রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় দেশের সকল সম্প্রদায়ের মানুষকে একতাবদ্ধ হয়ে সচেতনভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সংবিধান প্রত্যেক ধর্মের মানুষকে যে অধিকার দিয়েছে, তা রক্ষা করতে হবে। কোনো নাগরিকের অধিকার লঙ্ঘিত হলে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।
রবিবার (১৮ অক্টোবর) দুপুরে শারদীয় দুর্গাপূজা ২০২৬ উপলক্ষে রাজধানীর রামকৃষ্ণ মিশন পরিদর্শন শেষে এক মতবিনিময় সভায় রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, 'আমরা চাই এই দেশের সংবিধান প্রত্যেকটি ধর্মের মানুষকে যে অধিকার দিয়েছে, সেই অধিকার রক্ষা হোক। এদেশের নাগরিকগণ যে ধর্মেরই হোক না কেন, তারা তাদের অধিকার রক্ষার জন্য অত্যন্ত সচেতনভাবে কাজ করবেন। এবং কোথাও কোনো ব্যত্যয় ঘটলে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন।'
তিনি বলেন, 'বাংলাদেশের প্রতিটি ধর্মের মানুষের মধ্যে যে বন্ধুত্ব, ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে উঠেছে, তা এক দিনে কিংবা দুই দিনে সৃষ্টি হয়নি; বরং হাজার বছরের ঐতিহ্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে এই বন্ধন সুদৃঢ় হয়েছে। হাজার বছরের ইতিহাসে গড়ে ওঠা এই আত্মার বন্ধন, ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্য আমরা যেকোনো মূল্যে অটুট রাখব।'
তিনি বলেন, আমরা সেই বাংলাদেশ দেখতে চাই যেখানে আমরা শান্তিতে থাকব, সুখে থাকব। যে বাংলাদেশে আমাদের ধর্মে ধর্মে কোনো বিভেদ থাকবে না। সকলে তাদের ধর্ম নিশ্চিন্তে পালন করবে।
তিনি উল্লেখ করেন, 'দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদেরই কিছু মানুষ বিভিন্ন সময়ে কখনো রাজনৈতিক স্বার্থে, কখনো ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে, আবার কখনো অসৎ অভিপ্রায়ে আমাদের দীর্ঘদিনের সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে ফাটল ধরিয়ে বিভাজন সৃষ্টির অপচেষ্টা চালিয়েছে। এ ধরনের বিভেদ ও বিভাজন কোনোভাবেই কাম্য নয়; বরং তা আমাদের ঐতিহ্য, পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির পরিপন্থী।'
দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সবার সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, 'আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দীর্ঘ ও কঠিন সংগ্রাম করেছি। আমাদের সেই লড়াই-সংগ্রামের মূল লক্ষ্য ছিল এমন একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে প্রতিটি মানুষের অধিকার নিশ্চিত হবে এবং জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। সেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনরায় ফিরিয়ে আনতে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। এ লক্ষ্য অর্জনে সবার আন্তরিক সহযোগিতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।'
তিনি বলেন, 'বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এখন তরুণদের হাতে। তাদেরকে এমন একটা সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে যেন সেখানে কূপমণ্ডূকতা না আসে, কুসংস্কার না আসে, ধর্মের নামে ধর্মান্ধবিজনতা না আসে এবং কোন ধরনের উগ্রতার সৃষ্টি না হয়।'
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সকল সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, 'এই দেশটা আমাদের সকলের। এখানে আমরা কখনোই এমন কোনো শক্তিকে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে দেব না, যে শক্তি আমাদের সত্যকে ধ্বংস করবে, আমাদের আত্মাকে ধ্বংস করবে, আমাদের চেতনাকে ধ্বংস করবে, আমাদের কৃষ্টিকে ধ্বংস করবে।'
যে কোন পরিস্থিতিতে সকলকে একতাবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, 'তখনই রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে যায়, যখন রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি হয়।'
এ সময় দুর্গাপূজা নিয়ে নিজের অতীত স্মৃতি স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, 'আমার ছাত্রজীবনে আমি দুর্গাপূজা মণ্ডপে গিয়েছি, নাটক করেছি, আবৃত্তি করেছি।'
তিনি বলেন, 'এবারকার পূজায় এখন পর্যন্ত আমি যেটা দেখছি যে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে সারাদেশে এই পূজা উদযাপিত হচ্ছে এবং এটাই আমরা চাই।'
সবাইকে শারদীয় দূর্গা পূজার শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, দুর্গাপূজার উদযাপন নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের দায়িত্ব পালন করছে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, রামকৃষ্ণ মিশনের অধ্যক্ষ স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, সভার সভাপতি ও রামকৃষ্ণ মিশন পরিচালনা পর্ষদের সহ সভাপতি সুবল চন্দ্র সাহা বক্তব্য রাখেন।