অনুমানই যেন সত্যি হলো। ঈদ ছাড়া কোনো উৎসবেই জমে না সিনেমা যার প্রমাণ পাওয়া গেল এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবে। বেশ কয়েক বছর ধরেই স্বাধীনতা, জাতীয় ও বিজয় দিবসের পাশাপাশি নারী, বন্ধু, মা, ভালোবাসা দিবস এমনকি পহেলা বৈশাখ উপলক্ষেও সিনেমা মুক্তি পেয়ে আসছিল। কিন্তু কোনো সিনেমাই ব্যবসায়িক সাফল্য না পাওয়ায় ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে উৎসবকেন্দ্রিক ছবি মুক্তির প্রক্রিয়া। তবে এবারের দুর্গাপূজা উপলক্ষে গত শুক্রবার মুক্তি পাওয়া তিনটি সিনেমা প্রথম দিন থেকেই দর্শকখরায় ভুগে মুখ থুবড়ে পড়ে। এই ভরাডুবির চিত্র ও কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছেন জাহাঙ্গীর বিপ্লব
শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে চলতি সপ্তাহে মুক্তি পেয়েছে ‘স্নেহের বন্ধন’, ‘চিরকুট’ ও ‘কাট-পিস’ সিনেমাগুলো। তিনটি সিনেমাই তিন ধরনের প্রেক্ষাপট নিয়ে নির্মিত। মুক্তির আগে এগুলোর গান প্রকাশ করার পাশাপাশি সংবাদ সম্মেলনও করেছেন নির্মাতা, শিল্পী ও কলাকুশলীরা। সবাই নিজেদের সিনেমা নিয়ে নানা রকম প্রত্যাশার কথা বললেও এসব আশার বাণী কানে তোলেননি দর্শক; যার দরুণ প্রেক্ষাগৃহ সংকটের পাশাপাশি দর্শকশূন্যতার মুখে পড়ে সিনেমাগুলো। কেন এমন ব্যবসায়িক বিপর্যয় এর সঠিক কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না নির্মাতাপক্ষ। উৎসবের দিনগুলোয় যেখানে সিনেমা হলগুলোয় দর্শকের উপচে পড়া ভিড় থাকার কথা, সেখানে হলের টিকিট কাউন্টারগুলোয় বিরাজ করছে অনেকটা শুনশান নীরবতা। মুক্তির প্রথম তিন দিন কোনো সিনেমাই কাক্সিক্ষত দর্শকখরা কাটাতে পারছে না। আর এই তিন সিনেমার মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে কামরুজ্জামান পরিচালিত ‘স্নেহের বন্ধন’। সরেজমিন ও বিভিন্ন হল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রথম শোতে কোনো টিকিটই বিক্রি হয়নি সিনেমাটির। পরের শোর ৩৭ টিকিটের ৩৫টিই কিনে নেন সিনেমার প্রযোজক-নায়ক বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয় চৌধুরী। মুক্তির আগে রাজধানীর বুকে ছাদখোলা বাসে করে বেশ প্রচার-প্রচারণাও চালিয়েছিল। কিন্তু হল খোলার পর দেখা গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। সিঙ্গেল স্ক্রিন থেকে শুরু করে মাল্টিপ্লেক্স সবখানেই এই সিনেমার শোগুলো ফাঁকা যাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে ভাড়া করেও দর্শক পাচ্ছেন নায়ক! যদিও বিষয়টি অস্বীকার করে নায়ক জয় চৌধুরী জানান, গুটি কয়েক দর্শক হলেও তারা যে প্রেক্ষাগৃহে আসছে এটাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন তিনি।
রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন সিনেমা হল কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুক্তির প্রথম দিন শুক্রবার বরিশাল অভিরুচি সিনেমা হলে দুপুরে শোতে ‘¯েœহের বন্ধন’ দেখতে গিয়েছিলেন মাত্র ৬ জন দর্শক! সন্ধ্যার শোতে ছিল মাত্র ৯ জন। পরেরদিন শনিবার ১২টার শোতে ৪ জন এবং বিকোলের শোতে বিক্রি হয় দুটি টিকিট। এ রকম ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখে নাইট ও স্পেশাল শো বন্ধ করে রাখা হয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনেও একই চিত্র বলে জানান হল কর্র্তৃপক্ষ। সিনেমা হলের ম্যানেজার বলেন, ‘এখন আসলে কেউ সিনেমা দেখতে চায় না। শুক্রবার সারা দিনে ২০ জনের মতো দর্শক হয়েছিল কিš‘ সন্ধ্যায় দর্শক না থাকায় শো বন্ধ ছিল। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনেও একই অবস্থা। যদিও এখন বরিশালে খুব একটা সিনেমা চলে না। ভালো গল্প হলে একটু দর্শক পাওয়া যায়। আর এই সিনেমার মান নিয়েও অনেকেই সমালোচনা করেছেন। বরিশালের সেল খারাপ। দর্শক আসলে শো চলে না হলে বন্ধ থাকে।’
গতকাল অভিরুচি হলের ম্যানেজারের সঙ্গে যখন কথা হয়, তখন ৩টা বেজে ৪০ মিনিট। শোয়ের নির্ধারিত সময় পার হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত একজন দর্শকও পাওয়া যায়নি। লায়ন সিনেমায় প্রদর্শিত হচ্ছে ‘কাট-পিস’ও ‘স্নেহের বন্ধন’ সিনেমা দুটি। তবে সিনেমা দুটির মান নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করে হলটির কর্ণধার মির্জা আব্দুল খালেক বলেন, ‘আমি আসলে এখনকার সিনেমা নিয়ে কথা বলতে চাই না। কী বলব, এগুলো কী সিনেমা? এগুলো টাকা খরচ করে মানুষ কেন দেখবে? একটি সিনেমা দেখতে গেলে কমপক্ষে পাঁচশত টাকা খরচ আছে। সিনেমা দেখে সেই টাকাই যদি উসুল না হয়, তাহলে দর্শক কেন সিনেমা দেখবে। প্রথম দিন ‘স্নেহের বন্ধন দেখেছিল ৩৭ জন দর্শক। এর মধ্যে ৩৫টি টিকিট কিনেছেন সিনেমাটির প্রচারণায় আসা প্রযোজক, পরিচালক, নায়ক-নায়িকা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অর্থাৎ সাধারণ দর্শক টিকিট কিনেছেন মাত্র দুজন। অন্যদিকে, একই দিনে ‘কাটপিস’ সিনেমার টিকিট বিক্রি হয়েছে মাত্র আটটি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনেও একই অবস্থা। আমরা আসলে সিনেমা নামিয়ে দিই না। দর্শক না আসলে শো বন্ধ থাকে।’
উল্কা সিনেমা হলের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মোহাম্মদ রফিক উদ্দিন বলেন, ‘পূজায় যেভাবে দর্শক থাকার কথা সে রকম দর্শক নেই। প্রথম ও দ্বিতীয় দিন প্রায় ২০ হাজার টাকার টিকিট বিক্রি হয়েছে। তৃতীয় দিনে দর্শকসংখ্যা কমেছে। তবুও আমরা বাংলা সিনেমা নিয়ে আশাবাদী।’ সিনেমা হলের কর্মকর্তারা জানান, অনেক শো-তে হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র দর্শক দেখছেন, যা দিয়ে সিনেমা হলের ন্যূনতম খরচ ওঠানোও অসম্ভব হয়ে পড়ছে। সনাতন ধাঁচের পারিবারিক গল্প ও দুর্বল নির্মাণশৈলীই দর্শকদের হলবিমুখ করার প্রধান কারণ বলে মনে করছেন চলচ্চিত্র বিশ্লেষকরা। ঝুট ব্যবসার অপরাধ জগতের গল্প নিয়ে নির্মিত ‘কাট-পিস’ মিরপুর সনি সিনেমা হলসহ ২৩টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেলেও আশানুরূপ সাড়া জাগাতে পারেনি।
অন্যদিকে, শ্যামল মাওলা ও আজিজুন মিম অভিনীত ‘চিরকুট’ সিনেমাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নস্টালজিয়া নিয়ে তৈরি হওয়ায় তরুণদের মধ্যে কিছুটা আগ্রহ তৈরি করলেও তা টিকিট বিক্রির অঙ্কে বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের মতে, ঈদ ছাড়া অন্য উৎসবে বড় পরিসরে সিনেমা মুক্তি দেওয়ার সাহস ঢালিউডে কম দেখা যায়। এবার পূজাকে কেন্দ্র করে সেই চেষ্টা করা হলেও সিনেমার দুর্বল কনটেন্ট, আধুনিক মেকিংয়ের অভাব এবং দর্শকের রুচির পরিবর্তনের কারণে সিনেমাগুলো মুখ থুবড়ে পড়েছে।