যুবদল নেতা হত্যা: প্রধান অভিযুক্ত দুই ভাই গ্রেপ্তার

কুমিল্লায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি নিয়ে বিরোধের জেরে মো. আবু কাউসার (৩৮) নামের এক যুবদল নেতাকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত তৌহিদ ও তার বড় ভাই তানজিরকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাতে কুমিল্লা নগরীর নূরপুর এলাকা থেকে তৌহিদকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে তাঁর ভাই তানজিরকে এসআরবি-১১ গ্রেপ্তার করে।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান ও এসআরবি-১১-এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর সাদমান ইবনে আলম।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত আবু কাউসার কুমিল্লা নগরের কাপ্তান বাজার এলাকার বাসিন্দা। তিনি মহানগর যুবদলের সাবেক সদস্য ছিলেন এবং বর্তমানে নগরের ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তার বড় ভাই কবির হোসেন কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা যুবদলের সহসভাপতি।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, বিরোধপূর্ণ জমিটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তৌহিদ জানিয়েছেন, ওই জমিতে রিসোর্ট নির্মাণের উদ্যোগ নিলে কাউসার ও তার বন্ধু শামীম বাধা দেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।

জমির বিরোধ মীমাংসার কথা বলে শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার ছত্রখিল এলাকায় গোমতী নদীর উত্তর পাড়ে একটি বৈঠকের আয়োজন করা হয়। শামীমের সঙ্গে সেখানে যান কাউসার।

অভিযোগ রয়েছে, বৈঠকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে তৌহিদ, তার ভাই ও সহযোগীরা হামলা চালান। এ সময় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কাউসারকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। হামলায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক মাসুমও আহত হন। পরে কাউসারকে উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

পুলিশ সুপার আরও জানান, গ্রেপ্তার তৌহিদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১১টি মামলা রয়েছে। তিনি একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী বলে উল্লেখ করেন পুলিশ সুপার। তার কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই বলেও জানান তিনি। অন্যদিকে, তানজিরের বিরুদ্ধে একটি মামলা রয়েছে।

এদিকে, হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শুক্রবার বিকেলে নন্দিরবাজার এলাকায় তৌহিদুলের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, অর্ধশতাধিক মোটরসাইকেলে শতাধিক লোক সেখানে জড়ো হন। একপর্যায়ে তারা বাড়ির বিভিন্ন কক্ষে ভাঙচুর চালান এবং আগুন দেন। এতে ঘরের আসবাবসহ বিভিন্ন মালামাল পুড়ে যায়। জানালার কাচও ভাঙচুর করা হয়। একই সময়ে বাড়ির সামনের একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও হামলা চালানো হয়।

খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার জানান, বিক্ষুব্ধ লোকজন বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করেন। পুলিশ দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

অন্যদিকে, খলিলুর রহমান নামের স্থানীয় এক ব্যক্তি দাবি করেন, হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেওয়া তৌহিদুল আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় তিনি আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন বলেও দাবি করেন খলিলুর রহমান। তাঁর ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তৌহিদুলের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয় এবং ওই মামলায় ঢাকায় গ্রেপ্তারের পর তিনি ছয় মাস কারাগারে ছিলেন।

কুমিল্লা মহানগর যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক খলিলুর রহমান (বিপ্লব) জানান, আবু কাউসার আগে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা যুবদলের সদস্য ছিলেন। বর্তমানে তিনি নগরের ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের নেতা হিসেবে পরিচিত হলেও তার কোনো পদ-পদবি ছিল না।

নিহতের পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, কাউসারের বন্ধু শামীম হোসেনের সঙ্গে নন্দিরবাজার এলাকার তৌহিদুল ও তানজিলের ছত্রখিল এলাকার একটি জমি নিয়ে বিরোধ চলছিল। শামীমের দাবি, তিনি জমিটি কিনেছিলেন। তবে জমির দখল নিতে বাধার মুখে পড়ছিলেন তারা। এ বিরোধের জেরে শুক্রবার কয়েকজনকে নিয়ে জমিটি দেখতে গেলে তৌহিদুলের নেতৃত্বে তাঁদের ওপর হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ করেন শামীম।

এদিকে, গোমতী নদীর পাড়ের ছত্রখিল এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি লিজ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ রাশেদ শাহারিয়ার বলেন, তিনি ঘটনাটি মাত্র শুনেছেন। কোন জমি নিয়ে বিরোধ, তা তাঁর স্মরণে নেই। তবে সম্প্রতি পানি উন্নয়ন বোর্ড কাউকে কোনো জমি লিজ দেয়নি।