নকশার নতুন গল্প

পোশাকের সৌন্দর্য কাটছাঁট কিংবা রঙের বৈচিত্র্যে আটকে নেই। নকশা, ফেব্রিকস ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনেও তৈরি হচ্ছে নতুন আকর্ষণ। মেয়েদের পোশাকে সেই পরিবর্তনের উদাহরণ কড সেট। একই নকশা ও রঙের তৈরি টপস ও বটমসের এই পোশাকে যোগ হয়েছে নানা ধরনের কাট, প্যাটার্ন, এমব্রয়ডারি এবং জামদানি মোটিফে। কখনো ঢিলেঢালা সিলুয়েট, কখনো অসমান হেমলাইন, আবার কখনো সূক্ষ্ম নকশার বুননে সাধারণ কড সেটও হয়ে উঠছে ফ্যাশনেবল। আরাম ও আভিজাত্যের সমন্বয়ে এই পোশাক জায়গা করে নিয়েছে দৈনন্দিন থেকে উৎসব আয়োজনে। লিখেছেন মোহসীনা লাইজু

নিজের স্টাইল, নিজের মতো

কড সেটের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এতে ফ্যাশন ও স্বাচ্ছন্দ্যকে আলাদা করে ভাবতে হয় না। সঠিক কাট, মানানসই ফেব্রিকস এবং ব্যক্তিগত রুচির সমন্বয়ে সাধারণ পোশাকও হয়ে উঠতে পারে আকর্ষণীয়। কেউ পছন্দ করেন সাদামাটা একরঙা সেট, কেউ আবার জামদানি মোটিফ, এমব্রয়ডারি কিংবা কনট্রাস্ট নকশায় খুঁজে পান নিজস্বতা।

নকশায় স্বাতন্ত্র্য

কড সেটের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, ওপরের পোশাক ও নিচের অংশের মধ্যে থাকে পরিকল্পিত সামঞ্জস্য। সাধারণত একই ফেব্রিকস, রং কিংবা নকশার ধারাবাহিকতায় তৈরি হয় পুরো পোশাক। ফলে আলাদা করে পোশাকের রং মেলানো কিংবা কোন টপসের সঙ্গে কোন প্যান্ট পরবেন, তা নিয়ে খুব বেশি ভাবতে হয় না। সাজের এই সহজ সমাধানই কড সেটকে জনপ্রিয় করে তুলেছে।

শুরুতে এ রকম থাকলেও এখন আর একই রঙের টপস ও প্যান্টেই সীমাবদ্ধ নেই এই পোশাক। ডিজাইনাররা এতে এনেছেন নতুনত্ব। কোথাও টপসে রাখা হচ্ছে সূক্ষ্ম নকশা, আর প্যান্টে থাকছে তারই অনুষঙ্গ। কোথাও আবার দুই অংশে একই মোটিফের ভিন্ন উপস্থাপন। ঢিলেঢালা টপসের সঙ্গে স্ট্রেইট কাট প্যান্ট, লং শার্টের সঙ্গে ওয়াইড লেগ ট্রাউজার কিংবা ছোট টপসের সঙ্গে পালাজ্জো বিভিন্ন সমন্বয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের কড সেট।

ডিজাইনে গুরুত্ব পাচ্ছে পোশাকের কাট। স্ট্রেইট কাটের পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে এ-লাইন, বক্সি কাট, ফ্লেয়ার্ড টপস এবং অ্যাসিমেট্রিক হেমলাইনের ব্যবহার। কোনো পোশাকে সামনে ছোট ও পেছনে লম্বা কাট, আবার কোনো পোশাকে দুই পাশের সিøট রাখা হচ্ছে। হাতার ক্ষেত্রেও রয়েছে বৈচিত্র্য। বেল সিøভ, পাফ সিøভ, থ্রি-কোয়ার্টার হাতা কিংবা ঢিলেঢালা ড্রপ শোল্ডার সব মিলিয়ে কড সেটে তৈরি হচ্ছে স্বাতন্ত্র্য।

জামদানির মোটিফে ঐতিহ্য

কড সেটের সাম্প্রতিক নকশায় নজর কাড়ছে জামদানি মোটিফের ব্যবহার। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রশিল্পের এই নকশা আধুনিক পোশাকে নতুন মাত্রা যোগ করছে। জামদানির ফুল, লতা, জ্যামিতিক নকশা কিংবা বুটির আদলে তৈরি মোটিফ কখনো টপসের গলার কাছে, কখনো হাতায়, আবার কখনো পোশাকের সামনের অংশে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে।

সব পোশাকে অবশ্য আসল জামদানি কাপড় ব্যবহার করা হচ্ছে, এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে জামদানি-অনুপ্রাণিত মোটিফ এমব্রয়ডারি, প্রিন্ট কিংবা বুননের মাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে। এতে ঐতিহ্যের সৌন্দর্য বজায় রেখেও পোশাকের নকশায় আনা যাচ্ছে আধুনিকতা। হালকা রঙের কড সেটে গাঢ় রঙের মোটিফ যেমন চোখে পড়ে, তেমনি গাঢ় রঙের পোশাকে সোনালি, অফ হোয়াইট কিংবা কনট্রাস্ট রঙের নকশাও তৈরি করে আভিজাত্যের আবহ। বিশেষ করে সাদা, অফ হোয়াইট, কালো, মেরুন, নেভি ব্লু কিংবা মাটির কাছাকাছি রঙের পোশাকে ঐতিহ্যবাহী মোটিফ বেশ মানানসই। যারা খুব বেশি জমকালো পোশাক পছন্দ করেন না তাদের জন্য সাদামাটা কড সেট বেশ উপযুক্ত।

নতুন ধরনের কড সেট

কড সেটের নকশায় এখন একাধিক ধারা দেখা যাচ্ছে। প্রথমেই রয়েছে কো-অর্ডিনেটেড শার্ট ও ট্রাউজার। লম্বা কিংবা মাঝারি দৈর্ঘ্যরে শার্টের সঙ্গে একই ফেব্রিকসের প্যান্ট এই সেটের বিশেষত্ব। অফিস, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় এমন পোশাক সহজেই মানিয়ে যায়। হালকা গয়না ও আরামদায়ক জুতা দিয়ে সাজ সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে।

দ্বিতীয় ধারাটি হলো কুর্তি ও প্যান্টের সমন্বয়। স্ট্রেইট কিংবা এ-লাইন কুর্তির সঙ্গে স্ট্রেইট প্যান্ট, সিগারেট প্যান্ট বা পালাজ্জো যোগ করে তৈরি করা হচ্ছে কড সেট। গলায় ছোট নকশা, হাতায় এমব্রয়ডারি কিংবা নিচের অংশে বর্ডার থাকলে পোশাকের সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়। এ ছাড়া রয়েছে শর্ট টপস ও ওয়াইড লেগ প্যান্ট, বক্সি শার্ট ও ঢিলেঢালা ট্রাউজার এবং টিউনিকের সঙ্গে মেলানো বটমস। যারা একটু ব্যতিক্রমী পোশাক পছন্দ করেন, তাদের জন্য অ্যাসিমেট্রিক কাট কিংবা কনট্রাস্ট পাইপিংয়ের কড সেটও হতে পারে পছন্দের।

উৎসবের জন্য তৈরি কড সেটে দেখা যাচ্ছে বাড়তি কাজের ব্যবহার। গলায় সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারি, হাতায় নকশা, প্যান্টের নিচে বর্ডার কিংবা কাপড়ের ওপর বুননভিত্তিক মোটিফ পোশাককে করে তুলছে বিশেষ। আবার মিনিমাল নকশার সেটও সমানভাবে আকর্ষণীয়, কারণ এতে পোশাকের কাট ও ফেব্রিকসই হয়ে ওঠে মূল সৌন্দর্য।

ফেব্রিকসে আরামের প্রাধান্য

 দেশের আবহাওয়ায় এখন পোশাক নির্বাচনের ক্ষেত্রে ফেব্রিকসের গুরুত্ব অনেক। তাই কড সেটে সুতি, লিনেন, ভিসকস, রেয়ন এবং বিভিন্ন ধরনের মিশ্র ফেব্রিকস ব্যবহার করা হয়। গরমের দিনে সুতি ও লিনেন আরামদায়ক বিকল্প। এসব কাপড় বাতাস চলাচলে সহায়তা করে এবং দৈনন্দিন ব্যবহারে স্বস্তি দেয়। লিনেনের স্বাভাবিক টেক্সচার পোশাকে এনে দেয় অনাড়ম্বর সৌন্দর্য। ভিসকস ও রেয়নের মতো ফেব্রিকস তুলনামূলকভাবে নরম এবং সুন্দরভাবে ঝুলে থাকে। ফলে ফ্লোই কাট, ওয়াইড লেগ প্যান্ট কিংবা ঢিলেঢালা টপসে এগুলো ভালো মানায়। অন্যদিকে, মিশ্র ফেব্রিকসের ক্ষেত্রে কাপড়ের গঠন, স্থায়িত্ব ও পরিচর্যার সুবিধা বিবেচনায় রাখতে হয়।

উৎসবের কড সেটে কখনো ব্যবহার করা হচ্ছে টেক্সচার-যুক্ত কাপড়, কখনো হালকা সিল্ক ফেব্রিকস কিংবা বুনন করা নকশা। তবে কাপড়ের সৌন্দর্যের পাশাপাশি আরামও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বাংলাদেশের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় অতিরিক্ত ভারী কিংবা কম বাতাস চলাচল করে এমন ফেব্রিকস দীর্ঘ সময় পরার ক্ষেত্রে অস্বস্তিকর হতে পারে।

জনপ্রিয়তার পেছনে কী

কড সেট জনপ্রিয় হওয়ার বড় কারণ এর ব্যবহারিক সুবিধা। আলাদা করে পোশাক মিলিয়ে পরার ঝামেলা কম, অথচ সাজে থাকে পরিকল্পিত সামঞ্জস্য। একই সেটের টপস অন্য রঙের প্যান্টের সঙ্গে কিংবা সেটের প্যান্ট আলাদা টপসের সঙ্গে পরা যায়। অর্থাৎ, একটি পোশাক থেকে একাধিক সাজ তৈরি করা সম্ভব।

দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য সুতি বা লিনেনের সাদামাটা কড সেট, অফিসের জন্য স্ট্রেইট কাট শার্ট ও ট্রাউজার এবং বাইরে যাওয়ার জন্য প্রিন্টেড বা মোটিফযুক্ত সেট বেছে নিতে পারেন। আবার একই পোশাক অনুষঙ্গ বদলে ভিন্ন আবহে পরা যায়। দিনের বেলায় স্নিকার্স ও টোট ব্যাগের সঙ্গে যে সেটটি মানানসই, সন্ধ্যায় সেটির সঙ্গে কানের দুল, ছোট ব্যাগ ও একটু পরিপাটি জুতা যোগ করলেই সাজে আসতে পারে পরিবর্তন। বিশেষ করে তরুণীদের কাছে কড সেটের আকর্ষণ এর স্বচ্ছন্দ সিলুয়েট ও আধুনিক উপস্থিতিতে। তবে জনপ্রিয়তার অর্থ এই নয় যে একটি নির্দিষ্ট কাট বা রং সবার জন্য সমানভাবে উপযুক্ত। ব্যক্তিগত পছন্দ, শরীরের গঠন উপলক্ষ এবং আবহাওয়া বিবেচনা করে পোশাক বেছে নেওয়া ভালো।

অনুষঙ্গে সাজের পূর্ণতা

কড সেটের সৌন্দর্য অনেকটাই নির্ভর করে অনুষঙ্গ নির্বাচনের ওপর। পোশাকের নকশা যদি জমকালো হয়, তাহলে গয়না ও ব্যাগে সমন্বয় থাকা ভালো। আর পোশাক যদি সাদামাটা হয়, তাহলে কানের দুল, ঘড়ি, স্কার্ফ কিংবা ব্যাগের মাধ্যমে সাজে বাড়তি কিছু যোগ করা যায়। জামদানি মোটিফযুক্ত কড সেটের সঙ্গে অক্সিডাইজড রুপার গয়না, ছোট ঝুমকা কিংবা মুক্তার দুল সুন্দর মানায়। দেশীয় ঐতিহ্যের আবহ ফুটিয়ে তুলতে হাতে কাঠের চুড়ি কিংবা সূক্ষ্ম নকশার ব্রেসলেটও বেছে নিতে পারেন। তবে পোশাকে যদি অনেক নকশা থাকে, তাহলে ভারী গয়না এড়িয়ে চলাই ভালো।

জুতা নির্বাচনে রয়েছে নানা সুযোগ। দৈনন্দিন ব্যবহারে স্নিকার্স, ফ্ল্যাট স্যান্ডেল কিংবা লোফার আরামদায়ক। একটু পরিপাটি সাজের জন্য ব্লক হিল, সিøংব্যাক কিংবা মিনিমাল স্ট্র্যাপ স্যান্ডেল বেছে নেওয়া যায়। ওয়াইড লেগ প্যান্টের সঙ্গে এমন জুতা ভালো মানায়, যা পোশাকের সামগ্রিক অনুপাতের সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরি করে।

ব্যাগের ক্ষেত্রেও উপলক্ষ গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় বা অফিসের জন্য টোট ব্যাগ, ক্রসবডি ব্যাগ কিংবা মাঝারি আকারের শোল্ডার ব্যাগ কার্যকর। সন্ধ্যার দাওয়াত বা উৎসবের আয়োজনে ছোট হ্যান্ডব্যাগ কিংবা ক্লাচ যোগ করতে পারে পরিপাটি আবহ। পোশাকে জামদানি মোটিফ থাকলে ব্যাগের নকশা খুব বেশি জটিল না রাখাই ভালো।

চুলের সাজেও থাকতে পারে স্বাভাবিকতা। খোলা চুল, হালকা ওয়েভ, নিচু খোঁপা কিংবা পনিটেল পোশাকের কাট ও উপলক্ষ অনুযায়ী বেছে নেওয়া যায়। গরমের দিনে চুল বেঁধে রাখলে স্বস্তি পাওয়া যায়। মেকআপে হালকা বেস, স্বাভাবিক রঙের লিপস্টিক ও সামান্য কাজল সাজের সঙ্গে মানানসই। সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে ঠোঁটের লিপস্টিক ও চোখের সাজে গুরুত্ব দিতে পারেন।

ফারহানা মুনমুন

স্বত্বাধিকারী, বেনে বৌ

আমি বাংলাদেশের জিআই পণ্য জামদানি নিয়ে কাজ করি। কাজ করতে গিয়ে দেখলাম ঋরৎংঃ ঋধংযরড়হ এর সঙ্গে জামদানি ঝঃৎধমমষব করছে। এছাড়া ইয়ং  জেনারেশন বাংলাদেশের ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে চায় তাদের পছন্দের পোশাক দিয়ে।  সেখান থেকেই আমি শুরু করি জামদানি ডাইভার্সিটি নিয়ে কাজ। শাড়ি কেটে কোনো পণ্য তৈরি করি না আমি। ডিজাইন তৈরি করে সেই অনুযায়ী গজ কাপড় তৈরি করি এবং পণ্য তৈরি করি। শীত ও গ্রীষ্ম দুই সময়ের জন্য আমি পোশাকের কাপড় ও ডিজাইন আলাদাভাবে করে থাকি। সেক্ষেত্রে গরমের জন্য পাতলা সুতি ও হালকা রংকে প্রাধান্য দিই।  গরমে মোটা সুতার ও কালো রংকে প্রধান্য দিয়ে পণ্য তৈরি করি। কো-অডসেট আসলে এখন ট্রেন্ডি তাই বিভিন্ন ডিজাইনে এই সেটগুলো তৈরি করা হচ্ছে। এই ধরনের কো অডসেট কাস্টমারের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে দারুণ ফিডব্যাক পেয়েছি আমি। ফ্যাশন ট্রেন্ডি, কাস্টমারের চাহিদা, আরাম এই ৩টা উপাদান মাথায় রেখে আমি পোশাকের ডিজাইন নিয়ে কাজ করি।