‘আমাদের হাত বাঁধলে আপনারই ক্ষতি হবে’: মতিউর রহমান চৌধুরী

সরকারের সমালোচনা বন্ধ করতে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ ভবিষ্যতে ক্ষমতাসীনদের জন্যই বিপদের কারণ হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি ও দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী।

তিনি বলেছেন, 'দয়া করে আমাদের হাতটা আবার বাঁধবেন না। হাত বেঁধে দিলে আপনার ক্ষতি হবে। আপনার জন্য কিন্তু আমি আর লিখতে পারব না। আপনাকে একদিন আমাদের কাছে আবার আসতে হবে।'

রবিবার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কার্যালয়ে প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন নিয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। টিআইবি, ব্র্যাক, ব্লাস্ট, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদসহ ১৯টি সংগঠন যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে। 

মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, পৃথিবীতে কোনো ক্ষমতাই চিরস্থায়ী নয়। তাই আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বর্তমান পরিস্থিতির পাশাপাশি ভবিষ্যতের কথাও বিবেচনায় রাখতে হবে। ক্ষমতায় থাকাকালে সমালোচনার পথ বন্ধ করার চেষ্টা করা হলেও ক্ষমতা হারানোর পর একই ধরনের আইনের কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই অন্যায়ের শিকার হতে পারেন।


সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আইনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে মানবজমিন সম্পাদক বলেন, সরকারের সমালোচনা এবং সাইবার অপরাধকে আলাদাভাবে দেখতে হবে। গণতান্ত্রিক সমাজে সরকারের সমালোচনা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। এ দুটিকে এক করে দেখলে বিপদের আশঙ্কা থেকে যায়।

প্রস্তাবিত আইনে কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায়ে সংবাদপত্র কিংবা অনলাইন সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ রাখা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের বিধান সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক।

আইনের প্রয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা তুলে ধরে তিনি বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতাসীন দলের কোনো নেতার ফোনের কারণেও কাউকে গ্রেপ্তারের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ফলে আইনের অপব্যবহার ঠেকাতে কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।

প্রস্তাবিত আইনে 'ভুল তথ্য' বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা নিয়েও স্পষ্টতা চেয়েছেন নোয়াব সভাপতি। তিনি বলেন, কোনো সংবাদ কারও পছন্দ না হলেই সেটিকে ভুল তথ্য কিংবা কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত সংবাদ হিসেবে দাবি করা হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের মানদণ্ড কী হবে এবং সেই সিদ্ধান্ত কে নেবেন—এসব প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

সাংবাদিকদের বিচারের ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্টকে ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাবেরও বিরোধিতা করেন মতিউর রহমান চৌধুরী।

তিনি বলেন, 'ভেজাল ওষুধ যাঁরা তৈরি করেন, তাঁদের ধরার জন্য যে ভ্রাম্যমাণ আদালতকে ব্যবহার করা হয়—সেই আদালতের কাছে আপনি সাংবাদিকের বিচারের ক্ষমতা দিচ্ছেন! এইটা কী করে একটা গণতান্ত্রিক সমাজে চিন্তা করা যেতে পারে?'

প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় আলোচনা আয়োজন এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মতামত নেওয়ার আহ্বান জানান মতিউর রহমান চৌধুরী। আইন প্রণয়নের জন্য গঠিত কমিটিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। এতে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম, ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম, অনলাইন এডিটর্স ফোরামের আহ্বায়ক শরিফুজ্জামান পিন্টু এবং টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশ প্রধান ফৌজিয়া আফরোজসহ অন্যরা।