সামাজিক ও মানবিক দায়বদ্ধতা থেকেই নাটকটি নির্বাচন করেছি

ভারতীয় প্রখ্যাত নাট্যকার বাদল সরকারের এক অনবদ্য সৃষ্টি ‘বাঘ’। ১৯৬৫ সালে রচিত এই নাটকটি তৎকালীন প্রেক্ষাপটে লেখা হলেও এর আবেদন আজও সমসাময়িক।

আর এ সময়োপযোগী প্রযোজনাটি আজ ২০ অক্টোবর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে মঞ্চায়িত করতে যাচ্ছে নাট্যদল ‘নাট্যপালা’। নাটকটির নির্দেশনায় রয়েছেন অভিনেতা-নির্দেশক ও দলটির প্রধান তোসাদ্দেক হোসাইন মান্না। নাটকটির নির্বাচন, নির্মাণ, সমসাময়িক থিয়েটার ভাবনা, তরুণদের কাজের মূল্যায়ন এবং দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- অপূর্ব কুমার কুন্ডু ‘বাঘ’ নাটকটি নির্বাচন এবং এর নির্মাণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাই

দীর্ঘদিন পদাতিক নাট্য সংসদে কাজ করার পর ২০২১ সালের শেষের দিকে আমরা ‘নাট্যপালা’ প্রতিষ্ঠা করি। বর্তমান থিয়েটারে কর্মী সংকট বেশ তীব্র। তাই শুরু থেকেই পরিকল্পনা ছিল কম কুশীলব নিয়ে কাজ করার। নাট্যপালার তিনটি প্রযোজনার প্রতিটিতেই দুজন করে কুশীলব রয়েছেন। বাদল সরকারের ‘বাঘ’ নাটকটি ১৯৬৫ সালের রচনা হলেও এর বক্তব্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এই নাটকে নারী কথা বলে, সমাজ ও শিশুহত্যার প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়, বই পড়ার তাগিদ দেওয়া হয় এবং যুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার অবস্থান নেওয়া হয়। মূলত সামাজিক ও মানবিক দায়বদ্ধতা থেকেই নাটকটি নির্বাচন করেছি। নাটকটি নির্মাণে আমাদের প্রায় পাঁচ মাস সময় লেগেছে। এতে আমার কন্যা অভিনয় করছে, যা তার প্রথম মঞ্চনাটক। অন্য কুশীলব হিসেবে আছেন অতিথি শিল্পী জাহিদ, যিনি প্রধান চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেছেন। মগবাজার থেকে বছিলায় নিয়মিত এসে পাঁচ মাস মহড়া চালিয়েছেন তিনি। নতুন দল গঠন করে এমন একটি কাজ নামানো আমার জন্য এক ধরনের বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমে আপনার উপস্থিতি রয়েছে। একাধিক দলের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন?

সত্যি বলতে, অন্য নাট্যদলের সঙ্গে সরাসরি কাজ খুব একটা করা হয়নি। তবে ২০২০ সালে মেঘদূত নাট্য সম্প্রদায়ের হয়ে ড. বাবুল বিশ্বাসের ‘মানুষ’ শিরোনামের একটি পথনাটকে কাজ করেছিলাম। বর্তমানে আমাদের তরুণরা দারুণ কাজ করছে। প্রবীণদের উচিত এই তরুণদের কাজের সুযোগ করে দেওয়া এবং তাদের উৎসাহিত করা। কিন্তু আক্ষেপের বিষয়, থিয়েটারের প্রবীণ বা জ্যেষ্ঠজনরা তরুণদের কাজ দেখতে আগ্রহ দেখান না। বড় বড় তারকা নির্দেশক বা নাট্যকারের কাজ ছাড়া নতুনদের কাজে যেন তাদের অনাগ্রহ কাজ করে। আমি মনে করি, তরুণদের কাজ আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখার পরিবেশ তৈরি হওয়া প্রয়োজন।

নাট্যপালার গঠন ও এর মূল ভাবনা কী?

আমাদের দলটি একেবারেই নতুন, পথচলার বয়স মাত্র পাঁচ বছর। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশ, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগকে ধারণ করেই দলটির যাত্রা শুরু। আমরা সবসময় শেকড়ের সন্ধানে থেকে মৌলিক নাটকের চর্চা চালিয়ে যেতে চাই।

মাত্র দুজন চরিত্র নিয়ে নাটক নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণ কেমন?

কর্মী সংকটের বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা এক বা দুই চরিত্রের নাটক নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিই। শুরুতে সংশয় ছিল, মাত্র দুজন শিল্পী পুরো নাটকের রস ধরে রাখতে পারবেন তো? সেই ভয় থেকে মুক্তি পেতে আমরা পাঁচ মাস টানা শ্রম দিয়েছি। আমাদের দুই শিল্পী জাহিদ ও প্রমা দর্শককে ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন। দর্শক ও নাট্যবোদ্ধাদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়াও পেয়েছি। তাছাড়া আলোকসম্পাত, সংগীত, মঞ্চসজ্জা ও পোশাক নির্দেশনায় যারা কাজ করেছেন, তাদের সম্মিলিত চেষ্টার ফলেই এই সফলতা সম্ভব হয়েছে।

আজ জন্মদিন। বিশেষ এই দিনে নিজের নির্দেশিত নাটকের মঞ্চায়ন হচ্ছে। কেমন লাগছে?

জন্মদিনে আনন্দ থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে এবারের দিনটি একেবারেই বিশেষ। বাদল সরকারের লেখা এবং আমার নির্দেশিত নাটকের প্রদর্শনী হচ্ছে আজ। এটি দারুণ এক প্রাপ্তি। অবশ্য কেমন হবে তা নিয়ে কিছুটা মানসিক চাপও কাজ করছে। আমি সবসময় পরিবারের সবাইকে নিয়ে দিনটি উদযাপন করি। আজ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি আমার বাবা-মায়ের প্রতি, যাদের কারণে সবুজে ঘেরা, নদীমাতৃক এ দেশে আমার জন্ম হয়েছিল।

দলের আগামী দিনের পরিকল্পনা কী?

নাট্যপালা মৌলিক প্রযোজনায় বিশ্বাসী। সেই ধারাবাহিকতায় আগামী বছর দুটি নতুন মৌলিক নাটক মঞ্চে আনার পরিকল্পনা চলছে, যার একটি আমার নিজের লেখা একক নাটক। পাশাপাশি দুটি নতুন পথনাটক নির্মাণের কাজও এগিয়ে চলেছে।