ডিজিটাল যুগে কমছে লোকশিল্পীর কদর, মানবেতর জীবন রইচ উদ্দিনের

শারীরিক অসুস্থতা আর অভাব-অনটন নিত্যদিনের সঙ্গী, তবুও বেঁচে থাকার তাগিতে হাতে তুলে নিয়েছেন দোতারা। বলছি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছানো রইচ উদ্দিনের কথা। শেষ বয়সে এসে অন্য কোনো কাজ করার সামর্থ্য না থাকায় পথপ্রান্তে কিংবা ট্রেনে-বাসে গান গেয়েই কোনো রকমে দিনাতিপাত করছেন এই শিল্পী।

​স্থানীয় সূত্র জানায়, একসময় রইচ উদ্দিনের কণ্ঠে গান শুনতে মানুষ ভিড় জমাত। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় আর জীবনসংগ্রামের নির্মম বাস্তবতায় আজ তিনি নিঃস্ব। বয়স বাড়ার সাথে সাথে জুটছে না কোনো স্থায়ী কাজের সুযোগ। বাধ্য হয়েই সুরের জাদুকে উপার্জনের একমাত্র
মাধ্যম বানিয়ে পথে পথে ঘুরে গান করেন তিনি। শ্রোতাদের দেয়া দু-দশ টাকার ক্ষুদ্র সাহায্যেই কোনো মতে চলে তার ও তার পরিবারের এক বেলা-দুই বেলার আহার।

ক্ষোভ ও আক্ষেপ নিয়ে রইচ উদ্দিন বলেন, রেডিওর যুগ থেকে রাস্তা ঘাটে গান গেয়ে বেড়ান তিনি। আগে বিভিন্ন জায়গায় গান গেয়ে ভালো আয় রোজগার করলেও এখন আর আগের মত শরীরে বল পান না তিনি, তবে পেটের খিদে তো আর বয়স বোঝে না। গান গাইতে মন না চাইলেও বাঁচার তাগিদে গান গেয়ে যাচ্ছেন তিনি।

তিনি বলেন, ঘরে স্ত্রী আর একটি সন্তান। তাদের মুখে দুমুঠা ভাত তুলে হিমশিম খেতে হয় তার। তিনি জানান, শেষ কোরবানি ঈদে গরুর মাংস
দিয়ে ভাত খেয়েছেন তিনি। এখন পর্যন্ত একটি বয়লারও জোটেনি তার। তিনি বলেন, শুক্র ও শনিবার রুপপুর পারমাণবিক, হাডিঞ্জব্রিজে ও পাকশী রেলস্টেশনে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের গান শুনান। সারাদিন দর্শনার্থীদের গান শুনিয়ে এক দেড়শো টাকা আয় রোজগার করেন তিনি।
এই দিয়েই কোন রকমে জীবিকা নির্বাহ করে বেঁচে আছেন রইচ উদ্দিন।

রইচ উদ্দিন জানান, ডিজিটাল যুগে আমাদের মত শিল্পীদের গান আর কেউ শুনতে চান না। তিনি জানান, অনেকে গান গাইতে বলে টাকা না দিয়েই চলে যান। কেউ বা মোবাইলে শুধু ভিডিও করেন, কিন্তু কেউ সাহায্য করেন না। তিনি জানান, বর্তমানে কোনো সরকারি সুযোগ সুবিধা বা ভাতা পাচ্ছেন না তিনি।

স্টেশনের বাদাম বিক্রেতা সালাম জানান, সাধারণত সপ্তাহের শুক্র-শনিবারে স্টেশনে আসেন তিনি। সারাদিন দোতারা হাতে নিয়ে গান গিয়ে যে দুই পয়সা রোজগার করেন তা দিয়েই কোনোরকমে দিনাতিপাত করেন তিনি।

চা দোকানি বাবু শেখ জানান, প্রতিদিন প্রায় ১০-১৫ কিমি পথ হেঁটে ঈশ্বরদী আসেন রইচ উদ্দিন। ছোট থেকেই দুই চোখে সমস্যা তার। এরপরও ভিক্ষা না করে মুর্শিদি, বাউল, লালন, পল্লীগীতি, ভাওয়াইয়া গান করে আয় রোজগার করেন তিনি। রইচ উদ্দিনের মতো লোকশিল্পীদের জীবনসংগ্রাম আজ স্থানীয় সচেতন মহলের নজর কেড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, জীবন শেষ সময়ে এসে এই পথশিল্পী যেন একটু শান্তিতে ও মানবেতর জীবন থেকে মুক্তি পেতে পারেন, সেজন্য বিত্তবান ও সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দ্রুত এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করেন তারা।

ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) হাসান মোহাম্মদ শোয়াইব বলেন, তিনি কোনো সরকারি ভাতা পাচ্ছেন কিনা- তা আমার জানা নেই। তবে তিনি ভাতা না পেয়ে থাকলে আবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।