অর্থনৈতিক স্পিলওভার নাকি রেজিম চেঞ্জ

সমকালীন বিশ্বরাজনীতির নাট্যমঞ্চে ইউরোপ আজ অভূতপূর্ব অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফ্রান্সের প্যারিস থেকে শুরু করে ইতালির রোম, স্পেনের মাদ্রিদ কিংবা আলবেনিয়ার তিরানা, একের পর এক দেশের রাজপথ আজ উত্তাল। আপাতদৃষ্টিতে বিক্ষোভগুলোকে বিচ্ছিন্ন অভ্যন্তরীণ সংকট মনে হলেও, এর বিস্তার ও তীব্রতা বিশ্বজুড়ে গভীর শঙ্কা ও প্রশ্ন তৈরি করেছে। প্রশ্নটি হলো, সর্বব্যাপী অস্থিরতা কি কেবল বিশ্বঅর্থনীতি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো দীর্ঘস্থায়ী সংকটের অনিবার্য অর্থনৈতিক ‘স্পিলওভার’ বা পার্শ্ব-প্রভাব, নাকি এর নেপথ্যে কাজ করছে বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী নকশা বা ‘রেজিম চেঞ্জ’ অপারেশন? রাজনীতি ও ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষকরা আজ জটিল সমীকরণের চুলচেরা বিশ্লেষণে লিপ্ত। কারণ সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যেখানে রাজপথে আছড়ে পড়ছে, সেখানে এক অদৃশ্য শক্তির ছায়া লক্ষ করা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি বুঝতে হলে, আমাদের ‘কূটনৈতিক’ শব্দের আড়াল সরিয়ে বাস্তব রাজনীতির নির্মম জমিনে দাঁড়িয়ে ঘটনার অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহরের রাজপথের অস্থিরতা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামগ্রিক স্থায়িত্বের গভীর সংকট প্রমাণ করে, এই অসন্তোষের দাবানল অতি দ্রুত পুরো মহাদেশের ওপর শক্তিশালী থাবা বসাচ্ছে এবং বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর মনস্তাত্ত্বিক ছায়াযুদ্ধকে নতুন মাত্রায় উন্নীত করছে। সংকটের প্রথম এবং সবচেয়ে দৃশ্যমান স্তরটি নিঃসন্দেহে অর্থনৈতিক। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী যে ভূ-রাজনৈতিক মেরূকরণ ঘটেছে, তা সমগ্র ইউরোপের অর্থনীতিকে এক অনির্দিষ্টকালের ব্ল্যাকহোলে নিক্ষেপ করেছে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিটজ এবং ফরাসি অর্থনীতিবিদ থমাস পিকেটির মতো চিন্তাবিদদের বিভিন্ন বার্ষিক পর্যবেক্ষণে বারবার উঠে এসেছে যেÑ যুদ্ধ কেবল রণক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা দূরবর্তী সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত গ্রাস করে। ইউরোপ এতকাল রাশিয়ার যে সস্তা জ্বালানির ওপর ভর করে শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছিল, যুদ্ধের কারণে সেই উৎস রাতারাতি বন্ধ হয়েছে। ফলে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন মূল্যস্ফীতি, যা জীবনযাত্রার ব্যয়কে আকাশচুম্বী করে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দিয়েছে। স্পেনে বাড়িভাড়া এত বেড়েছে যে, তরুণ প্রজন্ম সাধ্যের মধ্যে আবাসন না পেয়ে রাস্তায় তাঁবু খাটিয়ে প্রতিবাদী বিক্ষোভ প্রকাশ করতে বাধ্য হচ্ছে। পর্তুগাল, বেলজিয়াম এবং ইতালিতে আবাসন ও শিক্ষা খাতের বাজেট সংকোচনের বিরুদ্ধে মানুষ ফুঁসে উঠছে। তাদের ক্রয়ক্ষমতা এখন এতটা সীমিত, মধ্যবিত্ত সমাজ দৈনন্দিন মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে যা তাদের ক্ষোভকে অনিয়ন্ত্রিত বিদ্রোহের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং পুরো ইউরোপীয় বন্ড মার্কেটকে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিচ্ছে।

জনগণের এই ক্ষোভের আগুনে সবচেয়ে বড় ঘি ঢেলেছে, তাদের নির্বাচিত সরকারগুলোর একচোখা নীতি। একদিকে যখন দেশের সাধারণ নাগরিক নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামের সঙ্গে লড়তে লড়তে ক্লান্ত, কর্মসংস্থান হারিয়ে জীবিকা নির্বাহের ন্যূনতম উপায় খুঁজছে, তখন ইউরোপের সরকারগুলো এবং ন্যাটো জোট দূর দেশের প্রক্সি বা ছায়াযুদ্ধে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অর্থ ও আধুনিক সমরাস্ত্রের জোগান দিচ্ছে। ঘরের মানুষকে চরম আর্থিক কষ্টের মধ্যে রেখে ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য টিকিয়ে রাখার এই যুদ্ধবিলাসকে সাধারণ মানুষ সহজে মেনে নিতে পারছে না। বিখ্যাত আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক জন মিয়ারশাইমার তার ‘অফেনসিভ রিয়েলিজম’ বা আক্রমণাত্মক বাস্তববাদ তত্ত্বে যেমনটি দেখিয়েছেন, পরাশক্তিগুলো সবসময় নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তাকে জনগণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়। ইউরোপের বর্তমান রাজপথ সেই তত্ত্বের জীবন্ত পরীক্ষাগার, যেখানে সাধারণ মানুষ নিজেদের ট্যাক্সের টাকার হিসাব চাচ্ছে এবং যুদ্ধের পেছনে সরকারের সীমাহীন খরচের নীতিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করছে। করদাতার কষ্টের অর্থ যখন দেশের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের উন্নয়ন বাদ দিয়ে সামরিক খাতে অপচয় হয়, তখন জনগণের ক্ষোভ সরকারের গণতান্ত্রিক বৈধতাকে বড় ধরনের সংকটের মুখে দাঁড় করায়। তবে এই ক্ষোভের পেছনে কেবল অর্থনৈতিক বঞ্চনা একমাত্র চালিকাশক্তি, এমন সরল বিশ্বাস বর্তমান বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে খণ্ডিত। এখানেই প্রবেশ ঘটে গভীর রাষ্ট্র বা ‘ডিপ স্টেট’ নেটওয়ার্কের সুনির্দিষ্ট আশঙ্কার, যা অতীতে ‘কনস্পিরেসি থিওরি’ বা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বলে উড়িয়ে দেওয়া হলেও, বর্তমানে তা রূঢ় বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে। ফরাসি দার্শনিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মিশেল ফুকোর সমাজ প্রকৌশল বা ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ তত্ত্বের আলোকে বোঝা যায়, কীভাবে পুঞ্জীভূত গণঅসন্তোষকে সুনির্দিষ্ট স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যবহার করে। ইতিহাস সাক্ষী, কোনো দেশে যখন অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হয়, তখন রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক অদৃশ্য নেটওয়ার্কগুলো সক্রিয় হয়। ফ্রান্সে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনা ও জ্বালানির দাম নিয়ে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন যখন দ্রুত পুরো সরকারকে উপড়ে ফেলার সহিংস দাবিতে রূপ নেয়, কিংবা আলবেনিয়ায় পরিবেশ রক্ষা ও দুর্নীতির আন্দোলনের আড়ালে যখন সরাসরি প্রধানমন্ত্রী এডি রামার পদত্যাগের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হয়, তখন তাকে শুধু স্বতঃস্ফূর্ত নাগরিক আন্দোলন বলা কঠিন। বড় বড় পরাশক্তির ছায়াযুদ্ধ আজ মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদমকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের অভিমুখকে সম্পূর্ণ বদলে দিচ্ছে এবং সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক পালাবদলের পথ প্রশস্ত করছে। 

বিখ্যাত মার্কিন লেখিকা ও সমাজকর্মী নাওমি ক্লেইন তার ‘দ্য শক ডকট্রিন’ বা ‘দুর্যোগ পুঁজিবাদ’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, বড় বড় সংকট বা বিপর্যয়গুলোকে অতি-প্রভাবশালী থিংকট্যাংক এবং বৈশ্বিক অভিজাত গোষ্ঠীগুলো সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে। তারা একটি ‘নিয়ন্ত্রিত বিশৃঙ্খলা’ বা কন্ট্রোলড ক্যাওস তৈরি করে, যার মূল লক্ষ্য থাকে বিদ্যমান শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করা, যাতে সেই দেশে এমন একটি ব্যবস্থা বা রেজিম প্রতিষ্ঠা করা যায়, যা তাদের ভূ-রাজনৈতিক এজেন্ডা এবং একচেটিয়া বাজার দখলের পক্ষে কাজ করবে। ইউরোপের আন্দোলনগুলোতে আমরা দেখছি সাধারণ মানুষ হয়তো রাস্তায় নেমেছে রুটি-রুজির ন্যায্য দাবিতে, কিন্তু আন্দোলনের রশি যাচ্ছে এমন রাজনৈতিক শক্তির হাতে, যারা একে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। সোশ্যাল মিডিয়ার সুনির্দিষ্ট অ্যালগরিদম, বিপুল তহবিলের জোগান এবং আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন সেইসব গবেষক, যারা পৃথিবীকে গবেষণার মাঠ এবং সাধারণ মানুষকে গিনিপিগ বানিয়ে ফেলেছেন। এই  বৈশ্বিক নেটওয়ার্কগুলো সমাজে এমন মনস্তাত্ত্বিক ও শাসনতান্ত্রিক চাপ তৈরি করে, যার ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে সার্বভৌমত্ব ও অধিকার বড় করপোরেশনের মুনাফা এবং নজরদারি ব্যবস্থার হাতে তুলে দেয়। কিন্তু এই জটিল সমীকরণের সবচেয়ে অন্ধকার এবং দুঃখজনক দিক হলো, আন্দোলনের নামে পরিচালিত অভূতপূর্ব সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞ। অসন্তোষ যতই তীব্র বা যৌক্তিক হোক না কেন, ক্ষোভ প্রকাশের নামে রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত সম্পদ ধ্বংস করা, সরকারি-বেসরকারি অফিস ভবনে অগ্নিসংযোগ, দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাট কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ড আন্দোলনের ভাষা হতে পারে না। এই ধ্বংসাত্মক কাজ কোনো অধিকার আদায় করে না, বরং সাধারণ মানুষের কষ্ট বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। যে হাসপাতাল, বিদ্যালয় বা গণপরিবহন পোড়ানো হচ্ছে, তা পুনরায় মেরামত করতে শেষ পর্যন্ত সাধারণ করদাতাদের টাকাই অপচয় হবে। তাছাড়া, এ ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড মূল অর্থনৈতিক দাবিগুলোকে আড়ালে ঠেলে দেয় এবং সরকারকে কঠোর দমনপীড়নমূলক আইন প্রণয়নের অজুহাত আনে। ফলে শান্তিকামী সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অধিকারের লড়াই, কিছু দুষ্কৃতকারী বা বহিরাগত উসকানিদাতার কারণে নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা হারায়। সমাজ ও রাষ্ট্রের স্তম্ভগুলোকে এভাবে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়ার মধ্যে প্রকৃত কল্যাণ আসতে পারে না, বরং নৈরাজ্যকে আরও স্থায়ী রূপ দেয় এবং সাধারণ নাগরিকদের জীবনকে এক চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ফেলে।

ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়া দাবানল একদিকে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্ল্যাকহোল থেকে উৎপন্ন তীব্র অর্থনৈতিক স্পিলওভার, অন্যদিকে সংকটকে পুঁজি করে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্র্নির্ধারণের রেজিম চেঞ্জ খেলা। ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলে, নিজেদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছে পর্দার পেছনের শক্তিশালী খেলোয়াড়রা। পৃথিবী আজ গভীর সংকটের মুখোমুখি, যেখানে শান্তি ও মানবতা ক্ষমতার চরম লোভের কাছে জিম্মি। এই উত্তাল সময়ে কেবল আবেগ দিয়ে নয়, বরং গভীর যুক্তি ও দূরদর্শিতায় বিশ্বরাজনীতির চালগুলো বুঝতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ কখনো পরাশক্তিগুলোর দাবার ঘুঁটি বা পরীক্ষাগারের গিনিপিগ না হয়। ধ্বংসের বিরুদ্ধে এবং প্রজ্ঞার পক্ষে দাঁড়নো জ্বলন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় তাগিদ। মনে রাখতে হবে, পৃথিবীর কোনো যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত শান্তি আনে না। বরং সাধারণ মানুষের রক্ত ও কান্নার বিনিময়ে শুধু নির্দিষ্ট অদৃশ্য শক্তির আধিপত্যকে দীর্ঘস্থায়ী করে।

লেখক : কবি, অনুবাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক