বর তৃষ্ণাকেও।