ইশরাক থেকে মিষ্টি: ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’

প্রতিমন্ত্রী বা এমপির পদে থেকে ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ ও ‘আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার’ অভিযোগে বিএনপি সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে পদ হারালেন। মাত্র দুই সপ্তাহ আগেই অভিযোগ ওঠায় পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন বিএনপির সংরক্ষিত আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি।

পুরান ঢাকায় অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ হারাচ্ছেন ঢাকা-৬ আসনের এমপি ইশরাক হোসেন। আজ সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরেই জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। আর সম্প্রতি মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, দখল ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠায় পদত্যাগে বাধ্য হন সংরক্ষিত আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি।

গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকালে পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে নিজের ফেসবুক পেজে একাধিক ভিডিও প্রকাশ করেন ইশরাক হোসেন। একটি ভিডিওতে তাকে সরাসরি নিজের হাতে অস্ত্র নিয়ে অভিযানে নেতৃত্ব দিতে দেখা যায়, যা দেশজুড়ে তোলপাড় তৈরি করে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উপস্থিতি সত্ত্বেও একজন জনপ্রতিনিধি ও প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র হাতে মাঠে নামা আইন লঙ্ঘনের সামিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

বিতর্কের মুখে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম স্পষ্ট ভাষায় জানান, ‘আপনারা যেটা দেখেছেন, আমরাও দেখেছি। স্থানীয় ডিসিকে বলা হয়েছে, তিনি পুরো ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করে প্রতিবেদন দেবেন। এখানে আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়ে থাকলে ডিএমপি অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেবে।’

রবিবার (১৮ অক্টোবর) রাতে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশেই প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন ইশরাক। তবে প্রথমে তাঁর মিডিয়া উইং এটিকে ‘অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও, শেষ পর্যন্ত পদত্যাগের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়। আক্ষেপ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইশরাক লেখেন, ‘ফেসবুকে কিছু সুশীল মানুষকে উল্লাসসূচক লেখালেখি করতে দেখলাম। আশা করি, ভবিষ্যতে কখনো আন্দোলন-সংগ্রামের প্রয়োজন হলে তাঁরা জাতীয়তাবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বিদেশ থেকে দেশে এসে সেই আন্দোলনে যোগ দেবেন।’

একইসাথে পদ ছাড়লেও নিজের অবস্থানের কথা স্পষ্ট করে বিএনপির এই আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্য লেখেন, ‘এবার সংসদ সদস্য বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নয়, একজন বিএনপি কর্মী হিসেবে মাদকের বিরুদ্ধে শতগুণ বেশি উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করব, ইনশাআল্লাহ।’ তিনি আরও যুক্ত করেন, ‘পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি আরও জোরদার হবে। দেশব্যাপী প্রজন্ম দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন জেলা সফর করতে পারব।’ নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে তিনি লেখেন, ‘মন্ত্রী নয়, মাদক নির্মূল! মাদক নির্মূল, মাদক নির্মূল!’ পরদিন আজ সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেন ইশরাক।

ইশরাক হোসেনের এই পদত্যাগের মাত্র কয়েকদিন আগেই ঘটেছিল সংরক্ষিত আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের ঘটনা। গত ২৪ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে ঢাকার মিরপুর-১ নম্বরের ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে’ দেশীয় অস্ত্র ও ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে ঢুকে পড়ে প্রায় দুই শতাধিক লোক। হামলাকারীরা পুরো স্বাস্থ্যকেন্দ্রের টিনশেড ও ভবন গুঁড়িয়ে দেয় এবং আল্ট্রাসাউন্ড রুম, ল্যাবসহ বিভিন্ন কক্ষের প্রায় কোটি টাকার বেশি মালামাল লুটপাট ও ভাঙচুর করে। ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্র দখলের চেষ্টার ঘটনায় ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নাম সরাসরি উঠে এলে ক্ষুব্ধ হন সরকারপ্রধান। ফলে কঠোর নির্দেশে গত ১ অক্টোবর সংসদ সদস্যের পদ ছাড়তে বাধ্য হন মিষ্টি।

ইশরাক হোসেন এবং ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি—উভয়ের ক্ষেত্রেই নিজ নিজ এলাকায় ক্ষমতার অপব্যবহার, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং প্রশাসনিক পদমর্যাদার তোয়াক্কা না করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল। দৃশ্যত, সরকারের ‘জিরো টলারেন্স নীতিতে’ এই দুই নেতা তাদের পদ হারালেন।