দুমকিতে অপরিকল্পিত নগরায়ণে বাড়ছে জলাবদ্ধতা

পটুয়াখালীর দুমকিতে অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে দিন দিন বাড়ছে জলাবদ্ধতা। নালা, ডোবা ও নিচু জমি ভরাট করে বহুতল ভবন ও আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন।

অন্যদিকে পরিকল্পিত ড্রেনেজ ও পয়ঃনিষ্কাশনব্যবস্থা না থাকায় বর্ষা মৌসুমে সড়ক ও বাজারে পানি জমে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। বৃষ্টির দিনে ক্রেতা কমে যাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরাও।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে গত দুই যুগে দুমকিতে দ্রুত আবাসন সম্প্রসারণ হয়েছে। তবে ভবন নির্মাণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গড়ে ওঠেনি পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা। ২০২০ সালে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেন নির্মাণের একটি প্রকল্প নেওয়া হলেও জমির মালিকদের বাধায় তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলা শহরের বিসমিল্লাহ সড়ক, মুসলিমপাড়া ও একতা সড়ক এলাকায় অসংখ্য নতুন ভবন গড়ে উঠেছে। এসব এলাকার অধিকাংশ স্থানে পরিকল্পিত ড্রেন নেই। জমি ভরাট করে বসতভিটা উঁচু করায় নিচু সড়ক ও আশপাশের বাড়িঘরে বৃষ্টির পানি জমে থাকছে।

বিসমিল্লাহ সড়কের বাসিন্দা শওকত হাসান বলেন, আগে বৃষ্টির পানি পাশের জলাশয়ে চলে যেত। এখন চারদিকে ভবন গড়ে উঠেছে, কিন্তু ড্রেনের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। সবাই মিলে উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে বড় সমস্যায় পড়তে হবে।

মুসলিমপাড়ার বাসিন্দা শাহীন খান বলেন, পরিকল্পিত ড্রেন না থাকায় প্রতিবছর বর্ষায় দুর্ভোগ পোহাতে হয়। যে যার মতো ভবন নির্মাণ করছেন, কিন্তু পানি কোথায় নামবে, তা নিয়ে কেউ ভাবছেন না।

আবাসিক এলাকার পাশাপাশি জলাবদ্ধতার সমস্যায় ভুগছেন পীরতলা ও নতুন বাজারের ব্যবসায়ীরা। প্রায় ৫০০ দোকান নিয়ে গড়ে ওঠা পীরতলা বাজারে প্রতিদিন হাজারো মানুষের যাতায়াত। অথচ বাজারটিতে পরিকল্পিত ড্রেনেজ ও পয়ঃনিষ্কাশনব্যবস্থা নেই। বৃষ্টির সময় সড়কে পানি ও ময়লা জমে চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। এতে বাজারে ক্রেতাদের উপস্থিতি কমে যায়।

পীরতলা বাজারের কাপড় ব্যবসায়ী মামুন খান বলেন, ড্রেন না থাকায় বৃষ্টির সময় বাজারের রাস্তা ময়লা ও কাদায় একাকার হয়ে যায়। তখন ক্রেতারা বাজারে আসতে চান না। প্রতিবছর বর্ষা এলেই বেচাকেনা কমে যাওয়ার দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।

একই চিত্র নতুন বাজারেও। সেখানে ড্রেন ও পয়ঃনিষ্কাশনব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টির দিনে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়কেই দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

এদিকে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো প্রধান ফটকসংলগ্ন সড়কেও দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে শিক্ষার্থী ও পথচারীদের চলাচলে দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রাকিবুল হাসান বলেন, ভর্তি হওয়ার পর থেকেই সড়কটির বেহাল অবস্থা দেখছেন তিনি। এটি ‘১২ মাসের ভোগান্তির সড়ক’। একদিকে রাস্তা ভাঙা, অন্যদিকে জলাবদ্ধতা। ড্রেন না থাকায় পানি সরতে পারে না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দুমকি এখনো পৌরসভা না হওয়ায় এখানে সমন্বিত নগর পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে জমি ভরাট ও ভবন নির্মাণের ফলে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে ড্রেন নির্মাণের জায়গাও সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী ফারুক হোসেন বলেন, সঠিক ড্রেনেজ ও পয়ঃনিষ্কাশনব্যবস্থা ছাড়া ভবন নির্মাণের ফলে পুরো এলাকা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির দিকে যাচ্ছে। পানি নিষ্কাশনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

দুমকি উপজেলা প্রকৌশলী মঈনুল আজম বলেন, ২০২০ সালে ইউটিএমআইডিপি প্রকল্পের আওতায় উপজেলা পরিষদ থেকে পীরতলা খাল পর্যন্ত ড্রেন নির্মাণের জন্য প্রায় তিন কোটি টাকার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জমির মালিকেরা জায়গা দিতে রাজি না হওয়ায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা যায়নি।

তিনি আরও বলেন, ভবনের সংখ্যা বাড়লেও পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা রাখা হচ্ছে না। নতুন প্রকল্প নেওয়ার আগে জমির মালিকদের কাছ থেকে ড্রেন নির্মাণের জায়গা দেওয়ার লিখিত সম্মতি নিশ্চিত করতে হবে।

দুমকি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ খায়রুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আগে একটি বড় ড্রেন নির্মাণ প্রকল্প স্থানীয়দের বাধায় বাস্তবায়ন করা যায়নি বলে তিনি জানতে পেরেছেন। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে পানি নিষ্কাশন নিয়ে বড় ধরনের দুর্ভোগ সৃষ্টি হবে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে বলেও জানান তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, জলাবদ্ধতা স্থায়ী সংকটে পরিণত হওয়ার আগেই পরিকল্পিত ড্রেন নির্মাণ, প্রাকৃতিক খাল ও জলাশয় সংরক্ষণ এবং সমন্বিত পয়ঃনিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।