ইউরোপের রাজপথে আজ যে অসন্তোষ দৃশ্যমান, তা কেবল জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন সংকট কিংবা শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিবাদ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সংকট, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে হতাশা, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং অভিবাসন প্রশ্নে সমাজের ক্রমবর্ধমান বিভাজন। ১৭ অক্টোবরের ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনা এই সংকটকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। একই সময়ে বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষা, আবাসন ও সরকারি নীতির বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদ একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো— ইউরোপের জনঅসন্তোষ কি আগামী দিনে ডানপন্থী ও কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে? বিশেষ করে ২০২৭ সালের ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন কি মেরিন লে পেনের রাজনৈতিক উত্থানের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে? আর তা হলে ফ্রান্সে বসবাসরত অভিবাসী, শরণার্থী ও প্রবাসী বাংলাদেশীদের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যেতে পারে?
রাজপথের ক্ষোভ, রাজনীতির নতুন সমীকরণ:
গত ১৭ অক্টোবর ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিপুলসংখ্যক মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার; অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠন সিজিটির হিসাবে তা প্রায় ৮ লাখ। জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির মূল্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে জমে থাকা অসন্তোষ এই বিক্ষোভে প্রকাশ পায়। তবে কয়েকটি শহরে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও সরকারি স্থাপনায় হামলার ঘটনা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মূল বক্তব্যকে আড়াল করে দেয়। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার অঙ্গীকার করেন।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিবাদ নাগরিকের অধিকার। কিন্তু সেই অধিকারের নামে অন্যের দোকান লুট করা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়া কিংবা সরকারি সম্পদ ধ্বংস করার কোনো বৈধতা নেই। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের দায়িত্বও শুধু পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। মানুষের ক্ষোভের কারণগুলো শনাক্ত করা এবং কার্যকর সমাধান দেওয়াও সরকারের দায়িত্ব।
ফ্রান্সের অভিজ্ঞতা বলছে, অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক বৈষম্য দীর্ঘদিন উপেক্ষিত থাকলে তা একসময় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। ২০১৮ সালের ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন পরে ক্রয়ক্ষমতা, করনীতি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বৃহত্তর বিতর্কে পরিণত হয়েছিল। এবারের পরিস্থিতিতেও একই ধরনের প্রশ্ন ফিরে এসেছে। সাধারণ মানুষের আয় যদি দৈনন্দিন ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারে, তরুণরা যদি মানসম্মত শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগেন এবং আবাসন যদি ক্রমেই নাগালের বাইরে চলে যায়, তাহলে সরকারের প্রতি অসন্তোষ বাড়বে। এই অসন্তোষকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ বিরোধী দলগুলোর সামনে তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
২০২৭: মেরিন লে পেনের জন্য সুযোগ, নাকি ফ্রান্সের রাজনৈতিক পরীক্ষা?
ফ্রান্সের আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক শক্তি ন্যাশনাল র্যালি বা আরএন। মেরিন লে পেন ও জর্ডান বারদেল্লার নেতৃত্বাধীন এই দল দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় পরিচয়, সীমান্ত সুরক্ষা এবং অপরাধ দমনের প্রশ্নকে তাদের রাজনৈতিক প্রচারণার কেন্দ্রে রেখেছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোও দলটির শক্ত অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অক্টোবরের মাঝামাঝি প্রকাশিত বিভিন্ন জরিপে ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফায় লে পেনের সম্ভাব্য ভোটের হার প্রায় ৩২ থেকে ৩৭ শতাংশের মধ্যে দেখা গেছে। তবে এগুলো প্রথম দফার ভোটের অভিপ্রায়, চূড়ান্ত ফলাফল নয়। দ্বিতীয় দফায় কার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে, ভোটারদের মধ্যে জোট ও সমর্থনের পরিবর্তন ঘটবে কি না এবং প্রার্থীর আইনি পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে— তার ওপর ফল নির্ভর করবে (সূত্র: অক্টোবর ২০২৬-এর নির্বাচনী জরিপসমূহ)।
২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফায় লে পেন প্রায় ৪১.৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। কয়েক দশক আগের তুলনায় ফরাসি রাজনীতিতে কট্টর ডানপন্থীদের এই অবস্থান নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে ভোটের এই হারকে কেবল অভিবাসনবিরোধী মনোভাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। ক্রয়ক্ষমতা, সামাজিক নিরাপত্তা, জাতীয় পরিচয়, সরকারি নীতির প্রতি অসন্তোষ এবং প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অনাস্থাও এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে। ১৭ অক্টোবরের সহিংসতা আরএনের জন্য রাজনৈতিক প্রচারণায় নতুন উপাদান তৈরি করতে পারে। নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের প্রশ্নে দলটি আরও জোরালো বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাবে। বিশেষ করে যেসব ভোটার অর্থনৈতিক অসন্তোষের পাশাপাশি নিজেদের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন, তাঁদের একটি অংশ ডানপন্থীদের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
তবে এটিকে লে পেনের বিজয়ের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। সহিংসতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া এবং পুরো অভিবাসী জনগোষ্ঠীকে সন্দেহের চোখে দেখা এক বিষয় নয়। ফরাসি ভোটারদের একটি বড় অংশ একই সঙ্গে নিরাপত্তা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও নাগরিক স্বাধীনতা চায়। নির্বাচনে এই তিনটি প্রত্যাশার ভারসাম্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ইউরোপজুড়ে আন্দোলন: সংকট শুধু ফ্রান্সের নয়:
ফ্রান্সের বাইরে বেলজিয়াম, স্পেন, ইতালি ও পর্তুগালের শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও বাজেট কাটছাঁট, ইতালিতে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি নীতি এবং পর্তুগালে আবাসন সংকট নিয়ে বিক্ষোভ ইউরোপের একটি সাধারণ সমস্যাকে সামনে এনেছে। দেশভেদে আন্দোলনের কারণ ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও তরুণদের ভবিষ্যৎ, সাশ্রয়ী আবাসন, শিক্ষার সুযোগ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগের মিল রয়েছে। এই অসন্তোষের রাজনৈতিক ফল দুই দিকে যেতে পারে। একদিকে বামপন্থী ও শ্রমিক সংগঠনগুলো সামাজিক সুরক্ষা, সরকারি বিনিয়োগ এবং বৈষম্য কমানোর দাবি জোরালো করতে পারে; অন্যদিকে ডানপন্থীরা নিরাপত্তা, জাতীয় স্বার্থ, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং অভিবাসন সীমিত করার প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে জনসমর্থন বাড়াতে পারে।
সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের সব দায় একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। আবাসন সংকট, হাসপাতালের চাপ কিংবা কর্মসংস্থানের ঘাটতির পেছনে সরকারি বিনিয়োগ, পরিকল্পনা, শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক কাঠামোর মতো বহু কারণ থাকে। অভিবাসন নিয়ে নীতিগত বিতর্ক প্রয়োজন, কিন্তু জটিল সমস্যার সহজ ব্যাখ্যা হিসেবে অভিবাসীদের দায়ী করা বাস্তবসম্মত সমাধান নয়।
অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা বাড়লে কী হবে?
২০২৭ সালের নির্বাচনে ডানপন্থীরা শক্তিশালী হলে ফ্রান্সের অভিবাসন নীতিতে আরও কঠোরতার সম্ভাবনা রয়েছে। আশ্রয়প্রক্রিয়া, বসবাসের অনুমতি, পারিবারিক পুনর্মিলন, নাগরিকত্ব অর্জন, সামাজিক সুবিধা এবং অপরাধে দণ্ডিত বিদেশীদের বহিষ্কারের মতো বিষয়ে নতুন বিধিনিষেধের প্রস্তাব সামনে আসতে পারে। ন্যাশনাল র্যালি দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসন কমানো, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা এবং বিদেশীদের জন্য কিছু রাষ্ট্রীয় সুবিধায় বিধিনিষেধ আরোপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দলটি সরকার গঠন করতে পারলে এসব প্রস্তাব নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবে কার্যকর হওয়া আইনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। প্রতিটি প্রস্তাবকে আইন প্রণয়ন, সাংবিধানিক সীমা এবং ইউরোপীয় ও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন— ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বিস্তৃত হলেও তিনি এককভাবে সব অভিবাসন আইন পরিবর্তন করতে পারেন না। সংসদ, সাংবিধানিক পরিষদ, প্রশাসনিক ও বিচারিক আদালত এবং ইউরোপীয় আইনি কাঠামো বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। আশ্রয়প্রার্থী ও শরণার্থীদের ক্ষেত্রে জেনেভা শরণার্থী কনভেনশনসহ প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নির্যাতন বা অমানবিক আচরণের বাস্তব ঝুঁকি থাকলে কাউকে সংশ্লিষ্ট দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রেও আইনি সীমাবদ্ধতা প্রযোজ্য। তবে এসব সুরক্ষার অর্থ এই নয় যে অভিবাসন নীতিতে কোনো কঠোরতা আনা সম্ভব নয়। আইনসম্মত পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কঠোর করা, কিছু শর্ত পরিবর্তন করা কিংবা নির্দিষ্ট শ্রেণীর আবেদনকারীর ক্ষেত্রে যাচাই বাড়ানো সম্ভব হতে পারে। ফলে অভিবাসীদের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত অবস্থান হলো আতঙ্কিত না হয়ে নিজেদের আইনি অবস্থান, নথিপত্র ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা।
প্রবাসী বাংলাদেশীদের উদ্বেগ ও বাস্তবতা:
ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশীদের জন্য এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের গুরুত্ব বিশেষভাবে বিবেচ্য। কেউ শরণার্থী হিসেবে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পেয়েছেন, কেউ বৈধ বসবাসের অনুমতিতে কাজ করছেন, আবার কেউ নিয়মিতকরণের অপেক্ষায় রয়েছেন। তাঁদের সবার আইনি অবস্থান এক নয়, তাই রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাবও সবার ক্ষেত্রে একই হবে না। যাঁরা শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন, তাঁদের অধিকার ও সুরক্ষার ভিত্তি সাধারণ বিদেশী নাগরিকদের বসবাসের অনুমতির চেয়ে আলাদা। যাঁদের দীর্ঘমেয়াদী বসবাসের অনুমতি রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য আইন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে অনিবন্ধিত অভিবাসীদের নিয়মিতকরণ, কাজের অনুমতি এবং বহিষ্কারের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
পারিবারিক পুনর্মিলনের অপেক্ষায় থাকা বাংলাদেশী পরিবারগুলোর জন্যও অভিবাসন নীতির পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। আবেদন প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত শর্ত, যাচাই বা প্রশাসনিক বিলম্ব তৈরি হলে পরিবারের সদস্যদের একত্রিত হওয়ার অপেক্ষা দীর্ঘ হতে পারে। তবে কোনো রাজনৈতিক দলের উত্থান ঘটলেই সব চলমান আবেদন বন্ধ হয়ে যাবে— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ভিত্তি নেই।
ফরাসি অর্থনীতিতে প্রবাসীদের শ্রম ও উদ্যোগের অবদানও উপেক্ষা করা যায় না। রেস্তোরাঁ, পরিচ্ছন্নতা, পরিবহন, নির্মাণ, খুচরা ব্যবসা এবং বিভিন্ন সেবামূলক খাতে অভিবাসীরা কাজ করছেন। অনেক বাংলাদেশী উদ্যোক্তা ছোট ব্যবসার মাধ্যমে নিজেদের পরিবার পরিচালনার পাশাপাশি কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করেছেন। তাঁদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং একই সঙ্গে শ্রমবাজারের নিয়ম কার্যকর রাখা একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের কাজ।
বাংলাদেশ-ফ্রান্স সম্পর্ক ও কূটনীতির প্রয়োজন:
অভিবাসন প্রশ্নটি শুধু ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশ-ফ্রান্স দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, শ্রমবাজার, শিক্ষা, বাণিজ্য এবং প্রবাসীদের স্বার্থের সঙ্গেও সম্পর্কিত। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজ ক্রয় নিয়ে এয়ারবাসের সঙ্গে আলোচনা এবং ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব এই সম্পর্কের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরে।
তবে বাণিজ্যিক চুক্তি বা বিমান কেনার সিদ্ধান্তের সঙ্গে অভিবাসন নীতিকে সরাসরি এক করে দেখা উচিত নয়। দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও অভিবাসীদের আইনি অধিকার আলাদা আইন ও চুক্তির ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশের কূটনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত বাণিজ্যের পাশাপাশি প্রবাসীদের অধিকার, শ্রমিক সুরক্ষা, কনস্যুলার সহায়তা এবং আইনসম্মত অভিবাসনের সুযোগ নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা চালানো।
বাংলাদেশ দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য প্রবাসীদের তথ্যভিত্তিক আইনি সহায়তা, জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে প্রবাসী সংগঠনগুলোর উচিত গুজব বা রাজনৈতিক আতঙ্ক ছড়িয়ে না দিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহ করা এবং ফরাসি সমাজের সঙ্গে দায়িত্বশীল সম্পর্ক বজায় রাখা।
শেষ কথা: নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের ভারসাম্য
ফ্রান্সের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে সহিংসতা, লুটপাট ও জননিরাপত্তার হুমকি মোকাবেলা করতে হবে; অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষার সংকট, আবাসন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে মানুষের ক্ষোভের বাস্তব সমাধান খুঁজতে হবে। শুধু কঠোর আইন প্রয়োগ করে দ্বিতীয় সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আবার সামাজিক অসন্তোষের অজুহাতে সহিংসতা ও সম্পদ ধ্বংসের বৈধতাও দেওয়া যায় না।
২০২৭ সালের নির্বাচনে মেরিন লে পেনের সম্ভাবনা তাই শুধু একজন রাজনীতিকের ভাগ্যের প্রশ্ন নয়; এটি ফরাসি সমাজ কোন ধরনের রাষ্ট্র, নিরাপত্তা ও অভিবাসন নীতি চায়— তারও পরীক্ষা। ডানপন্থীদের উত্থান আরও কঠোর অভিবাসন নীতির সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে অনিবার্য ভবিষ্যৎ ধরে নেওয়া উচিত নয়।
ফরাসিরা নিরাপত্তা চাইবেন, অর্থনৈতিক স্বস্তি চাইবেন এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহিতাও চাইবেন। একইভাবে অভিবাসীরাও নিরাপদ জীবন, ন্যায়বিচার এবং আইনসম্মত অধিকার প্রত্যাশা করেন। এই প্রত্যাশাগুলোকে পরস্পরের শত্রু হিসেবে দাঁড় করানোর বদলে সমন্বয় করাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা।
ইউরোপের ইতিহাসে সংকট নতুন নয়। সংকটের মধ্য দিয়েই তার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার নিজেদের পুনর্গঠনের সুযোগ পেয়েছে। এবারও সেই সুযোগ রয়েছে। তবে তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সংযম, বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক নীতি, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং মানুষের উদ্বেগ শোনার সদিচ্ছা। ফ্রান্সের ২০২৭ সালের নির্বাচন শেষ পর্যন্ত শুধু ডান ও বামের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে না; এটি হবে নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা, জাতীয় স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ও মানবাধিকারের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষার ফল ফরাসি নাগরিকদের পাশাপাশি ফ্রান্সে বসবাসরত লাখো অভিবাসীর ভবিষ্যৎকেও প্রভাবিত করতে পারে।