শিশুদের ওসিডি

ওসিডি’র চিকিৎসা অপেক্ষাকৃত দীর্ঘমেয়াদি হয়। ওষুধ এবং সাইকোথেরাপির মাধ্যমে  রোগিকে সুস্থ করা যায় পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র রাব্বি। হঠাৎ করে তার মনে হয় ‘হিসু’ করার সময়ে তার গায়ে লেগে থাকছে বা কাপড়ে লেগে যাচ্ছে। এ কারণে বারবার কাপড় পরিবর্তন করতে হয়। একবার পরিবর্তন করার পর মনে হয় এটাতেও বোধহয় ‘হিসু’ লেগে আছে ফলে আবার পরিবর্তন করতে হয় এবং কাপড়গুলো না ধুয়ে আর পরতে পারে না। রাব্বি অনেকবার হাত ও পা ধুতে থাকে কারণ তার কাছে মনে হয় হাতে বা পায়ে হিসু লেগে আছে। এতে বাবা-মায়ের তো কষ্ট হচ্ছেই উপরন্তু তার লেখাপড়াও মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। বেশির ভাগ সময়ই চলে যাচ্ছে ‘পরিষ্কার’ হতে গিয়ে।

অন্য দিকে নবম শ্রেণির ছাত্রী মারিফার মনে হয় তাকে সব কিছু সব সময় গুছিয়ে রাখতে হবে। টেবিলের বইগুলোসহ সব জিনিস নিয়মমাফিক সাজিয়ে রাখতে হবে। একটু ওলট-পালট হলেও ভীষণ রকম অস্বস্তি শুরু হয়ে যায় তার মধ্যে এবং সেটি ‘সম্পূর্ণ ভালোভাবে’ না গুছিয়ে অন্য কিছু করতে পারে না। যেমন পড়ানোর জন্য স্যার এসে বসে থাকেন কিন্তু সে টেবিল গোছাতেই থাকে। প্রথম দিকে পরিবারের সদস্যরা মনে করত পড়ায় ফাঁকি দেওয়ার জন্য টেবিল গোছাচ্ছে কিন্তু ধীরে ধীরে পরিবার বুঝতে পেরেছে শুধু স্যার এলেই এটা করে তা নয় বরং যখনই  টেবিলে কোন কিছুর পরিবর্তন হয় তখনই তাকে তা গোছাতে হয়।

রাব্বি ও মারিফার যে সমস্যাটি হচ্ছে তার নাম অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার বা সংক্ষেপে ওসিডি। এই রোগের মূল উপসর্গ হলো একই চিন্তা, মনছবি বা খারাপ কিছু করার তাড়না মনের মধ্যে অবাঞ্ছিতভাবে বারবার চলে আসা এবং একই কাজ বারবার করতে বাধ্য হওয়া।

উপসর্গ

ওসিডি’র রোগের নামেই দুটো অংশ আছে; একটি হলো অবসেশন ও অন্যটি কম্পালসন।

ক) অবসেশন: কোনো চিন্তা, মনছবি বা খারাপ কিছু করে ফেলার তাড়না শিশুর মনের মধ্যে অবাঞ্ছিত ও অযাচিতভাবে বারবার চলে আসে। অনেক সময়ে শিশু বুঝতে পারে এসব চিন্তা বা ছবি বা কাজ তার নিজেরই, তবুও তা মন থেকে সরাতে পারে না। ফলে সে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কষ্ট অনুভব করে। যেমন: জীবাণূ সংক্রমণ বা নাপাক হয়ে যাওয়ার ভয়, নির্দিষ্ট নিয়মেই সাজানো বা করার তাগিদ, নাস্তিক চিন্তা বা নাস্তিক হয়ে যাওয়ার ভয়, ধর্ম গ্রন্থকে অসম্মান করে ফেলার ভয়, যৌনসংক্রান্ত অপ্রত্যাশিত ও বিরক্তিকর চিন্তা বা মনছবি, যৌনকাজ করে ফেলার ভয়, সমকামী হয়ে যাওয়ার ভয়, কোনো ভুল কথা বলার বা ভুল করার ভয়, কোনো কিছুর হারানোর ভয়। আবার অনেকের মধ্যে লাকি বা আনলাকি নাম্বারকে অতিরিক্ত গুরুত্ব  দেওয়ার প্রবণতা কাজ করে। অনেকের মনে ধর্মগ্রন্থে লাথি দিয়ে ফেলবে বা সম্মানিত বা প্রিয় কোনো ব্যক্তিকে চড় মেরে ফেলবে এ রকম অবসেশন আসতে পারে।

খ) কম্পালসন: শিশু একই কাজ বা মানসিক ক্রিয়া বারবার করতে বাধ্য হয়। অনেক সময় তার নিজের তৈরি কঠোর নিয়ম মানতে গিয়েও বারবার কাজটি করতে বাধ্য হয়। যেমন:বারবার হাত ধোয়া, গোসলে অতিরিক্ত সময় লাগা, নিজের ব্যবহার্য জিনিস বারবার ধোয়া, মোবাইল বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক সামগ্রী ধোয়া বা মোছা অর্থাৎ যেটিই শিশুর কাছে নোংরা হয়ে গেছে বা নাপাক হয়ে গেছে বলে মনে হবে সেটিই ধোয়া বা মোছা। অনেকের  ধোয়া-মোছা করতে গিয়ে হাতে ফাঙ্গাস পড়ে সাদা হয়ে যায়।

আবার ব্যক্তির নিজের বা অন্য কারও বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাওয়ার ভয়ে তালা, চুলা বা দরজা ঠিকমতো লাগানো হয়েছে কি না তা বারবার চেক করে দেখে।

এছাড়াও আরও কিছু কম্পালসন আছে যা অন্যরা হয়তো সব সময় দেখতে পায় না। যেমন: মনের মধ্যে ‘ভালো’, ‘তওবা’ এ ধরনের কোনো শব্দ বা বাক্য বারবার বা নির্দিষ্টবার বলতে থাকা, নিজের আচরণের নগণ্য বিচ্যুতি হলেও তার জন্য বারবার অপরাধবোধ অনুভব করতে থাকা ও ক্ষমা চাওয়া, নির্দিষ্ট কিছু সংখ্যা বারবার বলা বা এড়িয়ে চলা, কোনো জিনিসে একই নিয়মে স্পর্শ করা যেমন: একজন ছাত্র আবাসিক হলের বারান্দা দিয়ে যাওয়ার সময় প্রতিটি জানালাতে স্পর্শ করতে করতে যাওয়া ইত্যাদি। শিশুরা কিছু কিছু ধর্মীয় আচার বারবার করতে থাকে কারণ তারা বিশ্বাস করে এটা না করলে তার বাবা-মায়ের ক্ষতি হবে।

চিকিৎসা

ওসিডি’র চিকিৎসা অপেক্ষাকৃত দীর্ঘমেয়াদি হয়। এর চিকিৎসা দুটি পদ্ধতির মাধ্যমে যুগপৎভাবে করতে হয়। একটি হচ্ছে ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা, যা একজন সাইকিয়াট্রিস্ট করে থাকেন এবং অপরটি সাইকোথেরাপির মাধ্যমে, যা সাধারণত একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট করে থাকেন। উপসর্গ অনুযায়ী ওষুধের ব্যবস্থাপত্র ডাক্তার সাহেব দিয়ে থাকেন। ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট সাইকোথেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসার জন্য প্রথমে শিশুর উপসর্গসহ বিভিন্ন ধরনে তথ্য নিয়ে থাকেন। এরপর কোন কোন ফ্যাক্টর তার রোগটিকে বাড়িয়ে তুলেছে বা কোন ফ্যাক্টরের কারণে রোগটি ভালো হচ্ছে না তা খুঁজে বের করেন। এরপর ক্লায়েন্ট ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট যৌথভাবে রোগ থেকে বের হওয়ার জন্য একটি স্বতন্ত্র পরিকল্পনা তৈরি করেন। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা কৌশল প্রয়োগ করে রোগটি থেকে বের হয়ে আসেন। এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হয় মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসাতে পরিবারের সহযোগিতায় ও শিশুর প্রচেষ্টায় সমস্যাগুলো দূর করে। তবে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট শিশুর চিন্তার ভুল নির্ণয় ও সংশোধনের প্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি তার উপযোগী করে তৈরি করে শিশু ও তার পরিবারকে শেখান। সেগুলো বাসাতে অভ্যাস করতে হয়। বাংলাদেশের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টরা ওসিডি চিকিৎসায় থট স্টপিং, থট রিস্ট্রাকচারিং, এক্সপোজার, ইআরপি, রিল্যাক্সেশন-সহ বিভিন্ন ধরনের মনোবিজ্ঞানিক চিকিৎসা কৌশল ব্যবহার করছেন।