দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার ২০৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নতুন বেতন নির্ধারণ বা পে ফিক্সেশনের নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের কাজ ও ডাটা এন্ট্রির খরচের কথা বলে শিক্ষকপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা করে আদায়ের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক শিক্ষক।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেন, উপজেলার সাতটি ক্লাস্টারের দায়িত্বে থাকা সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা ফোন করে অর্থ দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন। বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষকদের উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ডেকে এনে তাদের মাধ্যমে টাকা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সংগৃহীত অর্থ নির্দিষ্ট কয়েকজন শিক্ষক নেতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি তাদের।
শিক্ষকদের ভাষ্য, নতুন বেতন নির্ধারণ বা পে ফিক্সেশনের জন্য অর্থ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। অনেক শিক্ষক নিজেরাই এ কাজ সম্পন্ন করেছেন। এরপরও হিসাবরক্ষণ অফিস ও ডাটা এন্ট্রির খরচের কথা বলে অর্থ দাবি করায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, পার্বতীপুরে মোট ২০৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ১৪১টিতে প্রধান শিক্ষক কর্মরত আছেন। বাকি ৬৫টি বিদ্যালয় চলছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকা রয়েছেন ১ হাজার ২১ জন। তাদের মধ্যে সদ্য যোগদান করেছেন ৩০ জন।
বিদ্যালয়গুলোতে প্রযুক্তিগত সরঞ্জামেরও ব্যবস্থা রয়েছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, এসব বিদ্যালয়ে ২২৫টি ল্যাপটপ, ২০৬টি মডেম সিম, ২০৬টি প্রজেক্টর এবং ১৫০টি রাউটার ও ওয়াই-ফাই সংযোগ রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি বিদ্যালয়ে রয়েছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক।
গত বৃহস্পতিবার, শনিবার ও রবিবার (১৮ অক্টোবর) তিন দিনের সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, উপজেলার বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান ও সহকারী শিক্ষকরা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ভিড় করছেন। গত বৃহস্পতিবার অনেক প্রধান শিক্ষককে বিদ্যালয়ে অবস্থান না করে শিক্ষা অফিসে আসা-যাওয়া করতে দেখা যায়।
শিক্ষকদের নতুন বেতন নির্ধারণ বা পে ফিক্সেশনের কাজ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে বসে করছেন কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষক নেতা। তাদের মধ্যে রয়েছেন ভাটিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফনিভূষণ সরকার, শিংগিমারী কাজিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক এবং খোড়াখাই বৈষ্ণবপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলাম। গত ১৫ অক্টোবর থেকে শিক্ষকদের নতুন বেতন নির্ধারণ বা পে ফিক্সেশনের কাজ শুরু হয়েছে।
অভিযোগকারী শিক্ষকদের দাবি, উপজেলার সাতটি ক্লাস্টারের বিদ্যালয় থেকে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে উপজেলা শিক্ষা অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা ও শিক্ষক নেতার নাম উঠে এসেছে। সাতটি ক্লাস্টারের দায়িত্বে থাকা সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন একাধিক শিক্ষক।
তাদের অভিযোগ, শিক্ষক নেতাদের সঙ্গে কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকায় সাধারণ শিক্ষকরা এ বিষয়ে অভিযোগ জানাতে সাহস পাচ্ছেন না। উপজেলার ২০৬টি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অর্থ দেওয়ার চাপের মুখে রয়েছেন বলেও দাবি তাদের। এভাবে অর্থ সংগ্রহ বন্ধ না হলে সাধারণ শিক্ষকদের ওপর আর্থিক চাপ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
শিক্ষকদের দাবি, পে ফিক্সেশনের নামে অর্থ সংগ্রহের বিষয়ে কোনো সরকারি নির্দেশনা রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষকপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আদায়ের নির্দেশ কে দিয়েছেন, সংগৃহীত অর্থ কোথায় যাচ্ছে এবং এর সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা জড়িত কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দেখা উচিত।
এ বিষয়ে পার্বতীপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. এনামুল হক সরকার দৈনিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, নতুন বেতন নির্ধারণ বা পে ফিক্সেশনের কাজের জন্য অর্থ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে তাঁকে কোনো সরকারি নির্দেশনা দেখানো হয়নি। অনেক শিক্ষক নিজেরাই এ কাজ সম্পন্ন করছেন।
তিনি আরও বলেন, কিছু শিক্ষক-শিক্ষিকা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে এসে পে ফিক্সেশনের কাজ করছেন। এতে দোষের কিছু দেখছেন না তিনি। শিক্ষকেরা নিজেরাই এ কাজ করতে পারেন। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণ একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। এ কাজ সারা বছর ধরেও করা যাবে বলে জানান তিনি।