ফাইজান আহম্মেদ পরিবারের সঙ্গে বেড়াতে এসেছিল। ফিরে যাওয়ার কথা ছিল আনন্দ স্মৃতি নিয়ে, কিন্তু ফিরল না। কক্সবাজারের ইনানীতে ‘টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্ট’র অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারানো ১০ জন পর্যটকের সঙ্গে পাঁচ বছর বয়সী ফাইজানও ছিল। প্রত্যেকের ছিল পরিবার, স্বজন, স্বপ্ন, ভালোবাসা ও বেঁচে থাকার অধিকার। এই মৃত্যু শুধু পরিবারের অপূরণীয় শোক নয় এটি জননিরাপত্তা, প্রশাসনিক দায়িত্ব, আইন প্রয়োগ ও রাষ্ট্রের জবাবদিহির দায়। যে বিপদ ঠেকানো সম্ভব ছিল, সেই বিপদের মুখে একজন শিশুকে কেন প্রাণ দিতে হলো? আগুনে আরও ৯জন মানুষকে কেন জীবন হারাতে হলো? প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে, তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে।
শিশুর নিরাপত্তা প্রসঙ্গ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিশু তার চারপাশের বিপদ সম্পর্কে বড়দের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। আগুন লাগলে কোন পথে বেরোতে হবে, ধোঁয়ায় শ্বাস নিতে অসুবিধা হলে কী করতে হবে, কোন দরজা নিরাপদ এসব বোঝার মতো অভিজ্ঞতা তার নেই। ঘুমন্ত অবস্থায় আগুন লাগলে, পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের সময় অনেক পর্যটক ঘুমিয়ে ছিলেন এবং কয়েকজন বাথরুমে আশ্রয় নেওয়ার পরও প্রাণ হারান। এমন পরিস্থিতিতে শুধু অতিথিদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যায় না। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে মানুষকে বেরিয়ে যাওয়ার পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। আগুন শনাক্ত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। জরুরি বহির্গমন পথ এমন হতে হবে যাতে আতঙ্ক ও ধোঁয়ার মধ্যেও অতিথিরা নিরাপদে বেরিয়ে যেতে পারেন। প্রশিক্ষিত কর্মী, কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম এবং বাস্তবসম্মত উদ্ধার-পরিকল্পনা থাকতে হবে। এগুলো কোনো বাড়তি সুবিধা নয়, মানুষের জীবনরক্ষার মৌলিক শর্ত।
ফাইজানের সঙ্গে মৃত্যুতে শামিল হয়েছেনম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাফিজ তেহামি এবং পরিবারের সদস্যরা। তাদের পরিবারের একাধিক সদস্যের মৃত্যুর তথ্য এসেছে। একটি পরিবার একসঙ্গে বেড়াতে গিয়ে এমনভাবে বিপর্যস্ত হলো, যেখান থেকে আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার পথ নেই। প্রত্যেকের মৃত্যু পৃথকভাবে তদন্তের দাবি রাখে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার কাঠামোগত ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা অনুসন্ধানের দাবি জানায়। ফাইজানের বয়স আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, কিন্তু বয়সের পার্থক্যে মানুষের জীবনের মূল্য নির্ধারিত হয় না। নিরাপদে থাকার অধিকার সবার। তাদের প্রত্যেকের জীবন সমান মূল্যবান।
এই দুর্ঘটনাকে আগুন সূত্রপাতের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। আগুন কীভাবে লেগেছে, তা জানতে হবে। আগুনের সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত, কোনো কারণকে চূড়ান্ত বলে ঘোষণা করা যাচ্ছে না।
সমস্যাটি শুধু টুপটুপ রিসোর্টে সীমাবদ্ধ? কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের ৮০ কিলোমিটার এলাকায় এক হাজারের বেশি বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান আছে। এর মধ্যে প্রায় ২৫০টি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় অনুমোদন বা বিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে ঘাটতির তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নোটিস থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন আছে। কোন কোন প্রতিষ্ঠান সতর্কবার্তা পাওয়ার পর ব্যবস্থা নিয়েছে, আর কোনটি নেয়নি? এই তথ্য নামভিত্তিক, হালনাগাদ ও যাচাইযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হলে পর্যটকরা অন্তত নিরাপত্তা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ধারণা পাবেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও নিজেদের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জনসাধারণকে জবাব দিতে বাধ্য থাকবে। কাগজে অনুমোদন আছে কি না, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনুমোদনই নিরাপত্তার একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। একটি প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র ঠিক থাকলেও অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র অকেজো থাকতে পারে, জরুরি বহির্গমন পথ বন্ধ থাকতে পারে, বৈদ্যুতিক সংযোগ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই নিয়মিত পরিদর্শন এবং বাস্তব পরিস্থিতি যাচাইয়ের বিকল্প নেই।
শুধু নথিপত্র পরীক্ষা করলে হবে না; অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, ফায়ার অ্যালার্ম, বৈদ্যুতিক সংযোগ, জরুরি বহির্গমন পথ, উদ্ধার-পরিকল্পনা এবং কর্মীদের প্রস্তুতি সরেজমিনে পরীক্ষা করতে হবে। তাৎক্ষণিক প্রাণহানির ঝুঁকি থাকলে, আইন অনুযায়ী কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। অন্যান্য ত্রুটি সংশোধনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে হবে এবং পরে পরিদর্শন করে নিশ্চিত হতে হবে যে, নির্দেশ বাস্তবায়িত হয়েছে। পর্যটকরা যেন বুকিংয়ের আগে, নিরাপত্তার অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারেন। অনুমোদন না থাকলেই কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা বা অনুমোদন থাকলেই বাস্তব নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে, এমনটি ধরে নেওয়া যাবে না। তথ্য হতে হবে নির্ভুল, স্বচ্ছ এবং নিয়মিত হালনাগাদ। ফাইজানসহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত প্রত্যেক মানুষের মৃত্যুর দায় নির্ধারণ করতে হবে। তদন্তে দুর্নীতি, অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া সময়ের দাবি। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান চলবে, দায় নির্ধারণের কাজ চলবে। একই সঙ্গে অন্যান্য পর্যটনস্থলের নিরাপত্তা যাচাই চালাতে হবে।
ফাইজানের জন্য ন্যায়বিচার মানে শুধু আগুনের কারণ জানা নয়। একই আগুনে প্রাণ হারানো প্রত্যেক মানুষের মৃত্যুর ব্যাখ্যা পাওয়া, কেন বিপদ ঠেকানো গেল না তা জানা, কার দায়িত্বে ব্যর্থতা ঘটল তা নির্ধারণ করা এবং সেই ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করা। অভিযোগের তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ, দায় নির্ধারণ হতে হবে প্রমাণভিত্তিক, আর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হতে হবে দৃশ্যমান ও কার্যকর। আমরা চাই না, আর কোনো পরিবার বেড়াতে এসে সন্তান হারানোর শোক নিয়ে বাঁচুক।
লেখক : চাইল্ডকেয়ার ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন কনসালটেন্ট ইউনিসেফ।
dipumahmud1971@gmail.com