যে বাংলাদেশ গড়ার জন্য দেশের মানুষ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন সময় অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন সেই কাক্সিক্ষত বাংলাদেশ গড়তে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, আমরা যে ধর্মেরই হই না কেন এদেশে জন্ম নিয়েছি এদেশে বড় হয়েছি- আমাদের একমাত্র পরিচয় আমরা বাংলাদেশী। এই দেশের ওপর আমাদেও প্রত্যেকের সমান অধিকার রয়েছে। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) চট্টগ্রামের জে এম সেন হলে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মত বিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মানুষ জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছিল। যুদ্ধের মাধ্যমে এই প্রিয় মাতৃভূমিকে তারা ছিনিয়ে এনেছে। সেদিন শত হাজার লক্ষ মানুষ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। কয়েক লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছে। যারা যুদ্ধ করেছিলেন যারা শহীদ হয়েছিলেন সেদিন আমরা দেখিনি কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ আর কে খৃষ্টান।
সেদিন আমরা কারো ধর্ম দেখিনি, শুধু দেখেছি তারা মুক্তিযুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছে। এই স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময় গণতন্ত্র হুমকির সম্মুখিন হয়েছে এবং তখনও ছাত্র জনতাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীরা রাজপথে নেমে এসেছিল গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য, জনগণের কথা বলার ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য। সেদিনও কিন্তু আমরা দেখিনি আমার পাশের কর্মিটা কোন ধর্মের। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে এদেশের ছাত্র-জনতা এক স্বৈরাচারকে বিদায় দিয়েছে। সারাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ সেদিন রাজপথে বেরিয়ে এসেছিলেন। বিভিন্ন বয়সের মানুষ, মা বোনেরা, তরুণ, যুবক, শিশুরা সেদিন বেরিয়ে এসেছিলেন। সেদিন আমরা কেউ জিজ্ঞেস করিনি গুলি খাওয়া মানুষটা কি মুসলমান নাকি হিন্দু। স্বৈরাচার গুলি করে ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছে, আমার ভাই শহীদ হয়েছে আমার ভাই আহত হয়েছে। সবাই তাদের ধরাধরি কেের হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছে। যাবার পথে কেউ জিজ্ঞেস করেনি কী তার ধর্ম পরিচয়?
তিনি বলেন, এদেশ আপনার-এদেশ আমার, এদেশ আমাদের সকলের। আমরা যে ধর্মেরই হই না কেন প্রত্যেকটা মানুষ আমরা বাংলাদেশী। এদেশে জন্ম নিয়েছি এদেশে বড় হয়েছি- আমাদের একমাত্র পরিচয় আমরা বাংলাদেশী। এই দেশের আইন আমার জন্য যেভাবে প্রযোজ্য আপনার জন্যও সেভাবে প্রযোজ্য। এই দেশের আমার যে অধিকার আছে আপনারও সেই অধিকার আছে। এই রাষ্ট্র আপনাকে যা দেবে আমাকেও তা দেবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ, বিভিন্ন সময় গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন, চব্বিশের গণ অভ্যুত্থান- সবকিছুরই একটাই লক্ষ্য ছিল এমন একটি বাংলাদেশ গড়া যেখানে আমরা সকলে মিলেমিশে শান্তিতে বসবাস করবো। আসুন আমরা সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে সেই বাংলাদেশ গড়ে তুলি। যে বাংলাদেশের জন্য বিভিন্ন সময় দলমত নির্বিশেষে আমরা অকাতরে রক্ত দিয়েছি। সেই বাংলাদেশ গড়ার জন্য আমরা দলমত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সকলের সহযোগিতা চাই। আপনি যে ধর্মেরই হোন আপনার সহযোগিতা ছাড়া আমরা কাক্সিক্ষত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারবোনা। কাক্সিক্ষত বাংলাদেশ গড়তে সকলের সহযোগিতা চাই।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ^র চন্দ্র রায়, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ, সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিজন কান্তি সরকার।
অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্যে চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক অর্পন ব্যানার্জি বলেন, দীর্ঘ ৫৫ বছর ধরে আমাদের একটি দলের লোক বলে আখ্যায়িত করা হতো। বিগত ১২ ফেব্রæয়ারির নির্বাচনে আমরা প্রমাণ করে দিয়েছি আমরা কোন দলের লোক নই। আমরা এদেশকে ও ৭১কে ভালবাসি এবং আমরা জানি বিএনপি মুক্তিযোদ্ধার দল। ১২ ফেব্রæয়ারির নির্বাচনে ৯৫% সনাতনী ভোটার ভোট কেন্দ্রে গিয়ে সেটা প্রমাণ করেছে।
তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর আমরা আতংকিত অবস্থায় ছিলাম। ওই সময় বিএনপি নেতাকর্মীরা আমাদের পাশে থেকে মন্দির পাহারা দিয়েছেন। যে কারণে চট্টগ্রাম মহানগরীতে কোন সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস হয়নি। তিনি সীতাকুন্ডে ধর্মীয় তীর্থস্থান চন্দ্রনাথ ধামকে জাতীয়করণ, বোয়ালখালীতে মেধস মুনি আশ্রমের উন্নয়ন, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টকে হিন্দু ফাউন্ডেশনে রূপান্তর ও সনাতনী সম্প্রদায় সুরক্ষা বোর্ড গঠনের দাবি জানান।
এর আগে রাজশাহী থেকে একটি সামরিক বিমানে রাত ৭টা ৩৬ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসেন। সেখান থেকে সড়কপথে সরাসরি জে এম সেন হলে পৌঁছেন। প্রধানমন্ত্রীকে এক নজর দেখতে মঙ্গলবার সন্ধ্যার আগে থেকে বিভিন্ন স্থান থেকে নগরীর জে এম সেন হল সংলগ্ন এলাকায় বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী, বিভিন্ন বয়সের নারী-শিশুসহ হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমায়। এসময় মানুষের ভিড় সামাল দিতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সীমাহীন বেগ হতে হয়। রাত সাড়ে আটটা বিশ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বাসটি অনুষ্ঠানস্থলের কাছে এসে পৌঁছলে উপস্থিত জনতা মুহুর্মুহু শ্লোগানে তাঁকে স্বাগত জানান। এসময় বাস থেকে হাত নেড়ে জনতাকে শুভেচ্ছা জানান তারেক রহমান।
চট্টগ্রামে দুর্গাপূজার অনুষ্ঠানে দেশের কোন সরকার প্রধানের এটিই প্রথম উপস্থিতি। যে কারণে প্রধানমন্ত্রীর এই কর্মসূচীকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের সনাতনী সমাজের মধ্যে ছিল অন্যারকম উৎসাহ উদ্দীপনা। জে এম সেন হলের অনুষ্ঠান থেকে প্রধানমন্ত্রী হোটেল রেডিসনে যান। সেখানে দলীয় নেতাদের সঙ্গে তাঁর সাংগঠনিক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।