তিনি শুধু ইমাম নন, বৃক্ষপ্রেমিকও

পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে নার্সারি গড়ে তোলা, নিজের অর্থ ও শ্রমে হাজার হাজার গাছের চারা রোপণ, মানুষকে বৃক্ষরোপণে উদ্বুদ্ধ করতে বাজারে মাইকিং- ভোলার চরফ্যাশনের ইমাম মোহাম্মদ রেজাউল কিবরিয়া বাবুলের জীবনের গল্পটা এমনই এক দীর্ঘ সাধনার। প্রায় ৩৪ বছর ধরে ইমামতির পাশাপাশি গাছ লাগানোকে তিনি নিয়েছেন সদকায়ে জারিয়া হিসেবে। তার লাগানো তালগাছের সারিতে বদলে গেছে গ্রামের বিভিন্ন সড়কের চেহারা। গড়ে তুলেছেন ফলদ, বনজ ও ভেষজ গাছের বাগানও। আর এই দৃশ্যপট পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে সম্পদ বিক্রি, অর্থসংকট মোকাবিলা এবং বারবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস। দীর্ঘদিনের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের কথা এবার পৌঁছেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে। গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজের কাজের প্রশংসা ও ভবিষ্যৎ উদ্যোগের জন্য সহযোগিতার আশ্বাস পেয়েছেন তিনি।

চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা রেজাউল কিবরিয়া বাবুল স্থানীয়ভাবে ‘বাবুল হুজুর’ নামে পরিচিত। কালাপানিয়া বাজারের বাইতুল মামুর জামে মসজিদে ইমামতি করেন তিনি। ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বৃক্ষরোপণকে জীবনের অন্যতম প্রধান কাজ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তার কাছে গাছ লাগানো শুধু পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ নয়, পরকালীন কল্যাণের আশায় একটি দীর্ঘমেয়াদি আমলও।

ধানতারাকে দেওয়া একান্ত টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বাবুল হুজুর বলেন, ‘১৯৯৩ সালে ইমামতি শুরু করি। ১৯৯৪ সাল থেকে সদকায়ে জারিয়া মনে করে গাছ লাগানোর কাজ করছি। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই এই কাজ শুরু করেছি।’

পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে নার্সারি

বৃক্ষরোপণের প্রতি আগ্রহ থেকেই নব্বইয়ের দশকে চারা সংগ্রহ ও বিতরণের উদ্যোগ নেন বাবুল হুজুর। পরে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় আট লাখ টাকা দিয়ে ভূঁইয়ারহাট এলাকায় একটি নার্সারি গড়ে তোলেন। সেখান থেকে চারা উৎপাদন ও সংগ্রহ করে বিভিন্ন সড়কের পাশে, বাড়িতে এবং নানা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে গাছ লাগাতে শুরু করেন।

তবে তার লক্ষ্য শুধু নিজের হাতে গাছ লাগানো ছিল না; অন্যদেরও এই কাজে যুক্ত করতে চেয়েছেন। এ জন্য বাজারে মাইকিং করে মানুষকে চারা লাগাতে উদ্বুদ্ধ করতেন। অনেককে বিনামূল্যে চারা দিয়েছেন, আবার কাউকে দিয়েছেন নামমাত্র মূল্যে। তার প্রত্যাশা ছিল, মানুষ নিজের বাড়ি ও আশপাশে গাছ লাগাবে, সড়কের পাশে গাছ বেড়ে উঠবে, আর পরিবেশ উপকৃত হবে।

কিন্তু নার্সারি পরিচালনা ও বৃক্ষরোপণের খরচ জোগাড় করা সহজ ছিল না। একপর্যায়ে চারা বিক্রি থেকে প্রত্যাশিত অর্থ না আসায় সংকটে পড়েন তিনি। নার্সারি ও গাছের কাজে বিনিয়োগ করা অর্থের চাপ সামলাতে ফরিদপুরের সদরপুরে গিয়ে ইমামতি করেন। সেখানে দুই থেকে তিন বছর কাজ করার কথা জানিয়েছেন তিনি। পরে সেখানকার আয় ও অন্যান্য উৎস থেকে পাওয়া অর্থ কাজে লাগিয়ে আবার নিজের এলাকায় ফিরে নার্সারি ও বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ এগিয়ে নেন।

ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রি করে শুরু করা এই উদ্যোগে একাধিকবার আর্থিক সংকট এলেও গাছ লাগানোর কাজ বন্ধ করেননি তিনি। বরং এক জায়গায় থেমে না থেকে নতুনভাবে চারা সংগ্রহ, রোপণ ও পরিচর্যার ব্যবস্থা করেছেন।

তালগাছের সারিতে বদলে গেছে সড়কের চেহারা

বাবুল হুজুরের দীর্ঘদিনের বৃক্ষরোপণ উদ্যোগের সবচেয়ে দৃশ্যমান নিদর্শন ওমরপুরের বাউল সড়ক। সড়কটির দুই পাশে সারি সারি তালগাছ বড় হয়ে উঠেছে। এসব গাছ পথচারীদের ছায়া দেয়, কৃষকদের চলাচলে স্বস্তি আনে এবং সড়কের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। ইউনিয়নের আরও কয়েকটি সড়কের পাশেও গাছ লাগানো ও পরিচর্যার কাজ করেছেন তিনি।

বাবুল হুজুরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিন দশকের বেশি সময়ে তিনি প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা রোপণ করেছেন। এর মধ্যে তালগাছের বীজ ও চারা রয়েছে আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ হাজার। সব গাছ টিকে থাকেনি। নানা কারণে কিছু চারা নষ্ট হয়েছে, কিছু গাছ বেড়ে ওঠেনি। তারপরও নতুন করে চারা লাগানো ও আগের গাছগুলোর পরিচর্যা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

তালগাছের প্রতি তার বিশেষ আগ্রহের কারণ পরিবেশগত বিবেচনা। বজ্রপাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় তালগাছের গুরুত্বের কথা মাথায় রেখে সড়কের পাশে এ গাছ লাগানোর ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। তার বিশ্বাস, ব্যক্তিগত উদ্যোগে বেশি বেশি গাছ লাগানো গেলে পরিবেশ রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব।

দুই থেকে তিন একর জমিতে নানা প্রজাতির গাছ

তালগাছের পাশাপাশি নিজের জমিতেও বিভিন্ন প্রজাতির গাছের বাগান গড়ে তুলেছেন বাবুল হুজুর। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দুই থেকে তিন একর জমিতে রয়েছে ফলদ, বনজ, ভেষজ ও শোভাবর্ধনকারী গাছ। আমলকী, হরিতকী, বহেরা ও নিমসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগিয়েছেন তিনি। রয়েছে কাঠজাতীয় গাছের বাগানও। তালগাছের পাশাপাশি খেজুরগাছ নিয়েও কাজ করছেন।

নিজের বাগান ও সড়কের পাশের গাছগুলোর পরিচর্যা, নতুন চারা সংগ্রহ এবং রোপণের জন্য নিয়মিত অর্থের প্রয়োজন হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সব কাজ একা সামলানোও কঠিন হয়ে পড়ছে। এ কারণে নতুন করে নার্সারি প্রতিষ্ঠা এবং বিদ্যমান বাগানগুলোর পরিচর্যায় সহযোগিতা পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন তিনি।

তার কাছে গাছের মূল্য শুধু কাঠ, ফল কিংবা ছায়ায় সীমাবদ্ধ নয়। একটি গাছ বেঁচে থেকে যত দিন মানুষের উপকার করবে, তত দিন এর মাধ্যমে সওয়াব পাওয়ার সুযোগ থাকবে- এমন ধর্মীয় বিশ্বাস থেকেই তিনি বৃক্ষরোপণকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দেখেন। মসজিদের ধর্মীয় আলোচনা ও জুমার খুতবায়ও মুসল্লিদের গাছ লাগাতে উৎসাহিত করেন।

ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিবেশ রক্ষার সাধনা

বাবুল হুজুরের বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমের বিশেষত্ব হলো, এটি কোনো বড় প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের উদ্যোগে শুরু হয়নি। নিজের সম্পদ, শ্রম ও সময় ব্যয় করে তিনি এই কাজ এগিয়ে নিয়েছেন। নার্সারি প্রতিষ্ঠা, চারা বিতরণ, সড়কের পাশে গাছ লাগানো এবং নিজস্ব জমিতে বিভিন্ন প্রজাতির বাগান গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তার উদ্যোগ বিস্তৃত হয়েছে।

তার লাগানো গাছগুলো এখন বড় হয়ে উঠছে। কোনোটি ছায়া দিচ্ছে, কোনোটি ফল দিচ্ছে, আবার কোনোটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখছে। দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে তিনি দেখিয়েছেন, ব্যক্তিগত উদ্যোগও একটি এলাকার পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

তবে এই কাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার কিছু বাস্তব প্রয়োজনও রয়েছে। নতুন করে নার্সারি প্রতিষ্ঠা, চারা উৎপাদন ও সংগ্রহ এবং বিদ্যমান বাগানগুলোর পরিচর্যায় অর্থের প্রয়োজন। তার হিসাবে, এসব কাজের জন্য বড় অঙ্কের বিনিয়োগ দরকার। নিজস্ব সামর্থ্যে এত দিনের উদ্যোগ এগিয়ে নিলেও এখন সহযোগিতা পেলে কাজটি আরও বিস্তৃত করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ

দীর্ঘদিনের বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নজরে আসে। এর আগে দেশ রূপান্তরেও বাবুল হুজুরের বৃক্ষরোপণের সাফল্য নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে যোগাযোগ করা হলে ভোলা জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ঢাকায় যাওয়ার ব্যবস্থা হয় তার।

গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন রেজাউল কিবরিয়া বাবুল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টা বৃক্ষরোপণ, নার্সারি প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তার কাজের প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও জানতে চান।

ধানতারাকে বাবুল হুজুর বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমার কাজের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। ইমামতির পাশাপাশি এত বছর গাছ লাগানোর কাজ করছি জেনে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।’

তিনি জানান, নতুন করে নার্সারি প্রতিষ্ঠা এবং বিদ্যমান বাগানগুলোর পরিচর্যার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সহযোগিতার আশ্বাস দেন। সাক্ষাতের সময় তাকে প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরিত একটি সম্মাননাপত্রও দেওয়া হয় বলে জানান বাবুল হুজুর।

তার কাছে এই সাক্ষাৎ শুধু ব্যক্তিগত সম্মান পাওয়ার ঘটনা নয়; দীর্ঘদিনের কাজ চালিয়ে যাওয়ার নতুন অনুপ্রেরণাও। তিনি আশা করছেন, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে নার্সারির কার্যক্রম আবার সম্প্রসারণ করা এবং বিদ্যমান বাগানগুলোর পরিচর্যা আরও ভালোভাবে করা সম্ভব হবে।

১৯৯৪ সালে সদকায়ে জারিয়ার প্রত্যাশা নিয়ে যে বৃক্ষরোপণের যাত্রা শুরু করেছিলেন রেজাউল কিবরিয়া বাবুল, তিন দশকের বেশি সময় ধরে সেই সাধনা তাকে এনে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি। পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে গড়া নার্সারি, গ্রামের সড়কে লাগানো হাজার হাজার গাছ এবং ধর্মীয় দায়িত্বের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষার নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা তার জীবনের গল্পকে করেছে ব্যতিক্রমী। এবার সেই গল্প পৌঁছেছে প্রধানমন্ত্রীর কাছে। বাবুল হুজুরের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের এই উদ্যোগের স্বীকৃতি ও সহযোগিতার আশ্বাস কাজে লাগিয়ে আরও বেশি গাছ লাগাতে পারবেন তিনি; সবুজে সমৃদ্ধ হবে তার গ্রাম ও আশপাশের জনপদ।