প্রতি বছর শরতে দেবী দুর্গার আগমন ঘটে। শুরু হয় শারদোৎসব, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ও বড় উৎসব। দেবী দুর্গা বিভিন্ন বাহনে আসেন। যানও বিভিন্ন বাহনে। কখনো ঘোড়া, কখনো দোলা বা কখনো হাতিতে চড়ে দেবী দুর্গা আসেন। শরতে কাশফুল, শিউলি ফুল ফুটে, তখন থেকেই শুরু হয় দেবী দুর্গার আরাধনা। মূলত পূজা শুরু হয় ষষ্ঠীর মাধ্যমে। এরপর মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী ও মহানবমী পেরিয়ে দশমীতে দেবী দুর্গা বিদায় নেবেন। বিজয়িনীর আগমনে সুন্দর প্রকৃতি ভেসে উঠেছিল ধরাধাম। তখন নীল আকাশে দেখা যায় সাদা মেঘ, শিউলি ফুলের সুবাস। কাশফুলের দোলা আমাদের যেন মোহাচ্ছন্ন করে। দুর্গাপূজায় যেসব জিনিস ব্যবহৃত হয়, তা অন্যরকম পরিবেশগত বার্তা দেয়। আজ দেবীর বিদায়ের দিন। আবার আসবেন তিনি আগামী বছর।
দেবী দুর্গাকে বানানো হয় মাটি দিয়ে- যে মাটিই হলো, মা। পরমা প্রকৃতি। এই মাটির সঙ্গে ব্যবহার করা হয় খড়, সুতলি ও আঠা। পূজার পরে আবার তা বিসর্জন দেওয়া হয় জলাশয়ে। মাটির সঙ্গে মাটি মিশে যায়। এসব উপাদানের কোনোটিই পরিবেশের ক্ষতি করে না। সপ্তমী পূজার পূর্বে দেবীর প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয় কলা বউকে। যিনি নবপত্রিকা। দেবীর এই প্রতীক তৈরি করা হয় নয়টি গাছের পাতা ও লতা দিয়ে। যে নয়টি গাছের পাতা ব্যবহার করা হয় তা হলো কলা, হলুদ, জয়ন্তী, বেড়েল, বেদানা, অশোক, মান ও ধান। পূজার এই শুরুটিই প্রকৃতি ও কৃষির গুরুত্বকে বাড়িয়ে দেয়। যে গাছগুলো এখানে ব্যবহার করা হচ্ছে তা ঔষধি গুণসম্পন্ন। এসব গাছ পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষায় উপযোগী। প্রাচীনকাল থেকেই পূজায় এসব গাছের ব্যবহার মনে করিয়ে দেয়
প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের চিত্রকে। একই সঙ্গে এই আচারের মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্বও বহন করে। দেবী দুর্গার বাহন হলেন সিংহ। যেহেতু মা দুর্গার বাহন সিংহ, মা দুর্গার সঙ্গে কিন্তু সিংহ প্রাণীটিও পূজিত হয়। তাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। সিংহকে রক্ষার বিষয়টি এভাবে যেমন তৈরি হয়, আবার নানা জীবজগৎ ও পশুপাখির সঙ্গে শাস্ত্রীয় বিভিন্ন রূপকল্পে দেবী দুর্গার সম্পর্ক রয়েছে। এসব সম্পর্ক জীববৈচিত্র্যকে টিকিয়ে রাখার বার্তা দেয়।
যে শক্তির প্রবাহ, পুষ্টি প্রবাহের কথা আমরা বলি; শক্তি এক রূপ থেকে শুধু অন্য রূপে রূপান্তরিত হয়। আবার সেই পূর্বের অবস্থানে ফিরে আসে। পুষ্টিও তাই। উদ্ভিদ মাটি থেকে পুষ্টি সংগ্রহ করে। উদ্ভিদ খেয়ে সেই পুষ্টি পায় প্রাণিজগৎ। আবার প্রাণিজগতের মৃত্যুর পর, তা আবার মাটিতে মিশে। দুর্গার মূর্তিও তাই। মাটির সঙ্গে মিশে গিয়ে, আমাদের প্রকৃতির এই চক্রকে সম্পূর্ণ করে। দেবী দুর্গাই বিশ্বব্রহ্মান্ডের রক্ষাকর্তা। সব সৃষ্টি জগৎকে রক্ষার দায়িত্ব তার। শ্রী শ্রী চন্ডীর একটি শ্লোকের কথা মনে করা যাক ‘যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেন সংস্থিতা/নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমো নমঃ।’ এর অর্থ যিনি সব প্রাণীর মধ্যে শক্তিরূপে অবস্থান করে, তাকে বারবার নমস্কার। সব প্রাণীর মধ্যে অবস্থান করেন মানেই তিনি প্রতিটি জীব, গাছপালা ও প্রকৃতির উপাদানের মাঝে বসবাস করেন। দেবী দুর্গাকে আরাধনা করা মানে প্রতিটি জীব, গাছপালা ও
প্রকৃতিকে আরাধনা করা, তাকে রক্ষা করা। আবার শান্তি মন্ত্রটি যদি দেখি, তাতে দেখা যায় ‘ওঁ দ্যাবৌঃ শান্তিঃ অন্তরিক্ষং শান্তিঃ পৃথিবী শান্তিকবাপঃ শান্তিষধোয় শান্তিঃ/বনস্পতয়ঃ শান্তির্বিশ্বে দেবাঃ শান্তিব্রহ্ম শান্তিঃ শান্তিঃ সর্বং শান্তিঃ শান্তিদেব শান্তিঃ সা মা শান্তিবেধি’। অর্থাৎ, আকাশ শান্তিপূর্ণ হোক, মহাশূন্য ও অন্তরীক্ষ শান্তিপূর্ণ হোক, পৃথিবী শান্তিপূর্ণ হোক, জল ও ঔষধি শান্তিপূর্ণ হোক। বনস্পতি ও গাছপালা আমাদের জন্য শান্তি বয়ে আনুক। সমগ্র পরিবেশের প্রতিটি উপাদান সুস্থ থাকুক।
প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে প্রকৃতির মধ্যে তিনি বিলীন হন এবং তার শক্তি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে দর্পণে দেবীর যে পূজা করা হয়, তার মূলে রয়েছে শক্তির চিরন্তনতা। রূপের বিনাশ হলেও, শক্তির বিনাশ নেই। শাস্ত্রমতে, এবার দেবী দুর্গা কৈলাস থেকে সপরিবারে মর্ত্যে এসেছিলেন ঘোড়ায় ও গমন করবেন নৌকায়। যেহেতু দুর্গাপূজা প্রাচীনকাল থেকে এমন বার্তা নিয়ে আসছে যে, দুর্গাই প্রকৃতি আবার দুর্গাই
প্রকৃতির রক্ষাকর্ত্রী; সেহেতু দুর্গাপূজায় পরিবেশের বিষয়টি ভাবা উচিত। ভারতে পরিবেশকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেখানে মাটির প্রতিমা তৈরির ক্ষেত্রে খেয়াল রাখা হয়েছে কেমিক্যালযুক্ত রঙ ব্যবহার হয়েছে কিনা। রঙ ব্যবহারের ক্ষেত্রে খড়িমাটি, হলুদ, পালংশাক ইত্যাদি উজ্জ্বল উপাদান ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রতিমায় যে মাটি ব্যবহার করা হয় সেই মাটি যেন সহজে জলের সঙ্গে মিশে যায়, সেই ধরনের মাটি তারা ব্যবহার করেছে। অনেক ম-পে প্লাস্টিকের গ্লাস, চামচ, পলিথিন ইত্যাদির ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিলো। বিসর্জনের সময় যে বেল, ফুল বা পাতা ব্যবহার করা হয় তা ব্যবহার করে জৈব সার তৈরি হচ্ছে। পূজার থিম হিসেবে- প্রকৃতির সুরক্ষা, গ্লোবাল ওয়ার্মিং, গাছ লাগানো ইত্যাদি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। দেবী দুর্গা আমাদের রক্ষা করেছিলেন অসুর বধ করে। পরিবেশ দূষণ, গাছ কাটা ও দূষণে যে বা যারা যুক্ত, তাদের মূলোৎপাটন করতে হবে- শুভ বিজয়া, পৃথিবীর সমস্ত মানুষের মঙ্গল হোক।
লেখক : গবেষক ও পরিবেশকর্মী
mitra_bibhuti@yahoo.com