চালক ঘুমে, স্টিয়ারিংয়ে সুপারভাইজার

নাটোরের বড়াইগ্রামের বনপাড়ায় বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই চালকসহ ১৪ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২৫ জন। চিকিৎসাধীন অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এতে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পরে বলে জানিয়েছে পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র সংলগ্ন নাটোর-পাবনা মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। বাসটি দুর্ঘটনার সময় চালাচ্ছিলেন সুপারভাইজার সোহেল রানা। এ সময় চালক ও সহকারী পেছনের সিটে ঘুমাচ্ছিলেন।

এর আগে ২০১৪ সালের অক্টোবরে বড়াইগ্রামের বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের রেজুর মোড়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল ৩৮ জনের। ঠিক ১২ বছর পর আবার সেই ২০ অক্টোবরেই বনপাড়ায় ১২ জনের প্রাণহানির ঘটনায় উপজেলাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

দুর্ঘটনায় আহত বাসযাত্রী রমজান আলী বলেন, ‘আমি বাসের চালকের সিটের দুই সিট পেছনে বসে ছিলাম। বাসটি রাত আনুমানিক ৩টার দিকে পাবনার ঈশ্বরদীতে পৌঁছালে চালকের আসন থেকে চালক উঠে যান এবং সুপারভাইজার বাস চালাতে শুরু করেন। বাসের দরজা বন্ধ করে চালক ও তার সহকারী পেছনের সিটে ঘুমাতে যান। এর ঘণ্টা খানেক পর বাসটি বনপাড়ায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।’

নিহতরা হলেন বাসচালক রাজশাহীর গোদাগাড়ীর ফরাদপুর গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে সোহেল রানা (৪০), বাগমারার কনোপাড়া গ্রামের বাবর আলীর ছেলে আনোয়ারুল হক (৩০), পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের পূর্ব সুবিধখালী গ্রামের আজহার হাওলাদারের ছেলে শহীদুল ইসলাম (৪৫) ও শহীদুল ইসলামের মেয়ে তাছফিয়া খাতুন (৮), শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের জহরউদ্দিনের ছেলে জুয়েল (৪০), একই উপজেলার ডুবি সাহিবর গ্রামের ইউনুস আলী শিকদারের ছেলে সোহাগ শিকদার (৩০), জাহান উদ্দিন মোল্লার ছেলে আব্দুস সালাম মোল্লা (৪৬), আরব আলী ফকিরের ছেলে আব্দুস সামাদ ফকির (৭০), পালের চর গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক ব্যাপারীর ছেলে শাহীন আহমেদ (৩২); ট্রাকচালক ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বড় মান্দারবাড়ীয়া গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে আবু কালাম (৫৫), নওগাঁর সাপাহার উপজেলার ঘোনটোলা গ্রামের সাজ্জাদ হোসেনের ছেলে রাসেল (৩৩) ও ফরিদপুর সদর উপজেলার বাকুমদিয়া গ্রামের শ্রী ওমর জমাদারের ছেলে শ্রী হিমেশ জমাদার (৩৫) এবং কাশেম (৩৫), জহুর উদ্দিন; এই দুজনের পরিচয় পাওয়া যায়নি।

খবর পেয়ে জাতীয় সংসদের হুইপ অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ, জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক ও ইউএনও লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এ সময় হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে এক লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দেন। একই সাথে নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবুল হায়াতকে প্রধান করে সাত সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটির গঠনের ঘোষণা দেন।

বনপাড়া হাইওয়ে থানার এসআই আলমগীর হোসেন বলেন, ভোরে নাটোর থেকে বালুবোঝাই ট্রাকের সঙ্গে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা থেকে চাঁপাইনাবগঞ্জগামী যাত্রীবাহী বাস আরপি স্পেশালের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই ৯ জন নিহত হন। পরে আহতদের উদ্ধার করে নাটোর সদর হাসপাতাল ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিকে নেওয়া হলে সেখানে আরও তিনজন মারা যান। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

নাটোর ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক আক্তার হামিদ জানান, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় আহতদের উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। পুলিশ সুপার শরীফুল হক বলেন, এটা সরু সড়ক। তারপরও বেপরোয়া গতিতে অসতর্ক হয়ে গাড়ি চালানোই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। নিহতদের লাশ শনাক্তের পর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল শরীয়তপুরের পাঁচজনের : নাটোরে বড়াইগ্রামে বাস-ট্রাকের সংঘর্ষে নিহতদের মধ্যে পাঁচজনের বাড়ি শরীয়তপুরের জাজিরায়। গতকাল সন্ধ্যায় নিহত ব্যক্তিদের লাশ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে সেখানে শোকের ছায়া নেমে আসে। নিহতরা হলেন জাজিরা উপজেলার বড়কান্দি ইউনিয়নের ডুবিসায়বর এলাকার সোহাগ শিকদার (৩২), সালাল মোল্লা (৪০), সামাদ ফকির (৭০), রামকৃষ্ণপুর এলাকার জুয়েল মাদবর (৩৭) ও একই উপজেলার পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া এলাকার শাহিন আহম্মেদ (৩৩)। তারা গত সোমবার রাতে মাদারীপুরের মোস্তফাপুর থেকে বাসে করে রাজশাহী পেঁয়াজ, হলুদ ও ভুট্টাসহ বিভিন্ন কাঁচামাল কিনতে যাচ্ছিলেন।

গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জুয়েল মাদবরের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর পর বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন তার স্ত্রী মৌসুমী আক্তার। জুয়েলের এক মেয়ে এক ছেলের মধ্যে মেয়ে রিদিতার বয়স চার বছর আর ছেলে সাইফানের বয়স দুই বছর। বাবার মৃত্যুর বিষয়টি দুই শিশু উপলব্ধি করতে পারছে না। দুই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অঝোরে কাঁদছেন মৌসুমী। মৌসুমী আক্তার জানান, রাজশাহী যাওয়ার আগে দুই সন্তানকে মনভরে আদর করে যান জুয়েল। যাওয়ার সময় বাবার কাছে চকোলেট আনার বায়না ধরে তারা।

দুর্ঘটনার সময় বাসের সামনের দিকে বসেন সোহাগ শিকদার, সালাল মোল্লা, সামাদ ফকির ও শাহিন আহম্মেদ। বাসের সামনের অংশ দুমড়েমুচড়ে গেলে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তাদের। সোহাগের মেয়ে আয়াতের বয়স চার বছর। স্বজনদের কান্না দেখে তাকিয়ে থাকে শিশু আয়াত। সোহাগের বাবা ইউনুছ শিকদার বলেন, ছেলে কাঁচামালের ব্যবসা করে। তাই রাজশাহী পেঁয়াজ কিনতে যাওয়ার সময় দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থল থেকে ফোন আসে যে, আমার ছেলে মারা গেছে। এদিকে, সালাল মোল্লার মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায় সন্ধ্যার পরে। লাশ দেখে স্ত্রী-সন্তান আর আশপাশের মানুষ কাঁদতে থাকে। এ সময় তাদের সান্ত¡না দিতে আসা প্রতিবেশীরাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলেন না।

জাজিরা থানার ওসি সালেহ আহম্মেদ বলেন, নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে শরীয়তপুরের পাঁচজন মারা গেছে। তবে নিহতের পরিবার ও অফিশিয়ালভাবে বিষয়টি এখন জানতে পারিনি। তবুও নিহতের পরিবারের খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করছি। জাজিরা ইউএনও আল ইমরান বলেন, মিডিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরে পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি। নিহতের পরিবারগুলোকে সব ধরনের সহযোগিতা করব।

নতুন চাকরির আনন্দ থামল পথেই : নতুন চাকরিতে যোগ দিয়ে পরিবারের কাছে ফিরছিলেন আনোয়ার হোসেন (৩০)। স্বজনদের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগেই নাটোরের বড়াইগ্রামে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান তিনি। মঙ্গলবার ভোর ৫টার দিকে নাটোর-পাবনা মহাসড়কে বনপাড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত আনোয়ার হোসেন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের চাঁইপাড়া গ্রামের বাসিন্দা।

নাটোর ফায়ার সার্ভিস ও বড়াইগ্রাম থানা সূত্রে জানা গেছে, বরগুনা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী আরপি পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা ট্রাকের সংঘর্ষ হয়। পরে হতাহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে নাটোর, রাজশাহীসহ বিভিন্ন স্থানীয় হাসপাতালে পাঠানো হয়। এই দুর্ঘটনায় নিহতদের একজন আনোয়ার হোসেন।

আনোয়ারের মৃত্যুর খবরে তার গ্রামের বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে চাঁইপাড়া গ্রামে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। আনোয়ারের স্ত্রী ফাতেমা বিবি তখন একই উপজেলার কনোপাড়া গ্রামে বাবার বাড়িতে ছিলেন। সেখানেই স্বামীর মৃত্যুর খবর পান তিনি। পরে প্রতিবেশী ও স্বজনেরা শোকাহত পরিবারকে সান্ত¡না দিতে বাড়িতে আসেন। সকাল ১০টার দিকে দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়িতে ফেরেন ফাতেমা। এ সময় তিনি বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন। শোকে কথা বলার মতো অবস্থাও ছিল না তার।

আনোয়ারের ভাতিজা মিজানুর রহমান জানান, আনোয়ার ঢাকায় থাকতেন এবং একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। কিছুদিন আগে একটি প্রকল্পে নতুন চাকরি পান তিনি। সেখানে যোগদান শেষে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। নাটোর-রাজশাহী মহাসড়কের পুঠিয়ায় বাস থেকে নেমে বাড়িতে পৌঁছানোর কথা ছিল তার। বাড়ি ফেরার বিষয়টি মুঠোফোনে পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছিলেন আনোয়ার।

বাগমারা থানার ওসি তৌহিদুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনায় আনোয়ারের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তার পরিবারকে বিষয়টি জানানো হয়। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই স্বজনরা মরদেহ আনতে নাটোরে যান।